কথাটার অর্থ ব্যাপক।
রামনারায়ণ আসিয়া বলিল ভাল আছ দেবু-ভাই? আমার মা-টি মারা গিয়েছেন।
বৃন্দাবন দোকানি বলিলচালের ব্যবসায় অনেক টাকা লোকসান দিলম দেবু-ভাই। যারা চালের ব্যবসা করেছিল তারা সবাই দিয়েছে। জংশনের রামলাল ভকত তো লালবাতি জ্বেলে দিল।
বৃদ্ধ মুকুন্দ একটি খোকাকে কোলে করিয়া দেখাইতে আসিয়াছিল, আমাদের সুরেন্দ্রের ছেলে, দেখ বাবা দেবু।
মুকুন্দের পুত্র গোবিন্দ, গোবিন্দের পুত্র সুরেন্দ্র, সুতরাং সুরেন্দ্রের ছেলে তাহার প্রপৌত্র।
সন্ধ্যার মুখে নিজে আসিল শ্ৰীহরি। শ্ৰীহরি এখন সম্ভ্ৰান্ত লোক। লম্বা চওড়া পেশি-সবল যে জোয়ান চাষী নগ্নদেহে কোদাল হাতে ঘুরিয়া বেড়াইত, দুর্দান্ত বিক্ৰমে দৈহিক শক্তির আস্ফালন করিয়া ফিরিত, সামান্য কথায় শক্তি প্রয়োগ করিত, জোর করিয়া পরের সীমানা খানিকটা আত্মসাৎ করিয়া লইত, কর্কশ উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করিত—সে-ই গ্রামের প্রধান ব্যক্তি, তাহার অপেক্ষা বড় কেহ নাই, সেই ছিরু পালের সঙ্গে এই শ্ৰীহরির কোনো সাদৃশ্য নাই। শ্ৰীহরি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মানুষ! তাহার পায়ে ভাল চটি, গায়ে ফতুয়ার উপর চাদর; গম্ভীর সংযত মূৰ্তি, সে এখন গ্রামের গোমস্তা—মহাজন। বলিতে গেলে সে এখন গ্রামের অধিপতি।
–দেবু-খুড়ো রয়েছ নাকি হে? হাসিমুখে শ্ৰীহরি আসিয়া দাঁড়াইল।
–এস ভাইপো এস। দেবুও তাহাকে সম্ভ্ৰম করিয়া স্বাগত সম্ভাষণ জানাইল। দেবু বাহির হইবার উদ্যোগ করিতেছিল। অনিরুদ্ধের ওখানে যাইবার ইচ্ছা ছিল। ডেটিনিউ যতীনবাবু সেই তাহাকে চণ্ডীমণ্ডপে পৌঁছাইয়া দিয়া চলিয়া গিয়াছে, তাহার সঙ্গে একবার দেখা করিবার জন্য সে ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল। অনিরুদ্ধও সেই চলিয়া গিয়াছে। সে নাকি এখন মাতাল, দুর্গার ঘরে রাত্রি যাপন করে, তাহার অনুগ্রহণেও অরুচি নাই তাহার, জমি-জমা নিলামে উঠিয়াছে।
অনি-ভাইয়ের জন্য দুঃখ হয়। কি হইয়া গেল সে! তাহার একটা কথা মনে পড়িয়া গেল, চৌধুরীই বলিয়াছেন পণ্ডিত! মা-লক্ষ্মীর নাম শ্ৰী শ্ৰী যার আছে—তারই শ্ৰী আছে; সে মনে বল, চেহারায় বল, প্রকৃতিতে বল। শ্ৰীহরির পরিবর্তন হবে বৈকি! আবার অভাবেই ওই দেখ, অনি-ভাইয়ের এমন দশা। তার ওপর কামার-বউয়ের অসুখ করে আরও এমনটি হয়ে গেল।
শ্ৰীহরি তাহাকে ডাকিয়া বলিল তোমাকে ডাকতে এসেছি। চল খুড়ো, চণ্ডীমণ্ডপে চল। ওখানেই এখন বসছি। চা হয়ে গিয়েছে, চল।
দেবু না বলতে পারি না। চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া শ্ৰীহরি বলিয়া গেল অনেক কথা।
এই চণ্ডীমণ্ডপে বসিবার জন্যই গ্রামে স্কুল-ঘর করা হইয়াছে। স্কুল-ঘরের মেঝে-বারান্দা সব পাকা করিয়া দিবার ইচ্ছা আছে। একজন ডাক্তারের সঙ্গেও তাহার কথা হইয়াছে। তাহাকে আনিয়া সে গ্রামে বসাইতে চায়। শ্ৰীহরিই তাহাকে থাকিবার ঘর দিবে, খাইতেও দিবে। জগনকে দিয়া আর চলে না। উহার ওষুধ নাই, সব জল, সব ফাঁকি।
দেবু চুপ করিয়া রহিল।
সেটেলমেন্টের খানাপুরী বুঝারত দুইটা শেষ হইয়া গিয়াছে। আর কোনো গণ্ডগোল হয় নাই। এই সমস্তই দেবুর জন্য, তাহা শ্ৰীহরি অস্বীকার করিল না। বলিলবুঝলে খুড়ড়া, শেষটা আমিন, কানুন্গো—আপনি ছাড়া কথা বলত না। আমরা তোমার নাম করতাম। এইবার হবে তিনধারা, তারপর পাঁচধারা।
শ্ৰীহরি আরও জানাইল দেবুর জমা-জমি সমস্তই সে নির্ভুল করিয়া সেটেলমেন্টে রেকর্ড করাইয়াছে। এমনকি কঙ্কণার বাবুদের কর্মচারী যে জমির টুকরাটি আত্মসাৎ করিয়াছিল—সেটি পর্যন্ত উদ্ধার করিয়াছে।
–তাও উদ্ধার হইয়াছে? দেবু বিস্মিত হইয়া গেল।
–হবে না! জমিদারির সেরেস্তার তামাম কাগজপত্র আমাদের হাতে, তার উপর দাশজীর পাকা মাথা! আমি দাশজীকে বললাম—দেবু-খুড়ড়া উপকার করলে দেশের লোকের, বাঘের দাঁত ভেঙে দিয়ে গেল, তার তার জমি কুকুরে খাবে তা হবে না। আমাদের এ উপকারটি না করলে চলবে না; আর তা ছাড়াতা ছাড়া; শ্রীহরি আকাশের দিকে চাহিয়া জোড়হাতে প্ৰণাম করিলভগবান যখন জন্ম দিয়েছেন, তখন উপকার ছাড়া অপকার কারুর করব না, খুড়ো। এই দেখ না হরিহরের কন্যে দুটিকে নিয়ে কি কেলেঙ্কারি কাণ্ড! কলকাতায় তো খাতায় নাম লিখেছিল। শেষে বিশ্রী কাণ্ড করে দেশে এল। গায়ের লোক পতিত করলে। আমি বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ক্ষান্ত করে আমার বাড়িতেই রেখেছি। লোকে বলে নানা কথা। তা আমি মিথ্যে বলব না খুড়ো, তুমি তো শুধু খুড়ো নও, বন্ধুলোক, একসঙ্গে পড়েছি! বাজারে-খাতাতেই যারা নাম লিখিয়েছিল, তাদের যদি আমি ওই জন্যে ঘরের একপাশে রেখে থাকি তো কি এমন দোষ করেছি, বল?
গড়গড়ার নলটা দেবুর হাতে দিয়া শ্ৰীহরি বলিলখাও খুড়ো।
–না। জেলখানায় গিয়ে বিড়ি তামাক ছেড়ে দিয়েছি।
–বেশ করেছ।
শ্ৰীহরির কথা ফুরাইতেই চায় না; কাহার বিপদের সময় তাহার উপকারের জন্য কত টাকা সে ধার দিয়াছে, আর সে এখন দিবার নাম করিতেছে না—সেই ইতিহাস আরম্ভ করিল।
শ্ৰীহরিকে দোষ দেওয়া যায় না। টাকা থাকা পাপ নয়, বে-আইনি নয়। কাহারও বিপদে টাকা ধার দিলে, খাতক সে সময়ে উপকৃতই হয়। কিন্তু সুদে-আসলে আদায়ের সময় তাহার যে কদর্য রূপটা বাহির হইয়া পড়ে, তাহা দেখিয়া খাতক আতঙ্কিত হয়, মহাজন ক্ষেত্রবিশেষে সঙ্কুচিত হইলেও সর্বক্ষেত্রে হয় না, কিন্তু ইহার জন্য দায়ী কে তাহা বলা শক্ত। সুদের জন্য মহাজনকে ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয়; হক পাওনা আদায়ের জন্য আদালতে কোর্ট-ফি লাগে; ইউনিয়নকে দিতে হয় চৌকিদারি ট্যাক্স।
