***
এক বৎসরের মধ্যে অনেক কিছু ঘটিয়া গিয়াছে। গ্রামের প্রতি জনে আসিয়া একে একে একবেলার মধ্যেই সব জানাইয়া দিল। জগন খবর দিল, সঙ্গে সঙ্গে হরেন ঘোষাল সায় দিল—
কিছু কিছু সংশোধনও করিয়া দিল।
গ্রামে প্রজা-সমিতি হইয়াছে, ওই সঙ্গে একটি কংগ্রেস-কমিটিও স্থাপিত হইয়াছে। জগন প্রেসিডেন্ট, হরেন সেক্রেটারি।
হরেন বলিল কথা আছে, তুমি এলেই তুমি হবে একটার প্রেসিডেন্ট যেটার খুশি। আমি বলি, তুমি হও কংগ্রেস-কমিটির প্রেসিডেন্ট। ডেটিনিউ যতীনবাবু বলেন–না, দেবুবাবু হবেন প্রজা-সমিতির প্রেসিডেন্ট।
—ছিরে পাল এখন গণ্যমান্য লোক। একটা গুড়গুড়ি কিনেছে, চণ্ডীমণ্ডপে শতরঞ্জি পেতে একটা তাকিয়া নিয়ে বসে। বেটা আবার গোমস্তা হয়েছে, গায়ের গোমস্তাগিরি নিয়েছে। একে মহাজন, তারপর হল গোমস্তা, সর্বনাশ করে দিলে গাঁয়ের!
জমিদারের এখন অবস্থা খারাপ, শ্ৰীহরির টাকা আছে, আদায় হোক না হোক, সমস্ত টাকা শ্ৰীহরি দিবে—এই শর্তে জমিদার শ্ৰীহরিকে গোমস্তাগিরি দিয়াছে। শ্ৰীহরি এখন এক ঢিলে দুই পাখি মারিতেছে। বাকি খাজনার নালিশের সুযোগে লোকের জমি নিলামে তুলিয়া আপন প্রাপ্য আদায় করিয়া লইতেছে সুদে-আসলে। সুদ-আসল আদায় হইয়াও আরও একটা মোটা লাভ থাকে।
গণেশ পালের জোত নিলাম হইয়া গিয়াছে, কিনিয়াছে শ্ৰীহরি; এখন গণেশের অবশিষ্ট শুধু কয়েক বিঘা কোফা জমি।
সর্বস্বান্ত তারিণীর ভিটাটুকুও শ্রীহরি কিনিয়াছে; এখন সেটা উহার গোয়ালবাড়ির অন্তর্ভুক্ত। তারিণীর স্ত্রীটা সেটেলমেন্টের একজন পিয়নের সঙ্গে পলাইয়া গিয়াছে। তারিণী মজুর খাটে; ছেলেটা থাকে জংশনে, স্টেশনে ভিক্ষা করে।
পাতু মুচির দেবোত্তর চাকরান জমি উচ্ছেদ হইয়া গিয়াছে। তাহার জন্য নালিশ-দরবার করিতে হয় নাই, সেটেলমেন্টেই সে-জমি জমিদারের খাস খতিয়ানে উঠিয়া গিয়াছে। পাতু নিজেই স্বীকার করিয়াছিল, সে এখন আর বাজায় না, বাজাইতেও চায় না।
অনিরুদ্ধের জমি নিলামে চড়িয়াছে। অনিরুদ্ধ এখন মদ খাওয়া ভবঘুরের মত বেড়ায় দুর্গার ঘরেও মধ্যে মধ্যে যায়। তাহার স্ত্রীও পাগলের মত হইয়া গিয়াছিল। এখন অনেকটা সুস্থ। দুর্গার যোগাযোগেই দারোগা ডেটিনিউ রাখিবার জন্য অনিরুদ্ধের ঘরখানা ভাড়া লইয়াছে। ওই ভাড়ার টাকা হইতেই এখন তাহাদের সংসার চলে।
দেবু বলিল–কামার-বউকে আজ দেখলাম শাঁখ বাজাচ্ছিল।
জগন বলিল–হ্যাঁ, এখন একটু ভাল আছে। একটু কেন, যতীনবাবু আসার পর থেকেই বেশ একটু ভাল আছে। ঠোঁট বাঁকাইয়া সে একটু হাসিল।
হরেন চাপা গলায় বলিল—মেনি মেন সে বুঝলে কিনা—যতীনবাবু অ্যান্ড কামার-বউ—
দেবু বিশ্বাস করিতে পারি না, সে তিরস্কার করিয়া উঠিল—ছিঃ হরেন! কি যা-তা বলছ!
–ইয়েস; আমিও তাই বলি, এ হতে পারে না। যতীনবাবু কামার-বউকে মা বলে।
তারপর আবার সে বলিল যতীনবাবু কিন্তু বড় চাপা লোক। বোমার ফরমুলা কিছুতেই। আদায় করতে পারলাম না।
হরিশ এবং ভবেশ আসায় তাদের আলোচনা বন্ধ হইল, কিছুক্ষণ পরে সে উঠিয়া গেল।
হরিশ বলিলবাবা দেবু, সন্ধেবেলায় একবার চণ্ডীমণ্ডপে যেয়ো। ওখানেই এখন আমরা আসি তো। শ্ৰীহরি বসে পাঁচজনকে নিয়ে। আলো, পান, তামাক সব ব্যবস্থাই আছে। শ্ৰীহরি এখন নতুন মানুষ। বুঝলে কিনা!
ভবেশ বলিল, হ্যাঁ, দুবেলা চায়ের ব্যবস্থা পর্যন্ত করেছে আমাদের শ্ৰীহরি, বুঝেছ কিনা?
দেবু তাদের নিকট হইতে আরও অনেক খবর শুনিল।
গ্রামের পাঁচজনকে লইয়া উঠিবার-বসিবার সুবিধার জন্যই শ্ৰীহরি পৃথক পাঠশালা-ঘরের ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছে। জমিদার তরফ হইতে জায়গার ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছে সে-ই। ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার সে, সে-ই দেওয়ালের খরচ মঞ্জুর করাইয়াছে; নিজে দিয়াছে নগদ পঁচিশ টাকা। তা ছাড়া চালের কাঠ, খড়, দরজা-জানালার কাঠও যে দিয়াছে শ্ৰীহরি।
দুই বেলা এখন চণ্ডীমণ্ডপে মজলিস বসে দেখিয়া শ্ৰীহরির বিপক্ষ দলের লক্ষ্মীছাড়ারা হিংসায় পাটু পাটু হইয়া গেল। তাহারা নানা নিন্দা রটনা করে। কিন্তু তাহাতে শ্ৰীহরির কিছু আসে যায় না। তাহার গোমস্তাগিরির অসুবিধা করিবার জন্যই তাহারা প্রজা-সমিতি গড়িয়াছে, কংগ্রেস কমিটি খাড়া করিয়াছে। দেবু যেন ওসবের মধ্যে না যায়।
তারা নাপিত আরও গৃঢ় সংবাদ দিল। জমিদার এ গ্রামখানা পত্তনি বিলি করিবে কি না ভাবিতেছে। শ্ৰীহরি গিলিবার জন্য হাঁ করিয়া আছে। পত্তনি কায়েম হইলে, শ্ৰীহরি বাবা বুড়োশিবের অর্ধসমাপ্ত মন্দিরটা পাকা করিয়া দিবে, চণ্ডীমণ্ডপের আটচালার উপর তুলিবে পাকা নাটমন্দির। শ্ৰীহরির বাড়িতে এখন একজন রাঁধুনী, একজন ছেলে পালন করিবার লোক।
তারাচরণ পরিশেষে বলিলই যে হরিহরের দুই কন্যে যারা কলকাতায় ঝি-গিরি করতে গিয়েছিল—তারাই। বুঝলেন তার মানে রীতিমত বড়লোকের ব্যাপার, দুজনকেই এখন ছিরু রেখেছে। বুঝলেন, একেবারে আমীরী মেজাজ। হরিহরের ছোট মেয়েটা যখন এইএ-ই রোগা, শণফুলের মত রঙ। ক্রমে শোনা গেল কলকাতায়—বুঝলেন?
অর্থাৎ মাতৃত্ব-সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করিয়াছিল মেয়েটি। তাই গ্ৰাম্য-সমাজ তাহাদিগকে পতিত করিল। কিন্তু শ্রীহরি দয়া করিয়া আশ্রয় দিয়াছে; তাহারই অনুরোধে সমাজ তাহাদের টি মার্জনা করিয়াছে; তারা বলিল-দু-দুটো মেয়ের ভাত-কাপড়, শখ-সামগ্ৰী তো সোজা কথা নয়, দেবু-ভাই।
বৃদ্ধ চৌধুরী শুধু আপন সংসারের সংবাদ দিলেন, দেবুর জেলের সুখ-দুঃখের সংবাদ লইলেন। পরিশেষে আশীৰ্বাদ করিলেন পণ্ডিত, তুমি দীর্ঘজীবী হও। দেখ, যদি পার বাবা তবে শ্রীহরির সঙ্গে ডাক্তারের, আর বিশেষ করে কর্মকারের মিটমাট করিয়ে দাও। অনিরুদ্ধ লোকটা নষ্ট হয়ে গেল। এরপর সর্বনাশ হয়ে যাবে।
