বাধা দিয়া যতীন বলিল-নাও, গান আরম্ভ কর।
গায়ক ও বাদকের দল অপেক্ষা করিয়াই ছিল, তাহারা আরম্ভ করিয়া দিল। ঢোলকের বাজনার সঙ্গে মন্দিরার ধ্বনি; গায়কের দল আরম্ভ করিল—
শিব-শিবরাম-রাম।
ছোট ছেলের দল নাচিতে নাচিতে হাতে তালি দিয়া ধুয়া ধরিল—
শিব-শিবরাম-রাম।
গায়কেরা গান গাহিল—
এক ঘেঁটু তার সাত বেটা।
সাত বেটা তার সাতান্ত।
এক বেটা তার মহান্ত।
মহান্ত ভাই রে,
ফুল তুলতে যাই রে,
যত ফুল পাই রে,
আমার ঘেঁটুকে সাজাই রে!
সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক লাইনের পর ছেলেরা তালি দিয়া গান গাহিয়া গেল—শিব-শিব-রাম-রাম।
এই গান শেষ হইবার পর আরম্ভ হইল অন্য গান। স্থানীয় বিশেষ ঘটনাকে অবলম্বন করিয়া ইহাদের গান আছে—
হয় এ জল কোথায় ছিল।
জলে জলে বাংলা মুলুক ভে-সে গেল!
বহুদিন আগে যখন রেলওয়ে-লাইন পড়িয়ছিল, সে গান আজও ইহারা গায়—
সাহেব রাস্তা বাঁধালে।
ছমাসের পথ কলের গাড়ি দণ্ডে চালালে!
অজন্মার বৎসরের গান–
ঈশান কোণে ম্যাঘ লেগেছে দেবতা করলে শুকো।
এক ছিলম তামুক দাও গো সঙ্গে আছে হুঁকো।
আজ তাহারা আরম্ভ করিল–
দেশে আসিল জরিপ!
রাজা-পেজা ছেলে-বুড়োর বুক টিপটিপ।
ছেলেরা ধুয়া ধরিল—
হয় বাবা কি করি উপায়?
প্ৰাণ যায় তাকে পারিমান রাখা দা-য়।
গায়কেরা গাহিয়া চলিল—
পিয়ন এল, আমিন এল, এল কানুনগো,
বুড়োশিবের দরবারে মানত মানুন্ গো।
বুঝি আর মান থাকে না।।
ছেলেরা গাহিল,
হায় বাবা, কি করি উপায়?
হাকিম এল ঘোড়ায় চড়ে, সঙ্গেতে পেশকার,
আত্মারাম খাঁচা-ছাড়া হল দেশটায়।
বুঝি আর মান থাকে না।।
তাঁবু এল, চেয়ার এল, কাগজ গাড়ি গাড়ি,
নোয়ারই ছেকল এল চল্লিশ মন ভারী।
ক্ষেতে বুঝি ধান থাকে না।।
তে-ঠেঙে টেবিল পেতে লাগিয়ে দূরবীন,
এখানে ওখানে পোতে চিনেমাটির পিন।
কুলিদের প্রাণ থাকে না।।
কুঁচবরন রাঙা চোখ তারার মতন ঘোরে।
দন্তকড়মড়ি হাঁকে—এই উল্লুক ওরে
হায় কলিতে মাটি ফাটে না।।
পণ্ডিতমশায় দেবু ঘোষ তেজীয়ান বিদ্বান,
জানের চেয়ে তার কাছে বেশি হল মান।
ও সে আর সইতে পারে না।।
কানুনগো কহিল তুই, সে করে তুকারি
আমার কাছে খাটবে না তোর কোনো জুরি-জারি
দেবু কারুর ধার ধারে না।।
দেবু ঘোষের পাকা ধানে ছেকল চল্লিশ মন,
টেনে নিয়ে চলে আমিন ঝন্-ঝন্-ঝন্।
ও সে কারুর মানা মানে না।।
দেবু হাসিল। বলিল—এসব করেছ কি সতীশ?
যতীন মুগ্ধ হইয়া শুনিতেছিল। গায়কেরা তাহার পরের ঘটনাও নিখুঁতভাবে বর্ণনা করিল। শেষে গাহিল—
দেবু ঘোষে বাঁধল এসে পুলিশ দারোগা,
বলে, কানুনগোর কাছে হাত জোড় করগা।
দেবু ঘোষ হেসে বলে না।।
থাকিল পিছনে পড়ে সোনার বরন নারী,
ননির পুতলি শিশু ধুলায় গড়াগড়ি।
তবু ঘোষের মন টলে না।।
চোখ মুছিতে মুছিতে দুর্গা বলিলতা তুমি পাষাণই বটে জামাই। মাগো, সে কি দিন। শুধু দুর্গা নয়, সমবেত মেয়েগুলি সকলেই আঁচল দিয়া চোখ মুছিতেছিল। সেদিনের কথা তাহাদের মনে আছে।
গায়কেরা গাহিল—
ফুলের মালা গলায় দিয়ে ঘোষ চলেন জেলে,
অধম সতীশ লুটায় এসে তাঁরই চরণ-তলে
দেবতা নইলে হায় এ কাজ কেউ পারে না।।
গান শেষ হইল। সতীশ আসিয়া দেবু ঘোষকে প্রণাম করিল। দেবুর বুকেও একটা আবেগ উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিয়াছিল; সে মুখে কিছু বলতে পারিল না, সতীশকে সস্নেহে ধরিয়া তুলিল।
জগন বলিল—তোকে আমি একটা মেডেল দেব সতীশ!
হরেন বলিল-আচ্ছা সতীশ, মালাটা যে আমিই দিয়েছিলাম সে কথাটা বাদ গিয়েছে কেন? মালা আছে, গলা আছে, আমি নাই! বাঃ!
যতীন স্বপ্নাচ্ছন্নের মত উঠিয়া দাঁড়াইল। সমস্ত অনুষ্ঠানটাই তাহার কাছে অদ্ভুত ভাল লাগিয়াছে। সতীশকে মনে মনে নমস্কার করিল। বলিল—তোমাদের গানগুলো আমাদের লিখে। দেবে সতীশ?
–আজ্ঞে? সতীশ অপ্রস্তুতের মত হাসিতে লাগিল।—আপনি নিকে নেবেন?
–হ্যাঁ।
–সত্যি বলছেন, বাবু!
–হ্যাঁ হে।
নিঃশব্দে আকৰ্ণবিস্তার হাসিতে সতীশের মুখ ভরিয়া গেল। সে কৃতার্থ হইয়া গিয়াছে।
দেবু বলিল, আজ তো আপনার সঙ্গে আলাপ হল না, কাল—
যতীন বলিল-আলাপ তো হয়ে গেছে। আলোচনা বাকি আছে। কাল আমিই আপনার বাড়ি যাব।
১৯. শিবকালীপুরের অদ্ভুত এক রূপ
এই একটি দিন। শুধু একটি দিনের জন্যই দেবু, কেবল দেবুই দেখিল—শিবকালীপুরের অদ্ভুত এক রূপ। শুধু রূপ নয়, তাহার স্পর্শ তাহার স্বাদ সবই একটি দিনের জন্য দেবুর কাছে মধুময় হইয়া দেখা দিল। পরের দিন হইতে কিন্তু আবার সেই পুরনো শিবকালীপুর। সেই দীনতাহীনতা, হিংসায় জর্জর মানুষ, দারিদ্র্য-দুঃখ-রোগপ্ৰপীড়িত গ্রাম। কালও গ্রামখানির গাছপালাপাতা-ফল-ফুলের মধ্যে যে অভিনব মাধুর্য দেবুর চোখে পড়িয়াছিল, নাবি আমের মুকুলের গন্ধে সে যে তৃপ্তি অনুভব করিয়াছিল, আজ তাহার কিছুই সে অনুভব করি না।
আপনার দাওয়ায় বসিয়া সে ভাবিতেছিল অনেক কথা—এলোমেলো বিচ্ছিন্ন ধারায়। প্রথমেই মনে হইল গ্রামখানার সর্বাঙ্গে যেন ধুলা লাগিয়াছে! পথ কয়টায় এক-পা গভীর হইয়া ধূলা জমিয়াছে। ডোবার পুকুরের জল মরিয়া আসিয়াছে, অল্প জলে পানাগুলা পচিতে আরম্ভ করিয়াছে। গ্রামে জলের অভাব দেখা দিল। গরু বাছুর গাছপালা লইয়া জলের জন্য বৈশাখজ্যৈষ্ঠে আর কষ্টের সীমা-পরিসীমা থাকিবে না। বাড়িতে অনেকগুলি গাছ হইয়াছে, দৈনিক জলের প্রয়োজন হইবে।
আর গাছ লাগাইয়াই বা ফল কি? তাহার বাড়ির যে কুমড়ার লতাটি প্রাচীর ভরিয়া উঠিয়াছে, সেই গাছটায় কয়টা কুমড়া ধরিয়াছিল, তাহার মধ্যে তিনটা কুমড়া কাল রাত্রে কে ছিঁড়িয়া লইয়া গিয়াছে। তাহার বাড়ির রাখাল ছোঁড়াটা গাছটা পুঁতিয়াছিল-সে তারস্বরে চিৎকার করিয়া গালি দিতেছে অজ্ঞাতনামা চোরকে।
