অনিরুদ্ধের বারান্দায় পাতা তক্তপোশের উপর যতীন দেবুকে বসাইল—বসুন। আপনার সঙ্গে আলাপ করার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে আছি।
দেবু হাসিয়া বলিল—কাল তো বললেন—আলাপ হয়ে গিয়েছে।
–তা সত্যি। এইবার আলোচনা হবে। দাঁড়ান, তার আগে একটু চা হোক। বলিয়া সে অনিরুদ্ধের বাড়ির ভিতরের দরজায় দাঁড়াইয়া ডাকিল মা-মণি!
মা-মণি তাহার পদ্ম। মা-মণিটি তার জীবনে বিষামূতের সংমিশ্রণে গড়া এক অপূর্ব। সম্পদ। তাহার বিষের জ্বালা—অমৃতের মাধুর্য এত তীব্ৰ যে, তাহা সহ্য করিতে যতীন হাঁপাইয়া ওঠে। তাহার সঙ্গে পদ্মের বয়সের পার্থক্যও বেশি নয়, বোধহয় পাঁচ-সাত বৎসরের। তবু সে তার মা-মণি। এক এক সময়ে যতীনের মনে পড়ে তাহার ছেলেবেলার কথা। খেলাঘরে তাহার দিদি সাজিত মা, সে সাজিত ছেলে। প্রাপ্তবয়সে সেই খেলার যেন পুনরাবৃত্তি ঘটিতেছে। সে যখন এখানে আসে তখন পদ্ম প্রায় অর্ধোন্মাদ। মধ্যে মধ্যে মূৰ্ছারোগে চেতনা হারাইয়া উঠানে, ধূলামাটিতে অসংবৃত অবস্থায় পড়িয়া থাকিত। অনিরুদ্ধ তাহার পূর্ব হইতেই বাউণ্ডুলে, ভবঘুরে, বাড়িতে থাকিত না। যতীনকেই অধিকাংশ সময় চোখেমুখে জল দিতে হইত। তখন হইতেই যতীন ডাকে মা বলিয়া। মা ছাড়া আর কোনো সম্বোধন সে খুঁজিয়া পায় নাই। সেই মা। সম্বোধনের উত্তরেই পদ্ম একদিন প্রকৃতিস্থ হইয়া তাহাকে ডাকিল ছেলে বলিয়া। সেই হইতেই এই খেলাঘর পাতা হইয়াছে। পদ্ম এখন অনেকটা সুস্থ, অহরহ ছেলেকে লইয়াই ব্যস্ত। অনিরুদ্ধের ভাবনা সে যেন ভাবেই না। কৃচিৎ কখনও আসিলে তাহাকে যত্নও বিশেষ করে না।
বাড়ির ভিতর তখন কলরব চলিতেছে। একপাল ছেলে হুটোপাটি ছুটোছুটি করিয়া বেড়াইতেছিল। পদ্ম একজনের চোখ গামছায় বাঁধিয়া বলিতেছিল—ভাত করে কি?
—টগ্-বগ্! ছেলেটি উত্তর দিল।
–মাছ করে কি?
–ছ্যাঁক-ছোঁক।
–হাঁটে বিকোয় কি?
–আদা।
–তবে ধরে আন, তোর রাঙা রাঙা দাদা।
কানামাছি খেলা চলিতেছে। যতীনের কাছে ছেলের দল আসে। যতীন না থাকিলে তাহারা পদ্মকে লইয়া পড়ে। পদ্মও যতীনের অনুপস্থিতিতে ছেলেদের খেলার মধ্যে বুড়ি সাজিয়া বসে।
যতীন আবার ডাকিল মা-মণি!
পদ্ম উঠিয়া পড়িল,-কি? চাদ-চাওয়া ছেলের আমার আবার কি হুকুম শুনি?
–চায়ের জল গরম আর একবার।
–হবে না। মানুষ কতবার চা খায়?
–দেবু ঘোষ মশায় এসেছেন। চা খাওয়াতে হবে না?
–পণ্ডিত?
–হ্যাঁ।
পদ্ম এক হাতে ঘোমটা টানিয়া দিলচাপা গলায় বলিল—দি।
যতীন হাসিয়া বলিলপণ্ডিত বাইরে! ঘোমটা দিচ্ছ কাকে দেখে?
–ওই দেখ, তাই তো!
ঘোমটা সরাইয়া দিয়া পদ্ম অপ্রস্তুতের মত একটু হাসিল।
বাহিরে আসিয়া যতীন দেবুকে বলিল—আপনার নামে একটা ভিপি আনতে দেব আমি।
দেবু একটু বিব্রত বোধ করিল।বেনামীতে ভি-পি, কিসের ভি-পি?
–হ্যাঁ, খানকয়েক ছবির বই, একটা রঙতুলির বাক্স। আমাদের নলিনের জন্য। পুলিশের মারফত আনানোর অনেক হাঙ্গামা। নলিন ছবি অ্যাঁকতে শিখুক। ওর হাত ভাল।
—তা বেশ। কিন্তু তার চেয়ে, নলিন, তুই পটুয়াদের কাছে শেখ না কেন? প্রতিমা গড়তে শেখ, রঙ করতে শেখ।
নলিন ছেলেটা অদ্ভুত লাজুক, দুই-চারিটি অতি সংক্ষিপ্ত কথায় কথা শেষ করে সে। সে। মাটির দিকে চাহিয়া বলিলপটুয়ারা শেখায় না। বলে পয়সা লাগবে।
যতীন বলিল-পয়সা আমি দেব, তুমি শেখ।
—দু টাকা ফি-মাসে লাগবে।
দেবু বলিল-আচ্ছা, সে আমি বলে দেব দ্বিজপদ পটুয়াকে। পরশু যাব আমি মহাগ্রামে। আমার সঙ্গে যাবি।
নলিন ঘাড় নাড়িয়া সায় দিল—বেশ।
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল-পয়সা দেবেন বলেছিলেন।
যতীন একটি সিকি তাহার হাতে দিয়া বলিলতা হলে পণ্ডিতমশায়ের সঙ্গে যাবে তুমি, বুঝলে?
নলিন আবার ঘাড় নাড়িয়া সায় দিয়া নীরবেই উঠিয়া চলিয়া গেল।
যতীন বলিল-এইবার আপনার সঙ্গে আলোচনা আরম্ভ করব। অনেককে জিজ্ঞেস করছি, কেউ উত্তর দিতে পারে নি। অন্তত সন্তোষজনক মনে হয় নি আমার।
—কি বলুন?
–আপনাদের ওই চণ্ডীমণ্ডপটি। ওটি কার?
–সাধারণের।
–তবে যে বলে জমিদার মালিক?
—মালিক নয়। জমিদার দেবোত্তরের সেবাইত বলে তিনিই চণ্ডীমণ্ডপের রক্ষণাবেক্ষণ করেন।
–রক্ষণাবেক্ষণও তো, আমি যতদূর শুনেছি, গ্রামের লোকেই করে।
–হ্যাঁ, তা করে। কিন্তু তবু ওই রকম হয়ে আসছে আর কি! ওটা জমিদারের সম্মান। তা ছাড়া শূদ্রের গ্রাম, জমিদার ব্রাহ্মণ, তিনিই সেবায়েত হয়ে আছেন। আর ধরুন, গ্রামের মধ্যে ঝগড়াঝাটি হয়, দলাদলি হয়। এই কারণেই জমিদারকেই দেবোত্তরের মালিক স্বীকার করে আসা হয়েছে। কিন্তু অধিকার গ্রামের লোকেরই।
—তবে প্রজা-সমিতির মিটিং করতে বাধা দিলে কেন জমিদার-পক্ষ?
–বাধা দিয়েছে!
–হ্যাঁ, মিটিং করতে দেয় নি।
দেবু কিছুক্ষণ ভাবিয়া বলিল—বোধহয় প্রজা-সমিতি জমিদারের বিরোধী বলে দেয় নাই। তা ছাড়া ওটা তো আর ধর্মকর্ম নয়!
–প্রজা-সমিতি প্রজার মঙ্গলের জন্য। প্রজার মঙ্গল মানে জমিদারের সঙ্গে বিরোধ নয়। কোনো কোনো বিষয়ে বিরোধ আসে বটে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে নয়। আর চণ্ডীমণ্ডপ তো প্রজারাই করেছে, জমিদার করে দেয় নি। জায়গাটা শুধু জমিদারের। সে তো পথের জায়গাও জমিদারের। তা বলে প্রজা-সমিতির শোভাযাত্রা চলতে পারে না সে পথে? আর ধর্মকর্ম ছাড়া যদি অধিকার না থাকে, তবে জমিদারের খাজনা আদায়ই বা হয় কি করে ওখানে? দারোগাহাকিম এলেই বা মজলিস হয় কেন?
দেবু আশ্চর্য হইয়া গেল। ইহার মধ্যে ছেলেটি এত সংবাদ লইয়াছে।
