ভদ্রলোকটি এইবার খাতা ও পেন্সিল সুধীরকে ফেরত দিল, হাসিয়া বলিলবল তো সংখ্যা কত?
সুধীর সংখ্যাটার দিকে চাহিয়া বিব্রত হইয়া পড়িল। দেবুও দেখিল-বিরাট একটা সংখ্যা। কয়েক লক্ষ বা হাজার কোটি।
ভদ্রলোকই হাসিয়া সুধীরকে বলিলপারলে না? বাইশ হাজার আটশো ছিয়ানব্বই কোটি, চৌষট্টি লক্ষ, ঊনব্বই হাজার।
সবিস্ময়ে সুধীর প্রশ্ন করিল–কি?
–টাকা।
–টাকা!
–হ্যাঁ। ইউনাইটেড স্টেটস্ অব আমেরিকার খনি থেকে আর কলকারখানা থেকে এক বছরের উৎপন্ন জিনিসের দাম।
সুধীর হতবাক হইয়া গেল। বিমূঢ় হইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। দেবুও বিস্মিত হইয়া গিয়াছিল, কে এই অদ্ভুত ছেলেটি!
ভদ্রলোকটি সুধীরের পিঠের উপর সস্নেহে কয়েক চাপড় মারিয়া বলিল-আচ্ছা যাও, স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে। তারপর দেবুর দিকে চাহিয়া বলিল—আপনি বুঝি এদের বাড়ি যাবেন? চৌধুরীমশায়ের বাড়ি?
দেবু আরও বিস্মিত হইয়া গেলভদ্রলোক চৌধুরীকেও চেনেন দেখিতেছি! বলিলনা। আমি যাব শিবপুর।
—কার বাড়ি যাবেন বলুন তো?
–আপনি কি সকলকে চেনেন? দেবু ঘোষকে জানেন?
বেশ সম্ভ্রমের সহিত যুবকটি বলিলতার বাড়ি চিনি, তার ছোট খোকাটিকেও চিনি, কিন্তু তাকে এখনও দেখি নি। আমি আসবার আগেই তিনি জেলে গিয়েছেন। শিগগির তিনি আসবেন বেরিয়ে।
সুধীর বলিল–উনিই আমাদের পণ্ডিতমশায়।
–আপনি! ছেলেটির চোখ দুইটি আনন্দের উত্তেজনায় প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল; দুই হাত মেলিয়া সাগ্রহে দেবুকে জড়াইয়া ধরিয়া সে বলিল—উঃ, আপনি দেবুবাবু! আপুন আসুন-বাড়ি আসুন।
দেবু প্রশ্ন করিল—আপনি? আপনার পরিচয় তো—
চোখ বড় করিয়া সম্ভ্রমের সহিত সুধীর বলিল—উনি এখানে নজরবন্দি হয়ে আছেন স্যার।
—এখানে রেখেছে আমাকে। অনিরুদ্ধ কৰ্মকার মশায়ের বাড়ির বাইরের ঘরটায় থাকি। সুধীর, তুমি দৌড়ে যাও; ওঁর বাড়িতে খবর দাও, গ্রামে খবর দাও। ওয়ান-টু-থ্রি। পু-ভস্-ভস্ ঝিক-ঝিক–! ধর মেল ট্রেন—তুফান মেলে চলেছ তুমি!
মুহূর্তে সুধীর তীরের মত ছুটিল।
হাসিয়া ভদ্রলোকটি বলিলবুঝতে পারছেন বোধহয়, এখানে ডেটিনিউ হয়ে আছি আমি।
গ্রামে ঢুকিবার মুখেই ক্ষুদ্র একটি জনতার সঙ্গে দেখা হইল। জগন, হরেন, অনিরুদ্ধ, তারিণী, গণেশ আরও কয়েকজন। চণ্ডীমণ্ডপে ছিল অনেকেই শ্ৰীহরি, ভবেশ প্রমুখ প্রবীণগণ। সকলেই তাহাকে সাদরে সস্নেহে আহ্বান করিল—এস, এস বাবা। এস, বস! দেবু চণ্ডীমণ্ডপে প্ৰণাম করিল, সমস্ত গুরুজনদিগকে প্রণাম করিল; শ্রীহরি পর্যন্ত আজ তাহাকে খাতির করিল। দেবু সম্বন্ধে খুড়া হইলেও শ্ৰীহরি বয়সে অনেক বড়। তাহার ওপর অবস্থাপন্ন ব্যক্তি হিসাবে শ্ৰীহরি প্রণামের খাতির বড়-একটা কাহাকেও দেয় না। সেই শ্ৰীহরিও আজ তাহাকে প্ৰণাম করিল।
চণ্ডীমণ্ডপের খানিকটা দূরে ওই যে তাহার বাড়ি। দাওয়ার সম্মুখেই ওই যে শিউলি ফুলের গাছটি। ওই যে সব ভিড় করিয়া কাহারা দুয়ারে দাঁড়াইয়া আছে।
তাহার বাড়ির দুয়ারে দাঁড়াইয়া ছিল গ্রামের মেয়েরা। দুইটি কুমারী মেয়ের কাঁধে দুইটি পূৰ্ণঘট। দেবু অভিভূত হইয়া গেল। তাহাকে বরণ করিয়া লইবার জন্য গ্রামবাসীর এ কি গভীর আগ্রহ—এ কি পরমাদরের আয়োজন। সহসা শঙ্খধ্বনিতে আকৃষ্ট হইয়া দেখিল, একটি দীর্ঘাঙ্গী মেয়ে শাঁখ বাজাইতেছে। দেবু তাহাকে চিনিল, সে পদ্ম।
বাড়িতে ঢুকিতেই তাহার পায়ের কাছে খোকাকে নামাইয়া ঢিপ করিয়া প্ৰণাম করিল দুর্গা।
আবক্ষ ঘোমটা দুয়ারের বাজুতে ঠেস দিয়া দাঁড়াইয়া ছিল বিলু। খোকাকে কোলে লইয়া দেবু বিলুর দিকে চাহিল। বুড়ি রাঙাদিদি তাহার হাত ধরিয়া টানিয়া বলিলই ঘোড়ার কোনো আক্কেল নাই। পণ্ডিত না মুণ্ডু। আগে ই দিকে আয়! বদ-রসিক কোথাকার!
—ছাড়, রাঙাদিদি, পেণাম করি।
–পেনাম করতে হবে না রে ছেড়া। বৃদ্ধা তাহাকে হিড়হিড় করিয়া টানিয়া ঘরের ভিতর লইয়া গেল। তারপর বিলুকে টানিয়া আনিয়া বলিল—এই লে।
তারপর সমবেত মেয়েদের দিকে চাহিয়া বলিল—চল গো সব, এখন বাড়ি চল। চল চল! নইলে গাল দেব কিন্তু।
সকলে হাসিতে হাসিতেই চলিয়া গেল। বিলুর হাত ধরিয়া সস্নেহে সে ডাকিল—বিলু-রানী!
বিলুর মুখে-চোখে জলের দাগ, চোখ দুটি ভারী। চোখ মুছিয়া সে হাসিয়া বলিল—সাঁড়াও, পেনাম করি।
—মনিবমশায়! আকৰ্ণবিস্তার হাসি হাসিয়া সেই মুহূর্তে রাখাল-ঘোড়াটা আসিয়া দাঁড়াইল। ঘোড়াটা হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল, মাঠে শোনলাম। এক দৌড়ে চলে আইচি।
সে ঢিপ করিয়া একটা প্রণাম করিল।
–পণ্ডিতমশায় কই গো! এবারে আসিল সতীশ বাউরি, তাহার সঙ্গে তাহার পাড়ার লোকেরা সবাই।
আবার ডাক আসিল,–কোথা গো পণ্ডিতমশায়!
এ ডাক শুনিয়া দেবু ব্যস্ত হইয়া উঠিল,–বৃদ্ধ দ্বারকা চৌধুরীর গলা।
দেবুর জীবনে এ দিনটি অভূতপূর্ব। এই দুঃখ-দারিদ্র-জীৰ্ণ নীচতায়-দীনতায়-ভরাগ্রামখানির কোন্ অস্থিপঞ্জরের আবরণের অন্তরালে লুকানো ছিল এত মধুর, এত উদার স্নেহ মমতা! বিলুকে সে বলিল আসি বাইরে থেকে। চৌধুরীমশায় এসেছেন। সুখের মধ্যে মানুষকে চিনতে পারা যায় না, বিলু। দুঃখের দিনেই মানুষকে ঠিক বোঝা যায়। আগে মনে হত এমন স্বার্থপর নীচ গ্রাম আর নাই!
বিলু হাসিয়া বলিল—কত বড় লোক তুমি, ভালবাসবে না লোকে? জান, তুমি জেলে যাওয়ার পর জরিপের আমিন, কানুনগো, হাকিম কেউ আর লোককে কড়া কথা বলে নাই, আপনি ছাড়া কথা ছিল না। পাঁচখানা গায়ের লোক তোমার নাম করেছে। দু হাত তুলে আশীর্বাদ করেছে।
