দেবু বলিল—বেশ, কোদাল একখানা—কি করবে, বরাত দিয়ে করাবে, না কিনবে?
—কেনা জিনিস ভাল হয় না, তবে সস্তা বটে।
–কিন্তু কামার কোথা? অনিরুদ্ধ তো কাজের বার হয়েছে। অন্য কামার যাকেই দেবে–কাল দেব বলে দু মাসের আগে দেবে না।
—তবে তাই কিনেই দেন। আর শণ চাই। হালের জুতি চাই। রাখালটা বলছিল—গরুর দড়িও ছিঁড়েছে।
দেবু একটা কাজ পাইয়া খুশি হইল। শণ পাকাইয়া দড়ি করার কাজ-পল্লীগ্রামে নিষ্কর্মার কর্ম—বুড়োর কাজ। সে তখনই ড়ো-শণ লইয়া আসিল। দড়ি পাকাইতে পাকাইতে সে ভাবিতেছিল—কি করিবে সে?
কৃষাণ কিছুক্ষণ পরে আবার আসিয়া সাঁড়াইল।
–আর একটা কথা বলছিলাম যে মুনিবমশায়!
–কি, বল?
—পাড়ার লোকে সবাই আসবে আপনার কাছে। তা আমাকে বলেছে, তু বলে রাখিস পণ্ডিতমশায়কে।
—কি, ব্যাপার কি?
–আজ্ঞে চণ্ডীমণ্ডপে আটচালা ছাওয়াতে আমরা বেগার দি। তা এবার ডাক্তারবাবু, ঘোষাল—সব কমিটি করেছেন, ওঁরা বলছেন-পয়সা নিবি তোরা। বেগার ক্যানে দিবি? চণ্ডীমণ্ডপ জমিদারের, জমিদারকে খরচ দিতে হবে।
দেবু চুপ করিয়া রহিল। আপনার গৃহকর্মে মন দিয়া দড়ি পাকাইতে বসি সে ভবিষ্যতের কথা ভাবিতেছিল—ভাবিতেছিল একটা দোকান করিবে সে; এবং তার সঙ্গে ভাল করিয়া চাষ। প্রয়োজনমত সে নিজে লাঙল ধরিবে। এখন কিছু না করিলে সংসার চলিবে কিসে?
কৃষাণটা আবার বলিল-আমরা তাই ভাবছি। ডাক্তারবাবু কথাটি মন্দ বলেন নাই। চণ্ডীমণ্ডপে জমিদারের কাছারি হয়, ভদ্দনোকের মজলিস হয়, তোদর সঙ্গে চণ্ডীমণ্ডপের লেপচ (সংস্রব) কি? বিনি পয়সায় ক্যানে খাটবি? আবার ওদিকে ঘোষমশায় লোক পাঠাচ্ছেন-কবে ব্যাগার দিবি? ঘোষমশায় গাঁয়ের মাথার নোক; আবার গোমস্তা হয়েছেন। ওঁর কথাই বা ঠেলি কি করে? তার ওপর গ্রাম-দেবতাও বটে। তাই সব বলছে পণ্ডিতমশায়ের কাছে যাব। উনি যেমনটি বলবেন, তেমনটি শিরোধাব্য আমাদের!
দেবুর মন-প্ৰাণ ঠিক গতকল্যকার মত হাঁপাইয়া উঠিল।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া কৃষাণটি ডাকিল—মুনিবমশায়?
—আমি এখন কিছু বলতে পারলাম না, নোটন।
–আপনি যা বলবেন আমরা তাই করব। সে আমাদের ঠিক হয়ে রইচে।
সে উঠিয়া গেল। দেবুর হাতের শণ-চেঁড়া নিশ্চল হইয়া গিয়াছিল—সে সম্মুখের দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল।
চণ্ডীমণ্ডপে লোকজনের সাড়া উঠিতেছে। সেখানে খাজনা আদায় চলিতেছে; সঙ্গে সঙ্গে খাতকদের কাছে শ্ৰীহরির পাওনার হিসাবও চলিতেছে। আখেরি কিস্তি, বৎসরের শেষ। তামাদি যাহাদের, তাহাদের ওপর নালিশ হইবে। শ্ৰীহরির ধানের পাওনা হিসাব করিয়া উসুল বাদে যাহা থাকিবে, আগামী বৎসরে তাহার জের চলিবে; যাহার উসুল নাই, তাহার আসল-সুদ এক হইয়া আগামী বৎসরের জন্যে আসল হইবে।
শ্ৰীহরির গোয়ালঘরগুলি ছাওয়ানো হইতেছে। চালের উপর ঘরামিরা কাজ করিতেছে। চাষীদের ঘর ছাওয়ানোর কাজ প্রায় শেষ হইয়া গিয়াছে। সকলে নিজেরাই বাড়ির কৃষাণ-রাখাল লইয়া ঘর ছাওয়াইয়া লয়। দেবুরও অবশ্য ছাওয়ানোর কাজ না-জানা নয়। কিন্তু পণ্ডিতি গ্রহণ করিয়া আর সে এ কাজ করে না, এবার করিতে হইবে। তাহার ঘর এখনও ছাওয়ানো হয় নাই। সে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।
–সালাম পণ্ডিতজী!
ইছু শেখ পাইকার আরও দুই-তিন জনের সঙ্গে পথ দিয়া যাইতেছিল, দেবুকে দেখিয়া সে সম্ভাষণ করিয়া দাঁড়াইল। সঙ্গে তাহার সঙ্গীরাও সম্ভাষণ করিল—সালাম।
—সেলাম। ভাল আছ ইছু-ভাই? তোমরা ভাল আছ সব?
–হ্যাঁ। আপনি শরিফ ছিলেন?
–হ্যাঁ।
–তা আপনাকে আমরা হাজারবার সালাম করেছি। হ্যাঁ–মরদের বাচ্চা মরদ বটে। মছজেদে আমাদের হামেশাই কথা হয় আপনকার। মনু মিঞা, খালেক সায়েব, গোলাম মেজ্জা আসবে একদিন আপনকার সাথে মোলাকাত করতে।
দেবু প্রসঙ্গটা পাল্টাইয়া দিল—কোথায় এসেছিলে?
—এই গাঁয়েই বটে। কিস্তির সময় ছাগল, গরু দু-চারটে বেচবে তো। তা ধরেন-এ। হল আমার কেনাবেচার গাও—তাই টাকাকড়ি নিয়ে এসেছিলাম। আর কেনা তো উঠেই গিয়েছে। কিন্নেওয়ালা হয়ে গেল। আপনার তো একটা বলদ বুড়ো হয়েছে পণ্ডিতমশাই, আপনি ল্যান ক্যানে একটা বলদ!
–এবার আর হয় না, ইছু-ভাই।
–আপনি ল্যান, বুড়ো বলদটা দ্যান আমাকে, বাকি যা থাকবে দিবেন আমাকে ইহার পরে। না হয় কিছু ধান ছেড়ে দান, ধানের পাইকার আমার সাথে।
দেবু হাসিল।—না ভাই, থাক।
–আচ্ছা, তবে থাক।
ইছুর দল সেলাম করিয়া চলিয়া গেল। পাকা ব্যবসাদার ইচু, মানুষের টাকার প্রয়োজনের সময় সে টাকা লইয়া উপস্থিত হইবেই। কাহার বাড়িতে কোন্ জন্তুটি মূল্যবান সে তাহার নখাগে। কিন্তু মনু মিঞা, খালেক সাহেব, গোলাম মির্জা তাহার সহিত দেখা করিতে আসিবে কেন? সে মনে মনে অস্বস্তি অনুভব করিল। ইহারা সম্ভ্ৰান্ত লোক, বড় চাষী, ব্যবসায়ী।
রাখাল-ছোঁড়া আসিয়া দেবুর শিশুটিকে নামাইয়া দিয়া বলিল—আপনি একবার ল্যান, মুনিবমশায়। আমাকে কিছুতেই ছাড়ছে না। গরু চরাইতে যাবে আমার সাথে।
ছোঁড়াটা হি-হি করিয়া হাসিতে হাসিতে খোকাকে বলিল—নেকাপড়া কর বাবার কাছে। গরু চরাতে যেতে নাই, ছি!
দেবু সাগ্রহে থোকাকে বুকে তুলিয়া লইল।
ছেলেটাও তেমনি, বিলু তাহাকে বেশ তালিম দিয়াছে, সে গম্ভীরমুখে আরম্ভ করিল—ক–ল কলো, ক–ল কলো!
***
—কি হচ্ছে পণ্ডিত?
বলিয়া এই সময় অনিরুদ্ধ আসিয়া বসিল। এখন সে প্রকৃতিস্থ। মুখে মদের সামান্য গন্ধ উঠিতেছে, কিন্তু মাতাল নয়। হাতে একটা লোহার টাঙ্গি।
