ফাল্গুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ হইতে চৈত্রের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে তিল ফসল পাকিলে সেবার চূড়ান্ত ফসল হয়। সে তিল ফসল দা ভিন্ন কাস্তেতে কাটা যায় না। এবার তিল নাবি, সবে এই ফুল ধরিতেছে, পাকিতে বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ। কাজেই ফসল ভাল হইবে না।
ভোরবেলায় মাঠ ঘুরিয়া চাষের জমির তদারক করিয়া দেবু ফিরিতেছিল। এ বৎসর মাঘ মাস হইতে আর বৃষ্টি হয় নাই। বৃষ্টির অভাবে এখনও কেহ আখ লাগাইতে পারে নাই। ময়ূরাক্ষীর জল একেবারে শীর্ণ ধারায় ওপারে জংশন শহরের কোল ঘেঁষিয়া বহিতেছে; বাঁধ দিয়া জল এপারে আনিতে পারিলে সি করিয়া চাষের কাজ চলিত। কিন্তু এ বধ বাধা বড় কষ্টসাধ্য। এপার হইতে ওপার পর্যন্ত ময়ূরাক্ষীর গর্ভে বাঁধ দিতে হইবে; অন্তত চার-পাঁচ হাত উঁচু না করিলে চলিবে না। সে করিবে কে? চার-পাঁচখানা গ্রামের লোক একজোট হইয়া না লাগিলে তাহা সম্ভবপর নয়। এখন আখ লাগাইলে সে আখের বিনাশ থাকিত না; বর্ষা পড়িবার পূর্বেই হাত দুয়েক না হোক অন্তত দেড় হাত উঁচু হইয়া উঠিত। পটল লাগানোও হইল না। পটল রুইলে ফাল্গুনে ফল বাড়ে দ্বিগুণে। শ্ৰীহরি কিন্তু সব লাগাইয়া ফেলিয়াছে। আপনার জমিতে দুই-তিনটা কাঁচা কুয়া কাটাইয়া, ঢেড়ায় জল তুলিয়া সিচনের ব্যবস্থা করিয়াছে। শ্ৰীহরির কুয়া হইতে জল লইয়া ভবেশ-হরিশও কাজ করিয়া লইয়াছে।
দেবু ভাবিতেছিল একটা কুয়া কাটাইবার কথা। পটল যাক, কিন্তু আখ না লাগাইলে কি করিয়া চলিবে? বাড়িতে গুড় না থাকিলে চলে? ময়ূরাক্ষীর চরভূমিতে অল্প খুঁড়িলেই জল অতি সহজেই পাওয়া যাইবে; আট-দশ হাত গর্ত করিলেই চলবে। টাকা পনের খরচ। কিন্তু এদিকে যে বিলুর হাতে মজুত টাকা সব শেষ হইয়া আছে। শ্ৰীহরির স্ত্রী গোপনে ধার দিয়াছে। দুর্গার মারফতে দোকানেও কিছু ধার হইয়া আছে। ধান এবার ভাল হয় নাই। মজুত যাহা আছে বিক্রি করিতে ভরসা হয় না। সম্মুখে বর্ষা আছে, চাষের খরচ সংসার খরচ অনেক দায়িত্ব। গম, যব তাও ভাল হয় নাই। গম দেড় মন, যব মাত্র তিরিশ সের। কলাই যাহা হইয়াছে সে সংসারেই লাগিবে। আর স্কুলের চাকরি নাই, মাস-মাস নগদ আয়ের সংস্থান গিয়াছে। এখন সে কি করিবে? অথচ এই অবস্থায় গোটা গ্রামটাই যেন তাহাকে টানিতেছে সহস্র সমস্যা হইয়া। যতীনের কথা মনে হইল; দ্বারকা চৌধুরীর কথা মনে হইল।
গ্রামে ঢুকিতেই দেখা হইল ভূপালের সঙ্গে। চৌকিদারি পেটিটা কাঁধে ফেলিয়া সে সকালেই বাহির হইয়াছে। ভূপাল প্রণাম করিল—পেনাম।
প্রতি-নমস্কার করিয়া দেবু চলিয়া যাইতেছিল, ভূপাল সবিনয়ে বলিলপণ্ডিতমশায়।
—আমাকে কিছু বলছ?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, গিয়েছিলাম বাড়িতে ফিরে আসছি।
–কি, বল?
–আজ্ঞে, খাজনা আর ইউনান বোর্ডের ট্যাক্স।
–আচ্ছা, পাবে।
ভূপাল খুশি হইয়া বলিল—এই তো মশায় মানুষের মতন কথা। তা না ডাক্তারবাবু তো মারতে এলেন। ঘোষালমশাই বলে দিলে—নেহি দেঙ্গা। আর সবাই তো ঘরে লুকিয়ে বসে থাকছে। মেয়েছেলেতে বলেছে—বাড়িতে নাই। এদিকে আমি গাল খাচ্ছি।
হাসিয়া দেবু বলিল না থাকলেই মানুষকে চোর সাজতে হয় ভূপাল।
-ই আপনি ঠিক বলেছেন।
ভূপাল দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল—কার ঘরে কি আছে বলুনঃ গোটা মাঠটার ধানই তো ঘোষমশাইয়ের ঘরে এসে উঠল গো। বর্ষার ধান শোধ দিতেই তো সব ফাঁক হয়। সত্যি, লোকে দেয় কি করে? কিন্তু আমিই বা করি কি বলুনঃ আমারই এ হইছে মরণের চাকরি!
বাড়িতে আসিয়া দেবু দেখিল—বিলু তাহার জন্য চা করিয়া বসিয়া আছে। সে আশ্চর্য হইয়া গেল। এ কি!
বিলু লজ্জিতভাবেই বলিল—দেখ দেখি হয়েছে কি না। কামার-বউকে শুধিয়ে এলাম, নজরবন্দির চা কামার-বউ করে কিনা!
—তা না হয় হল, কিন্তু করতে বললে কে?
–তুমি যে বললে—জেলে রোজ নজরবন্দিদের কাছে চা খেতে!
–হ্যাঁ তা খেতাম, কিন্তু তাই বলে এখনও খেতে হবে তার মানে কি? না, আর খরচ বাড়িয়ো না, বিলু।
—বেশ। এক কৌটো চা আনিয়েছি, সেটা ফুরিয়ে যাক, তারপর আর খেয়ো না।
–এক কৌটো চা আনিয়েছ?
–দুর্গা এনে দিয়েছে কাল সন্ধেবেলা।
দেবুর ইচ্ছা হইল চায়ের বাটিটা উপুড় করিয়া ফেলিয়া দেয়। কিন্তু বিলু ব্যথা পাইবে বলিয়া সে তাহা করিল না। বলিল-আজ করেছ কিন্তু কাল থেকে আর কোরো না। চায়ের কৌটোটা থাক, ভাল করে রেখে দাও। ভদ্রলোকজন এলে, কি বর্ষায়-বাদলায় সর্দি-টর্দি করলে খাওয়া যাবে।
–না।
দেবু বিস্মিত হইয়া প্রশ্ন করিল–মানে?
–তোমার কষ্ট হবে।
–হবে না।
–হবে, আমি জানি।
–কি আশ্চর্য!
বিরক্তিতে বিস্ময়ে দেবু বলিল-আমার কষ্ট হবে কি না আমি জানব না, তুমি জানবে?
—বেশ। করব না চা।
মুহুর্তে বিলুর চোখ দুটি জলে ভরিয়া উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরাইয়া সে চলিয়া গেল।
দেবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল। এই বোধহয় তাহাদের জীবনে প্রথম দ্বন্দ্ব। বিলুকে আঘাত দেওয়ার দুঃখ বড় মর্মান্তিক হইয়া দেবুর অন্তরে বাজিল।
—মুনিবমশায়! দেবুর কৃষাণ আসিয়া দাঁড়াইল।
–কি রে?
–আজ্ঞে, এবার তো একখানা কোদাল না হলে চলবে না।
–নতুন চাই? লোহা চাপিয়ে হবে না?
–না, আজ্ঞে। গেলবারই লাগত, আপুনি ছিলেন না। লোহা দিয়ে কোনোরকমে চালিয়েছি; ক্ষয়ে এই এতটুকুন হয়ে গিয়েছে। সার কেটে পালটানোই যাচ্ছে না।
–সার কাটছ নাকি? জল দিচ্ছ তো? চল দেখি।
চৈত্র মাসে সার প্রস্তুতের গর্তে সঞ্চিত আবর্জনাগুলিকে কোদাল দিয়া উপরের নূতন নাপচা আবর্জনা নিচে ফেলিয়া, নিচের পচা আবর্জনা যাহা সারে পরিণত হইয়াছে—সেগুলিকে উপরে দেওয়ার বিধি। সঙ্গে সঙ্গে ভারে ভারে জল। দেবুর বাড়ির সার কোনোমতে কাটিয়া পালটানো হইয়াছে। কৃষাণটি কোদালটা দেখাইল। সত্যই সেটা ক্ষয় পাইয়া ছোট হইয়া গিয়াছে, উহাতে চাষের কাজ চলিবে না। চাষের কাজে ভারী কোদাল চাই। সেকালে শক্তিমান চাষীরা যে কোদাল চালাইত, তাহার ওজন পাঁচ সেরের কম হইত না, সাত-আট সের ওজনের। কোদাল চালাইবার মত সক্ষম চাষীও অনেক ছিল।
