সুদ শ্ৰীহরি ছাড়ে কি করিয়া?
দেবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল; শ্রীহরির দিকটা ভাবিতে ভাবিতে তাহার মনে পড়িয়া গেল—বাল্যকালের স্মৃতি। ঋণের দায়ে কঙ্কণার বাবুদের দ্বারা তাহাদের অস্থাবর-ক্রোকের কথা। সে শিহরিয়া উঠিল। খাতকের দিকটা দেবুর চোখের উপর ভাসিতে লাগিল। জমিজমা যায়, পুকুর-বাগান যায়, ক্ষেত-খামার যায়, তাহার পর গরু-বাছুর যায়; তাহার পর থালা-কাসা যায়, তাহার পর যায় বাস্তুভিটা। মানুষ পথের উপর গিয়া দাঁড়ায়। তিন বছর অন্তর অন্তর হ্যান্ডনোট পাল্টাইয়া একশো টাকা কয়েক বছরে অনায়াসে হাজার টাকায় গিয়া দাঁড়ায়, ইহাও আইনসম্মত। যখন আইনসম্মত তখন ইহাই ন্যায়। ইহাই যদি ন্যায় তবে সংসারে অন্যায়টা কি?
তাহার চিন্তাকে বিঘ্নিত করিয়া শ্ৰীহরি বলিল, এই দেখ, সেটেলমেন্টের তিনধারা আসছে, পাঁচধারার কোৰ্ট আসছে! এদিকে প্রজা-সমিতি করে ডাক্তার ধুয়ে তুলেছে—এ গাঁয়ের সব জমি মোকররী জমা। এ মৌজায় নাকি কখনও বৃদ্ধি হয় না! তোমাকে আমি কাগজ দেখাব, বার শো সত্তর সালের কাগজ; তামাম জমায় বৃদ্ধি করা আছে; একটি জমাও মিেকররী দাঁড়াবে না। জমিদার বৃদ্ধি দাবি করবে। হয়ত হাঙ্গামা বাধাবে ওরা। মামলা হবে। আইনে জমিদারের প্রাপ্য—সে পাবেই। আর যখন আইনসম্মত তখন আর তার অপরাধটা কোথায় বল? পঞ্চাশ বছরে ফসলের দাম অন্তত তিনগুণ বেড়েছে! জমিদার পাবে না?
দেবু এ কথারও কোনো উত্তর দিতে পারিল না। ফসলের দাম সত্যই বাড়িয়াছে। কিন্তু তাহাতে প্রজাদের আয় বাড়িয়াও বাড়ে নাই, বাজারদরে সব খাইয়া গেল। মানুষের অভাব বাড়িয়াছে, ইহার ওপরে খাজনা বৃদ্ধি!
শ্ৰীহরি বলিল—শোন খুড়ো, দৈবের বিপাকে অনেক কষ্ট পেলে। আর বাবা, আর ওসব পথে যেয়ো না তুমি; খাও-দাও, কাজকর্ম কর, লোকের উপকার করা–তোমার উপরে লোকেও আশা করে—আমরাও করি। সেই কথাই আজ দারোগা বললেন, পণ্ডিতকে বারণ করে দিও, ঘোষ, ওসব যেন না করে। তা একটা কথা লিখে দাও তুমিওরা তোমাকে নির্ঝঞ্ঝাট করে দেবে। স্কুলের চাকরিও তোমারই আছে, একটা বন্ড লিখে দিলেই তুমি পাবে। আর ওই নজরবন্দি ছোকরার সঙ্গে তুমি যেন মিশো-টিশো না বাপু, বুঝলে?
এবার দেবু হাসিয়া বলিল–বুঝলাম সব।
—তা হলে কালই চল আমার সঙ্গে।
–না, তা পারব না ছি। আমি তো অন্যায় কিছু করি নি।
–কাজ ভাল করছ না খুড়ো। আচ্ছা, দুদিন ভেবে দেখো তুমি।
–আচ্ছা।
হাসিয়া দেবু উঠিয়া চলিয়া আসিল। চণ্ডীমণ্ডপ হইতে পথের উপর নামিতে নামিতেই কাহারা জনদুয়েক তাহাকে হেঁট হইয়া নমস্কার করিয়া সম্মুখে দাঁড়াইল।
—কে, সতীশ?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
–কি ব্যাপার?
–আজ্ঞে, আমাদের পাড়ায় একবার পদান করতে হবে আপনাকে।
–কেন? কি হল? ও ঘেটু-গান? আজ থাক সতীশ অন্য একদিন হবে।
–আজ্ঞে, আপনাকে শোনাবার জন্যে আসর পেতেছি আমরা। তারপর ফিসফিস করিয়া বলিলনজরবন্দি বাবুও আইচেন; তিনি বসে রইচেন; ডাক্তারবাবু রইচেন।
–নজরবন্দি বাবুটি আছেন? আচ্ছা চল তবে।
***
চৈত্র মাসে ঘণ্টাকর্ণের পূজা। ঘেঁটুপূজা, পঞ্জিকার ঘণ্টাকর্ণ নয়। পঞ্জিকার ঘণ্টাকর্ণ বসন্ত–রোগ-নিবারক মহাবল ঘণ্টাকর্ণের পূজা। এই ঘণ্টাকর্ণঘেঁটু গাজনের অঙ্গ। বিষ্ণুবিরোধী শিবভক্ত ঘণ্টাকর্ণ ছিল পিশাচ। সে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করিয়া রুদ্র দেবতার এবং বিষ্ণু দেবতার উভয়েরই প্রসাদ লাভ করিয়াছিল। এই একাধারে ভক্ত ও পিশাচ ঘণ্টাকর্ণের পূজা করে বাংলার নিম্ন জাতীয়েরা। সমস্ত মাস ধরিয়া ঘেঁটুর গান গাহিয়া বাড়ি বাড়ি ঘুরিয়া বেড়ায়। চাল-ডাল সিধা মাগিয়া মাসান্তে গাজনের সময় উৎসব করে।
চৈত্র মাসের সন্ধ্যা। ধর্মরাজের স্থানে বকুলগাছতলায় আসন পড়িয়াছে। বকুলের গন্ধে সমস্ত জায়গাটা ভুরভুর করিতেছে। আকাশে চাঁদ ছিল—শুক্লপক্ষের দ্বাদশীর রাত্রি। একদিকে মেয়েরা অন্যদিকে পুরুষদের আসর। দুই আসরের মাঝখানে বসিলনজরবন্দি বাবুটি, পণ্ডিতমশায়, ডাক্তারবাবু ও হরেন ঘোষাল। চারিটি মোড়াও তাহারা যোগাড় করিয়াছে। বাসন্তী সন্ধ্যার জ্যোৎস্না-আকাশ হইতে মাটির বুক পর্যন্ত যেন এক স্বপ্নকুহেলিকাময় আলোর জাল বিছাইয়া দিয়াছিল।
দেবুর মনে পড়িয়া গেল—বাল্যকালে তাহারা ঘেঁটু-গান শুনিতে এখানে আসিত। এমনই জ্যোত্মার আলোতে আসর বসিত। যাইবার সময় আঁচল ভরিয়া কুড়াইয়া লইয়া যাইত বকুল ফুল। তখন সতীশেরা সদ্য জোয়ান, উহারাই গাহিত গান—আর তাহাদের বয়সীরা ধুয়া গাহিত, নাচিত। তখন কিন্তু ঘেঁটুর আসর ছিল জমজমাট। সে কত লোক! সে তুলনায় এ আসর অনেক। ছোট। বিশেষ করিয়া পুরুষের দলই যেন অল্প। দেবু বলিল—সে আমলের মত কিন্তু আসর নাই। তোমাদের, সতীশ।
সতীশ বলিলপাড়ার সিকি মরদই এখনও আসে নাই, পণ্ডিতমশাই।
—কেন? কোথায় গিয়েছে?
–আজ্ঞে, প্যাটের দায়ে। গায়ে চাকরি মেলে না; গেরস্তরা ফেরার হয়ে গেল, মুনিষ-জন রাখতে পারে না। আমাদেরও ছেলে-পিলে বেড়েছে। এখন ভিন্গায়ে চাকরি করতে হয়। চাকরি সেরে ফিরতে একপহর রাত হয়ে যায়। তা ঘেটু-গান করবে কখন শুনবে কখন, বলেন?
জগন বলিল—পেটেই তোদের আগুন লেগেছে রে, পেট আর কিছুতেই ভরছে না!
সতীশ হাত জোড় করিয়া বলিলতা আজ্ঞে আপুনি ঠিক বলেছেন ডাক্তোরবাবু; প্যাটে আগুনই নেগেছে বটে। মেয়েরা পর্যন্ত রোজ খাটতে যাচ্ছে। কি করব বলুনঃ পঞ্চায়েত করে বারণ করলাম। তা কে শুনছে? সব ছুটছে তো ছুটছে। আর অভাবও যা হয়েছে, বুঝলেন!।
