হাসিয়া যতীন বলিল—আমি দুজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তারা বললেন—চুন চার আনা, একটা রাজমিস্ত্রির আরোজের মজুরি চার আনা, একটা মজুরের আধরোজ দু আনা। মোট এই দশ আনা, কেমন?
–হ্যাঁ। তবে পাটও কিছু লাগবে পোচড়ার জন্যে।
—বেশ, সেও ধরুন দু আনা। এই বার আনা। একটি টাকা বাহির করিয়া যতীন শ্রীহরির সম্মুখে নামাইয়া দিয়া বলিলবাকিটা আমায় পাঠিয়ে দেবেন।
সে উঠিয়া পড়িল। দেবুও সঙ্গে সঙ্গে উঠিল। যতীন হাসিয়া বলিল-আমার ওখানেই আসুন, দেবুবাবু। নলিনের অ্যাঁকা অনেক ছবি আছে, দেখবেন। এস নলিন—এস।
শ্ৰীহরি ডাকিল—খুড়ো, একটা কথা!
দেবু ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল–বল।
–একটু এধারে এস বাবা। সব কথা কি সবার সামনে বলা চলে?
শ্ৰীহরি হাসিল। ষষ্ঠীতলার কাছে নির্জনে আসিয়া শ্ৰীহরি বলিলগতবার চোত-কিস্তি থেকেই তোমার খাজনা বাকি রয়েছে, খুড়ো। এবার সমবৎসর। কিস্তির আগেই একটা ব্যবস্থা কোরো বাবা।
দেবুর মুখ মুহুর্তে অপ্রসন্ন হইয়া উঠিল! গতকালের কথা তাহার মনে পড়িল! বোধ হইল, শ্ৰীহরি তাহাকে শাসাইতেছে। সে সংযত স্বরে বলিল-আচ্ছা, দেব। কিস্তির মধ্যেই দোব।
***
উনিশ শো চব্বিশ খ্রিস্টাব্দে বিশেষ ক্ষমতাবলে ইংরেজ সরকারের প্রণয়ন করা আইন আটক-আইন। নানা গণ্ডিবন্ধনে আবদ্ধ করিয়া বিশেষ থানার নিকটবর্তী পল্লীতে রাজনৈতিক অপরাধ-সন্দেহে বাঙালি তরুণদের আটক রাখার ব্যবস্থা হইয়াছিল। বাংলা সরকারের সেই আটক-আইনের বন্দি যতীন। যতীনের বয়স বেশি নয়, সতের-আঠার বৎসরের কিশোর, যৌবনে সবে পদার্পণ করিয়াছে। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ রঙ, রুক্ষ বড় বড় চুল, ছিপছিপে লম্বা, সর্বাঙ্গে একটি কমনীয় লাবণ্য; চোখ দুটি ঝকঝকে, চশমার আবরণের মধ্যে সে দুটিকে আরও আশ্চর্য দেখায়।
অনিরুদ্ধের বাহিরের ঘরের বারান্দায় একখানা তক্তপোশ পাতিয়া সেইখানে যতীন আসর করিয়া বসে। গ্রামের ছেলের দল তো এইখানেই পড়িয়া থাকে। বয়স্কেরাও সকলেই আসে তারা নাপিত, গিরিশ ছুতার, গাঁজাখোর গদাই পাল, বৃদ্ধ দ্বারকা চৌধুরীও আসেন। সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ করিয়া বৃন্দাবন দত্তও আসে; মজুর খাঁটিয়া কোনোরূপে বাঁচিয়া আছে তারিণী পাল—সেও আসিয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকে। কোনো কোনো দিন শ্রীহরিও পথে যাইতেআসিতে এক-আধবার বসে। বাউরিপাড়া-বায়েনপাড়ার লোকেরাও আসে। গ্রাম্যবধূ ও ঝিউড়ি মেয়েগুলি দূর হইতে তাহাকে দেখে। বুড়ি রাঙাদিদি মধ্যে মধ্যে যতীনের সঙ্গে কথা বলে। কোনোদিন নাড়ু, কোনোদিন কলা, কোনোদিন অন্য কিছু দিয়া সে যতীনকে দেখিয়া আপন মনেই পঁচালির একটি কলি আবৃত্তি করে–
অঙ্কুর পাষাণ হিয়া, সোনার গোপালে নিয়া
শূন্য কৈল যশোদার কোল।
যতীনও মধ্যে মধ্যে আপনার মনে গুনগুন করিয়া আবৃত্তি করে–রবীন্দ্রনাথের কবিতা।
দুইটা লাইন এই পল্লীর মধ্যে তাহার অন্তরীণ জীবনে অহরহ গুঞ্জন করিয়া ফেরে–
সব ঠাঁই মোর ঘর আছে…
ঘরে ঘরে আছে পরমাত্মীয়…
সমগ্র বাংলাদেশ যেন এই পল্লীটির ক্ষুদ্র আয়তনের মধ্যে রূপায়িত হইয়া ধরা দিয়াছে তাহার কাছে। এখানে পদার্পণমাত্র গ্রামখানি এক মুহুর্তে তাহার আপন ঘরে পরিণত হইয়া উঠিয়াছে। এখানকার প্রতিটি মানুষ তাহার ঘনিষ্ঠতম প্রিয়জন, পরমাত্মীয়। কেমন করিয়া যে এমন হইল—এ সত্য তাহার কাছে এক পরমাশ্চর্য। শহরের ছেলে সে, কলিকাতায় তাহার বাড়ি। জীবনে পল্লীগ্রাম এমন করিয়া কখনও দেখে নাই। আটক-আইনে গ্রেপ্তার হইয়া প্রথমে কিছুদিন ছিল জেলে। তারপর কিছুদিন ছিল বিভিন্ন জেলার সদরে মহকুমা শহরে। এই মহকুমা শহরগুলি অদ্ভুত। সেখানে পল্লীর আভাস কিছু আছে, কিছু কিছু মাঠঘাট আছে, কৃষি এখনও সেখানকার জীবিকার একটা মুখ্য বা গৌণ অংশ; ক্ষুদ্ৰ ক্ষুদ্ৰ সমাজও আছে। ঠিক সমাজ নয়–দল। সমাজ ভাঙিয়া শিক্ষা, সম্মান ও অর্থবলের পার্থক্য লইয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে পরিণত হইয়াছে। সঙ্কীর্ণ, আত্মকেন্দ্রিক, পরস্পরের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ। সেখানে পল্লীর আভাস তৈলচিত্রের রঙের প্রলেপ অবলুপ্ত কাপড়ের আভাসের মতই—অস্পষ্ট ইঙ্গিতে আছে। স্পষ্ট প্রভাব নাই প্রকাশ নাই।
তাই একেবারে খাঁটি পল্লীগ্রামে অন্তরীণ হইবার আদেশে সে অজানা আশঙ্কায় বিচলিত হইয়াছিল। কিন্তু প্রত্যক্ষ পরিচয় লাভে সে আশ্বস্ত হইয়াছে। সর্বত্র একটি পরমাশ্চর্য স্নেহস্পর্শ অনুভব করিয়াছে। অবশ্য এখানকার দীনতা, হীনতা, কদর্যতাও তাহার চোখ এড়ায় নাই। অশিক্ষা তো প্রত্যক্ষভাবে প্রকটিত। কিন্তু তবু ভাল লাগিয়াছে। এখানে মানুষ অশিক্ষিত অথচ শিক্ষার প্রভাবশূন্য অমানুষ নয়। অশিক্ষার দৈন্যে ইহারা সঙ্কুচিত, কুশিক্ষা বা অশিক্ষার ব্যর্থতার দম্ভে দাম্ভিক নয়। শিক্ষা এখানকার লোকের না থাক, একটা প্রাচীন জীর্ণ সংস্কৃতি আজও আছে, অবশ্য মুমূর্ষর মতই কোনোমতে টিকিয়া আছে। কিন্তু তাহারও একটা আন্তরিকতা আছে।
শহরকে সে ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে। ওইখানেই তো চলিয়াছে মানুষের জয়যাত্রা। কিন্তু সে—মফস্বলের ওই উকিল-মোক্কার-আমলাসর্বস্ব, কতকগুলা পান-বিড়ি-মনিহারী দোকানদার, ক্ষুদ্ৰ চালের কলওয়ালা, তামাকের আড়ওয়ালা ও কাপড়ওয়ালাদের দলপ্রধান ছোট শহর নয়। সে শহরের ঊর্ধ্বলোকে শত শত কলকারখানার চিমনি উদ্যত হইয়া আছে তপস্বীর উর্ধ্ববাহুর। মত। অবিশ্বাস্য অপরিমেয় তাহাদের শক্তি। বন্দি দানবের মত যন্ত্রশক্তির মধ্য দিয়া সে শক্তির ক্ৰিয়া চলিতেছে। উৎপাদন করিতেছে বিপুল সম্পদ-সম্ভার। কিন্তু তবু মরণোখ পল্লীকে তাহার ভাল লাগিয়াছে। বিগত যুগের মুমূর্ষ প্রাচীন, যাহার সঙ্গে নব যুগের পার্থক্য অনেক,-সেই মুমূর্ষ প্রাচীনের সকরুণ বিদায় সম্ভাষণ যেমন নবীনকে অভিভূত করে, তেমনি এই মরণোন্মুখ প্রাচীন সংস্কৃতির আপ্যায়নও তাহার কাছে বড় সকরুণ ও মধুর বলিয়া মনে হইতেছে।
