বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন—বুঝতে ঠিক পারলাম না। হ্যাঁ গো পণ্ডিত, আপনি এমন চুপচাপ যে?
চিন্তাকুলভাবেই হাসিয়া দেবু বলিল—এমনি।
আবার কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া বৃদ্ধ দেবুকে বলিলেন আপনার কাছে আসব একবার ও-বেলায়!
–আমার কাছে!
–হ্যাঁ, কথা আছে। আপনি ছাড়া আর বলবই বা কাকে?
—অসুবিধে না হয় তো এখুনি বলুন না! আবার আসবেন কষ্ট করে? দেবু উৎকণ্ঠিত হইয়াই প্রশ্ন করিল।
যতীন বলিল—আমি বরং একটু এগিয়ে চলি।
—না-না-না। বৃদ্ধ বলিলেন বেলা হয়েছে বলেই বলছিলাম। বুড়ো বয়সে আমার আবার লুকোবার কথা আছে নাকি? চৌধুরী হাসিয়া উঠিলেন—আপনি বোধহয় শুনেছেন, পণ্ডিত?
—কি বলুন তো?
–গাজনের কথা!
–না, কিছু শুনি নি তো!
–গাজনের ভক্তরা বলছে এবার তারা শিব তুলবে না।
–শিব তুলবে না কেন?
—ও, আপনি তো গতবার ছিলেন না। গতবার থেকেই সূত্রপাত। গেলবারে ঠিক এই গাজনের সময়েই সেটেলমেন্টের খানাপুরীতে শিবের জমি হারিয়ে গেল।
–হারিয়ে গেল!
—জমিদারের নায়েব-গোমস্তা বের করতে পারলে না। বের করবে কি, পুরোহিতের জমি নিজেরাই বন্দোবস্ত করেছে মাল বলে। তা ছাড়া শিবের পুজোর খরচা জিম্ম ছিল মুকুন্দ মণ্ডলের কাছে। শিবোত্তর জমি ভোগ করত ওরা। এখন মুকুন্দের বাবা সে জমি কখন বেচে দিয়ে গিয়েছে। মাল বলে। জমিদারও খাজনাখারিজ ফি গুনে নিয়ে দেবোত্তর মাল স্বীকার করেছে। মুকুন্দ এতসব জানত না, সে বরাবর শিবের খরচ যুগিয়েই আসছিল। এখন গতবার জরিপের সময়। যখন দেখলে শিবোত্তর জমিই নাই তখন সে বললে জমিই যখন নাই, তখন খরচও আমি দেব না। গতবার কোনো রকমে চাঁদা করে পুজো হয়েছে। এবার ভক্তরা বলছে, ওরকম যেচেমেগে পুজোতে আমরা নাই। তাই একবার শ্ৰীহরির কাছে এসেছিলাম-পুজোর কি হবে তাই জানতে। এখনও বেঁচে আছি—বেঁচে থাকতেই গাজন বন্ধ হবে বাবা।
—শ্ৰীহরি কি বললে?
–জমিদারের পত্র দেখালেন, তিনি খরচ দেবেন না। পুজো বন্ধ হয় হোক।
–হুঁ।
চৌধুরী বলিলেন—গতবার থেকে পাতু ঢাক বাজায় নাই, পাতু জমি ছেড়ে দিয়েছে। বায়েন অবশ্য হবে। অনিরুদ্ধ বলি করে নাই। বলে, একটা পঁঠার ঠ্যাং নিয়ে ও আমি করতে পারব। না। শেষে ও-ই খোঁড়াঠাকুর বলি করলে। এবার সে বলেছে—বলি করতে হলে দক্ষিণে চাই। নানান রকমের গোল লেগেছে পণ্ডিত। এসবের মীমাংসা তো পথে হয় না। তাই বলছিলাম–ও-বেলায় আসব।
দেবু হাঁপাইয়া উঠিতেছিল, সে বলিল—এর আর আমি কি করব চৌধুরীমশায়?
—এ কথা আপনার উপযুক্ত হল না, পণ্ডিত। আপনার মত লোক যদি না করে, তবে কে। করবে?
দেবু স্তব্ধ হইয়া গেল।
চৌধুরী কালীপুরের পথে বিদায় লইল। দেবু ও যতীন মাঠ অতিক্ৰম করিয়া গিয়া নামিল ময়ূরাক্ষীর গর্ভে। দেবু নীরবেই স্নান করিল, নীরবেই গ্রাম পর্যন্ত ফিরিল। যতীন দুই-চারটা কথা বলিয়া উত্তর না পাইয়া গুনগুন করিয়া কবিতা আবৃত্তি করিল।
তৃণে পুলকিত যে মাটির ধরা লুটায় আমার সামনে
সে আমায় ডাকে এমন করিয়া কেন যে কব তা কেমনে।
মনে হয় যেন সে ধূলির তলে
যুগে যুগে আমি ছিনু তৃণে জলে …
****
বাসায় ফিরিয়া যতীনের সে এক বিপদ। পদ্ম মূৰ্ছিত হইয়া জলে-কাদায় উঠানের উপর পড়িয়া আছে। মাথার কাছে বসিয়া কেবল দুর্গা বাতাস করিতেছে। তাহারও সর্বাঙ্গে জল-কাদা লাগিয়াছে। ও-ঘরের দাওয়ায় বসিয়া আছে মাতাল অনিরুদ্ধ। মাথাটা বুকের উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে, আপন মনেই বিড়বিড় করিয়া সে বকিতেছে। রান্নাবান্নার কোনো চিহ্নই নাই।
দুর্গা বলিল—আপনারা চলে গেলেন, কামার-বউ একেবারে ক্ষ্যাপার মতন হয়ে আমাকে বললে—বেরো, বেরো তুই আমার বাড়ি থেকে, বেরো। আমার সঙ্গে দু-চারটে কথা কাটাকাটি হয়ে গেল। আমি মশায়, বাড়ি যাব বলে যেই এখান থেকে বেরিয়েছি, আর শব্দ হল দড়াম। করে। পিছন ফিরে দেখি এই অবস্থা। ছুটে এসে জল দিয়ে বাতাস করে কিছুই হল না। খানিক পরে হঠাৎ কম্মকার এল। এসে, ওই দেখুন না, খানিকটা চেঁচামেচি করে ওই বসেছে এইবার মুখ জড়ে পড়বে।
দেবু অনিরুদ্ধকে ঠেলা দিয়া ডাকিল—অনিরুদ্ধ।
একটা গৰ্জন করিয়া অনিরুদ্ধ চোখ মেলিয়া চাহিল—এ্যাও!
কিন্তু দেবুকে চিনিয়া সে সবিস্ময়ে বলিল–ও, পণ্ডিত!
–হ্যাঁ, শুনছ?
–আলবৎ একশো বার শুনব, হাজার বার শুনব!
পরক্ষণেই সে হু-হু করিয়া কাঁদিয়া উঠিল—আমার অদেষ্ট দেখ পণ্ডিত! তুমি বন্ধুনোক, ভাল নোক, গায়ের সেরা নোক, পাতঃস্মরণীয় নোক তুমি—দেখ আমার শাস্তি। পথের ফকির আমি। আর ওই দেখ পদ্মের অবস্থা।
–জগনকে ডেকে আন অনিরুদ্ধ। ডাক্তার ডাক।
অতি কাতরস্বরে অনিরুদ্ধ বলিল ডাক্তার কি করবে, ভাই? এ ওই ছিরে শালার কাজ। আমার গুপ্তি কই? আমার গুপ্তি? খুন করব শালাকে। আর ওই দুগাকে। ওই পদ্মকে। দুগ্গা। আমাকে বাড়ি ঢুকতে দেয় না পণ্ডিত। আমার সঙ্গে ভাল করে কথা কয় না।
তারপর সে আরম্ভ করিল অশ্লীল গালিগালাজ। দুৰ্গা নতশির হইয়া নীরবে বসিয়া রহিল।
দেবু বলিল—যতীনবাবু আসুন, আমার ওখানেই দুটো খাবেন। আমরা গিয়ে বরং জগনকে ডেকে দেবখন।
দেবু ও যতীন চলিয়া যাইতেই অনিরুদ্ধ আবার আরম্ভ করিল—আর ওই নজরবন্দি ছোঁড়াকে কাটব। ওকেই আগে কাটব। ও-ব্যাটাই আমার ঘরের–
দুর্গা এবার ফোস করিয়া উঠিল—দেখ কৰ্ম্মকার, ভাল হবে না বলছি।
অনিরুদ্ধ চৌকাঠের উপর নিষ্ঠুরভাবে মাথা ঠুকিতে আরম্ভ করিলওই নে, ওই নে! দুর্গা বারণ পর্যন্ত করিল না।
২০. ফাল্গুনের আট চৈত্রের আট
ফাল্গুনের আট চৈত্রের আট
সেই তিল দায়ে কাট।
