সঙ্গে সঙ্গে তাহার মনে একটা সংশয় জাগিয়া উঠিল। চণ্ডীমণ্ডপের স্বত্বাধিকার সত্যই সমস্যার বিষয়। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া সে বলিল-আজ কথাটার উত্তর দিতে পারলাম না আপনাকে।
ভিতরে খুট খুট করিয়া কড়া নাড়ার শব্দ হইল। যতীন বুঝিলমা-মণি ডাকিতেছে। সে বলিল—আমি আর উঠতে পারছি না; তুমিই দিয়ে যাও মা-মণি।
পদ্মের বিরক্তির আর সীমা রহিল না। ছেলেটা যেন কি!
দেবু হাসিয়া কহিল—আমাকে লজ্জা করছে নাকি, মিতেনী?
ইহার পর আর বাহির না হইয়া উপায় রহিল না। দীর্ঘ অবগুণ্ঠনে আপনাকে আবৃত করিয়া পদ্ম দুই কাপ চা নামাইয়া দিয়া চলিয়া গেল।
যতীন বলিলতা ছাড়া লোকজন যারাই ওখানে যান, গোমস্তা শ্ৰীহরিবাবু তাদেরই সাবধান করেন—এ করবে না, ও করবে না! লোকে মেনে নেয়। দুর্বল নিরীহ মানুষ তারা বোঝে না। টাকা দিয়ে শ্ৰীহরি ঘোষ মেঝে বাধিয়ে দিয়েছেন বলে সাধারণের অধিকার নিশ্চয়ই বিক্রি হয়ে যায় নি।
দেবু অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল উপায় কি বলুনঃ শ্ৰীহরি ধনী। সে এখন সমস্ত গ্রামেরই শাসনকর্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমিদার পর্যন্ত তার হাতে গোমস্তাগিরি ছেড়ে দিয়েছেন পত্তন-বিলির মত শর্ত! করবেন কি বলুন?
যতীন হাসিয়া বলিল—আমি তো কিছু করব না, আমার করবার কথাও নয়। করতে হবে আপনাকে, দেবুবাবু। নইলে উদ্গ্রীব হয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম কেন?
দেবু স্থিরদৃষ্টিতে যতীনের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। যতীনও চুপ করিয়া বসিয়া রহিল, সম্মুখের দিকে চাহিয়া। সহসা কে ডাকিল বাবু!
কে? যতীন ও দেবু দুজনেই ফিরিয়া দেখিল—ভিতরের দরজায় দাঁড়াইয়া ডাকিতেছে দুর্গা।
দেবু হাসিয়া বলিল-দুৰ্গা!
–হ্যাঁ।
–কি খবর?
কামার-বউ জিজ্ঞেস করছে, উনান ধরিয়ে দেবে কি না। রান্নাবান্না—
যতীন বলিল–হ্যাঁ। তা উনান ধরাতে বল না কেন!
—কি রান্না করবেন?
–যা হয় করতে বল।
সবিস্ময়ে দুর্গা বলিল—করতে বলব কাকে?
–মা-মণিকে বল। না হয়—তুমিই দুটো চড়িয়ে দাও।
দুর্গা মুখে কাপড় চাপা দিয়া হাসিয়া বলিল, আপনি একটুকুন ক্ষ্যাপা বটেন বাবু!
—কেন দোষ কি? যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়, সে যে জাতই হোক তার হাতে খেতে দোষ নাই। জিজ্ঞেস কর পণ্ডিতমশাইকে।
–হ্যাঁ, পণ্ডিতমশায়?
দেবু হাসিয়া বলিল—জেলখানায় আমাদের যে রান্না করত সে ছিল হাড়ি। যতীনের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল নামটি ছিল বিচিত্র গান্ধারী হাড়ি।
যতীন বলিল—দ্ৰৌপদী হলেই ভাল হত। চলুন, চান করতে যাব নদীতে। সে জামাটা খুলিয়া ফেলিয়া গামছা টানিয়া লইল।
***
দেবু মনে মনে স্থির করিয়াছিল—আর সে পাঁচের হাঙ্গামায় যাইবে না। জেল হইতেই সেই সঙ্কল্প করিয়াই আসিয়াছিল। কিন্তু যতীন ছেলেটি তাহার সব সঙ্কল্প ওলটপালট করিয়া দিতে বসিয়াছে।
বাড়ি হইতে তেল মাখিয়া গামছা লইয়া যতীনের সহিত নীরবে সে পথ চলিতেছিল। চণ্ডীমণ্ডপের নিকটে আসিয়াই দেখা হইল বৃদ্ধ দ্বারকা চৌধুরীর সঙ্গে। লাঠি হাতে টুকটুক করিয়া বৃদ্ধ চণ্ডীমণ্ডপ হইতেই নামিয়া আসিলেন। বৃদ্ধ যতীনের দিকে চাহিয়া বলিলেনচানে চলেছেন বুঝি?
যতীন হাসিয়া উত্তর দিল–হ্যাঁ।
আপনি তো তেল মাখেন না শুনি?
–আজ্ঞে না।
–তবে পেনাম। ঈষৎ হেঁট হইয়া বৃদ্ধ নমস্কার করিলেন।
যতীন একেবারে শশব্যস্ত হইয়া বলিলনা-না। ও কি? আপনাকে কতবার বারণ করেছি আমি। বয়সে আমি আপনার চেয়ে
কথার মাঝখানেই চৌধুরী মিষ্টি হাসিয়া বলিলেন—শালগ্রামের ছোট বড় নাই বাবা! আপনি ব্ৰাহ্মণ।
–না-না। ওসব আপনাদের সেকালে চলত, সেকাল চলে গেছে।
হাসিটি চৌধুরীর ঠোঁটের ডগায় লাগিয়াই থাকে। হাসিয়া তিনি বলিলেন—এখনকার কাল নতুন বটে বাবা। সেকালের কিছু আর রইল না। কিন্তু আমরা জনকতক যে (সকালের মানুষ অকালের মতন পড়ে রয়েছি একালে; বিপদ যে সেইখানে!
বৃদ্ধের কথা কয়টি যতীনের বড় ভাল লাগিল, বলিল—সেকালের গল্প বলুন আপনাদের!
–গল্প? হ্যাঁ, তা সেকালের কথা একালে গল্প বৈকি। আবার ওপারে গিয়ে যখন কর্তাদের সঙ্গে দেখা হবে, তখন একালে যা দেখে যাচ্ছি বললে, সেও তাদের কাছে গল্পের মত মনে হবে। সেকালে আমরা গাই বিয়োলে দুধ বিক্রেতাম, মাছ ধরালে মাছ বিলেতাম, ফল পাড়লে ফল বিলোতাম, ক্রিয়াকর্মে বাসন বিলোতাম, পথের ধারে আম-কাঁঠালের বাগান করতাম, সরোবর দিঘি কাটাতাম, গরু-ব্রাহ্মণকে প্রণাম করতাম, দেবতা প্রতিষ্ঠে করতাম, মহাপুরুষেরা ঈশ্বর দর্শন করতেন—সে আজ আপনাদের কাছে গল্প গো! আর আজকে আকাশে উড়োজাহাজ, জলের তলায় ড়ুবোজাহাজ, বেতারের খবর আসা, টাকায় আট সের চাল, হরেক রকম নতুন ব্যামো, দেবকীর্তি লোপ,-এও সেকালের লোকের কাছে গল্প।
–আপনি দিঘি কাটিয়েছেন চৌধুরীমশায়?
—আমার কপাল, ভাঙা-ভাগ্যি, বাবা! তবে আমার আমলে বাবা কাটিয়েছেন—তখন আমি ছোট, মনে আছে। এক এক ঝুড়ি মাটি দশ গণ্ডা কড়ি। একজন লোক কড়ি নিয়ে বসে থাকত ঝুড়ি গুনে গুনে কড়ি দিত; বিকেলে সেই কড়ি নিয়ে পয়সা দিত।
–আধ পয়সা ঝুড়ি বলুন।
–হ্যাঁ।…হাসিয়া চৌধুরী বলিলেন আমাদের কথা তো আপনারা তব বুঝতে পারেন। গো, আমরা যে আপনাদের কথা বুঝতেই পারি না! আচ্ছা বাবা, এত যে সব স্বদেশী হাঙ্গামা, বোমা-পিস্তল করছেন—এসব কেন করছেন? ইংরেজ রাজত্বকে তো আমরা চিরকাল রামরাজত্ব বলে এসেছি।
এক মুহূর্তে যতীনের চোখ দুইটা টর্চের আলোকের মত জ্বলিয়া উঠিল এক প্রদীপ্ত দীপ্তিতে। পরমুহূর্তেই কিন্তু সে দীপ্তি নিভিয়া গেল। হাসিয়া বলিলবোমা-পিস্তল আমি দেখি নি। তবে হাঙ্গামা হচ্ছে কেন জানেন? হাঙ্গামা হচ্ছে ওই দিঘি সরোবর কাটানো আপনাদের কালকে ওরা নষ্ট করেছে বলে।
