ছোঁড়া আবার মাহিনা-কাপড়ের জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছে। বিলুরও কাপড় ছিঁড়িয়াছে। নিজেরও চাই। যেমন করে পর কাপড় চৈতে হবে কানি-কথাটা মিথ্যে নয়। কিন্তু কি করিবে? পোস্ট আপিসে সঞ্চয়ের টাকাগুলির আর কিছু অবশিষ্ট নাই।
চিন্তাটা ছিন্ন হইয়া গেল। কোথায় যেন একঘেয়ে চিৎকার উঠিতেছে। কোথায় কাহারা উচ্চ-কর্কশকণ্ঠে যেন গালিগালাজ করিতেছে, কাহাদেরও ঝগড়া বাঁধিয়াছে; সম্ভবত একটা কণ্ঠস্বর রাঙাদিদির! বুড়ির আবার কাহার সঙ্গে কি হইলঃ বিলুকেই সে প্রশ্ন করিল, রাঙাদিদি কার সঙ্গে লাগল বল তো?
বিলু হাসিয়া বলিল লাগে নি কারু সঙ্গে। বুড়ি গাল দিচ্ছে নিজের বাপকে আর দেবতাকে। আজকাল রোজ সকালে উঠে দেয়। বুড়ো হয়েছে, একা কাজকর্ম করতে কষ্ট হয়, সকালে উঠে তাই রোজ ওই গাল দেবে। বাপকে গাল দেয়—বাশ-বুকো রাক্কোস, জমিজেরাতগুলো সব নিজে পেটে পুরে গিয়েছে, আর দেবতাকে গাল দেয় চোখ-খেগো, কানা হও তুমি।
দেবু হাসিল; তারপর বলিল—কিন্তু আরও একজন যে গাল দিচ্ছে। কাসার আওয়াজের মত অল্পবয়সী গলা!
–ও পদ্ম, কামার-বউ!
–অনিরুদ্ধের বউ?
–হ্যাঁ। বোধহয় আমাদের ভাসুরপো–মানে শ্রীহরিকে গাল দিচ্ছে। মধ্যে মধ্যে অমন দেয়। আজও দিচ্ছে বোধহয়। মাঝখানে তো পাগলের মত হয়ে গিয়েছিল। এখন একটুকু ভাল। ওদিকে কর্মকার তো একরকম কাজের বার হয়ে গেল। এক একদিন মদ খেয়ে যা করে। একটা লোহার ডাণ্ডা হাতে করে বেড়ায়, আর চেঁচায়—খুন করেঙ্গা। যার-তার বাড়িতে খায়।
—মানে দুর্গার বাড়িতে তো?
–হ্যাঁ!
–ছি! ছিঃ ছি! দুর্গার ওই দোষটা গেল না। ওই এক দোষেই ওর সব গুণ নষ্ট হয়েছে।
বিলু বলিল–মদ খেয়ে মাতাল হয়ে খেতে দে খেতে দে করে হাঙ্গামা করলে দুর্গা আর কি করবে বল? অবিশ্যি কিছুদিন দুর্গার ঘরে রাত কাটাত কর্মকার। কিন্তু আজকাল দুর্গা তো রাত্রে ঘরে ঢুকতে দেয় না। কামার তবু পড়ে থাকে ওদের উঠানে, কোনোদিন বাগানে, কোনোদিন রাস্তায়, কোনোদিন অন্য কোথাও।
–হ্যাঁ, আজকাল অনিরুদ্ধের তো পয়সা-কড়ি নাই। দুর্গা আর–
–না-না-না, তা বোলো না। দুর্গা কোনোদিনই পয়সা নেয় নাই কর্মকারের কাছে। ও-ই বরং দুটাকা চার টাকা করে দিয়েছে মধ্যে মধ্যে। আমার হাতে দিয়ে বলেছে—বিলু-দিদি, তুমি কামার-বউকে দিয়ো, আমি দিলে তো নেবে না!
–ছিঃ! তুমি ওইসব জঘন্য ব্যাপারের মধ্যে গিয়েছিলে?
বিলু কিছুক্ষণ নতমুখে থাকিয়া বলিল—কি করব বল, কামার-বউ তখন ক্ষ্যাপার মত হাঁড়ি চড়ে না। খেতে পায় না। পদ্মও না, কর্মকারও না। আমার হাতেও কিছুই ছিল না যে দোব। একদিন দুর্গা এসে অনেক কাকুতি-মিনতি করে বললে। কি করব বল!
—হুঁ। দেবুর একটা কথা মনে পড়িল। নজরবন্দির জন্য অনিরুদ্ধের ঘর দুর্গাই তো দারোগাকে বলে ভাড়া করিয়ে দিয়েছে শুনলাম।
তা সে অনেক পরের কথা। একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল হ্যাঁ, নজরবন্দি ছেলেটি বড় ভাল, বাপু। কামার-বউকে মা বলে। গায়ের ছেলেরাও ওর কাছে ভিড় জমিয়ে বসে থাকে।
—বস তুমি। আমি আসি একবার যতীনবাবুর সঙ্গেই দেখা করে।
পথে চণ্ডীমণ্ডপ হইতে ডাকিল শ্ৰীহরি। সেখানেও চারপাশে একটি ছোটখাটো ভিড় জমিয়া রহিয়াছে। দেবু অনুমানে বুঝিল, খাজনা আদায়ের পর্ব চলিতেছে। চৈত্র মাসের বারই-তেরই, ইংরাজি আটাশে মার্চ সরকার-দপ্তরে রাজস্ব দাখিলের শেষ দিন। তা ছাড়া চৈত্র-কিস্তি, আখেরি।
দেবু বলিল–ওবেলা আসব ভাইপো।
শ্ৰীহরি বলিল—সঁচ মিনিট। গ্রামের ব্যাপারটা দেখে যাও। যেন অরাজক হয়েছে।
দেবু উঠিয়া আসিল। দেখিল বৈরাগীদের নেলো অর্থাৎ নলিন হাত জোড় করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। ও-পাশে তাহার মা কাঁদিতেছে।
শ্ৰীহরি বলিলই দেখ, ছোঁড়ার কাও দেখ। আঙুল দিয়া সে দেখাইয়া দিল চণ্ডীমণ্ডপের চুনকাম-করা একটি থাম। সেই চুনকাম-করা থামের সাদা জমির উপর কয়লা দিয়া অ্যাঁকা এক বিচিত্র ছবি। মা-কালীর এক মূর্তি।
দেবু নেলোকে জিজ্ঞাসা করিলা রে, তুই এঁকেছিস?
নেলো ঘাড় নাড়িয়া সায় দিয়া উত্তর দিল—হ্যাঁ।
—চুনকাম-করা চণ্ডীমণ্ডপের উপর কি করেছে একবার দেখ দেখি?
–পট এঁকেছেন।
ইহার পর নেলোকেই সে বলিল—চুনকামের খরচা দে, দিয়ে উঠে যা!
দেবু তখনও ছবিখানি দেখিতেছিল—বেশ অ্যাঁকিয়াছিল নেলো। তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলকার কাছে অ্যাঁকতে শিখলি তুই?
নেলো রুদ্ধস্বরে কোনোমতে উত্তর দিল—আপুনি আপুনি, আজ্ঞে।
–নিজে নিজে শিখেছিস?
শ্ৰীহরি এই প্রশ্নের উত্তর দিল–হ্যাঁ, হ্যাঁ। ছোঁড়ার ওই কাজ হয়েছে, বুঝলে কিনা! লোকের দেওয়ালে, সিমেন্টের উঠানে, এমনকি বড় বড় গাছের গায়ে পর্যন্ত কয়লা দিয়ে ছবি অ্যাঁকবে। তারপর ওই নজরবন্দি ছোকরা ওর মাথা খেল! অনিরুদ্ধের বাইরের ঘরে ছোকরা থাকে, দেখো না একবার তার দেওয়ালটা একেবারে চিত্ৰি-বিচিত্রে ভর্তি। এখন চণ্ডীমণ্ডপের উপর লেগেছে। কাল দুপুরবেলায় কাজটি করেছে।
দেবু হাসিয়া বলিল—নেলো অন্যায় করেছে বটে, কিন্তু এঁকেছে ভাল, কালীমূর্তিটি খাসা হয়েছে।
–নমস্কার, ঘোষমশায়! ওদিকের সিঁড়ি দিয়া পথ হইতে উঠিয়া আসিল ডেটিনিউ যতীন। দেবুকে দেখিয়া সে বলিল এই যে আপনিও রয়েছেন দেখছি! আপনার ওখানেই যাচ্ছিলাম।
—আমিও যাচ্ছিলাম আপনার কাছেই।
–দাঁড়ান, কাজটা সেরে নি। ঘোষমশায়, ওই মাথাট য় কলি ফেরাতে কত খরচ হবে?
শ্ৰীহরি বলিলখরচ সামান্য কিছু হবে বৈকি। কিন্তু কথা তো তা নয়, কথা হচ্ছে নেলোকে শাসন করা।
