এদিক বাউরিপাড়া বায়েন-পাড়া; ওই বড় গাছটি ধর্মরাজতলার বকুলগাছ। ছোট ছোট কুঁড়েঘরগুলির মধ্যে ওই বড় ঘরখানা দুর্গার কোঠা-ঘর। দুর্গা! আহা, দুর্গা বড় ভাল মেয়ে। পূর্বে সে মেয়েটাকে ঘৃণা করিত, মেয়েটার গায়েপড়া ভাব দেখিয়া বিরক্তি ভাব প্রকাশ করিত। অনেকবার রূঢ় কথাও বলিয়াছে সে দুর্গাকে। কিন্তু তাহার অসময়ে, বিপদের দিনে দুৰ্গা দেখা দিল এক নূতন রূপে। জেলে আসিবার দিন সে তাহার আভাস মাত্ৰ পাইয়াছিল। তারপর বিলুর পত্রে জানিয়াছে অনেক কথা। অহরহ-উদয়াস্ত দুর্গা বিলুর কাছে থাকে, দাসীর মত সেবা করে, সাধ্যমত সে বিলুকে কাজ করিতে দেয় না, ছেলেটাকে বুকে করিয়া রাখে। স্বৈরিণী বিলাসিনীর মধ্যে এ রূপ কোথায় ছিল—কেমন করিয়া লুকাইয়া ছিল?
ওই যে বড় ঘরের মাথাটা দেখা যাইতেছে-ওটা হরিশ-খুড়ার ঘর; তারপরেই ভবেশদাদার বাড়ি, সেটা দেখা যায় না। ওই যে ওধারের টিনের ঘরের মাথা রৌদ্রে ঝকমক করিতেছে-ওটা শ্ৰীহরির ঘর। শ্ৰীহরির ঘরের পরেই সর্বস্বান্ত তারিণীর ভাঙা ঘর। তারপর পথের একপাশে গ্রামের মধ্যস্থলে চণ্ডীমণ্ডপ। তারপর হরেন ঘোষালের বাড়ি। ঠিক বাড়ি নয়, হরেন ঘোষাল বলে—ঘোষাল হাউস। ঘোষাল বিচিত্রচরিত্র। তাহার বাহিরের ঘরের দরজায় লেখা আছে পার্লার, একটা ঘরে লেখা আছে স্টাডি। দেবু ঘোষালের সেই গাঁদা মালার কথা জীবনে কোনোদিন ভুলিতে পারিবে না। ঘোষালের সম্পূর্ণ পরিচয় সে জানে। ম্যাট্রিক পাস করিলেও মূৰ্খ ছাড়া সে কিছু নয়; ভীরু, কাপুরুষ সে; ব্রাহ্মণ হইয়াও সে পাতু বায়েনের স্ত্রীর প্রতি আসক্ত। কিন্তু সেদিন ঘোষালকে তাহার মনে হইয়াছিল যেন সত্যকালের ব্রাহ্মণ। তাহার মালাকে সে পবিত্র আশীর্বাদ বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিল, ওই আশীৰ্বাদই তাহাকে সেই যাবার মুহূর্তে অদ্ভুত বল দিয়াছিল। জেলের মধ্যেও বোধহয় ওই আশীর্বাদের বলেই রাজবন্দি বন্ধুদিগকে পাইয়াছিল।
বন্ধু কে না? বিলুর পত্রে সে পরিচয় পাইয়াছে, তাদের গ্রামের মানুষগুলির প্রতিটি জনই যেন দেবতা। তাহার মনে পড়িল একটি প্রবাদ-গায়ে মায়ে সমান কথা। হামা! এই পল্লীই তাহার মা! সে নত হইয়া পথের ধুলা মাথায় তুলিয়া লইল।
আরও খানিকটা অগ্রসর হইয়া নজরে পড়িল পলাশগাছে ফুল ধরিয়াছে, লাল টকটকে। ফুল! একটি বাড়ির চালের মাথায় অজস্র সজিনার ডাটা ঝুলিয়া আছে। গ্রামের উত্তর প্রান্তে দিঘির পাড়ের রিক্তপত্র শিমুলগাছটিতেও লাল রঙের সমারোহ। তাঁহারই পাশে একটা উচু তালগাছের মাথায় বসিয়া আছে একটা শকুন। এখন স্পষ্ট দেখা যাইতেছে—জগন ডাক্তারের খিড়কির বাঁশঝাড়ের একটা নুইয়া-পড়া বাঁশের উপর সারবন্দি একদল হরিয়াল বসিয়া আছে; সবুজ ও হলুদের সংমিশ্রণে পাখিগুলির রঙও যেন অপূর্ব, ডাকও তেমনি মধুর জলতরঙ্গ বাজনার ধ্বনির মত। বাতাসে এইবার গ্রামের নাবি আমগাছগুলির মুকুলের গন্ধ ভাসিয়া আসিতেছে। চৈত্র মাসে সকল আমগাছেই আম ধরিয়া গিয়াছে; শুধু চৌধুরীদের পুরনো খাস আমবাগানের গাছে চৈত্র মাসে মুকুল ধরে, এ গন্ধ চৌধুরীর বাগানের মুকুলের গন্ধ।
—পণ্ডিতমশায়!
কিশোর কণ্ঠের সবিস্ময় আনন্দধ্বনি শুনিয়া ফিরিয়া চাহিয়া দেবু দেখিল—অদূরবর্তী পাশের আলপথ ধরিয়া আসিতেছে কালীপুরের সুধীর, দ্বারকা চৌধুরীর নাতি; বড় ছেলের ছেলে। পাঠশালায় তাহার ছাত্র ছিল।
দেবু হাসিয়া সস্নেহে বলিল—সুধীর? ভাল আছিস?
সুধীর ছুটিয়া কাছে আসিয়া তাহাকে প্রণাম করিল—আপনি ভাল ছিলেন স্যার? এই আসছেন বুঝি?
–হ্যাঁ। এই আসছি। তুমি স্কুলে যাচ্ছ বুঝি কঙ্কণায়?
–হ্যাঁ। আপনার বাড়ির সকলে ভাল আছে, পণ্ডিতমশায়। খোকা খুব কথা বলে এখন। আমরা যাই কিনা প্রায়ই বিকেলে, খোকাকে নিয়ে খেলা করি।
দেবু গভীর আনন্দে যেন অভিভূত হইয়া গেল। ছেলেরা তাহাকে এত ভালবাসে?
–পাঠশালার নূতন বাড়ি হয়েছে স্যার।
–তাই নাকি?
–হ্যাঁ বেশ ঘর, তিনখানা কুঠুরি। নতুন পালিশ-করা চেয়ার-টেবিল হয়েছে স্যার। ইহার পর সে ঈষৎ কুণ্ঠিতভাবেই প্রশ্ন করিল—আর তো আপনি স্কুলে পড়াবেন না স্যার?
দেবু একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলনা সুধীর, আমি আর পড়াব না। নতুন মাস্টার এখন কে হয়েছেন?
কঙ্কণার বাবুদের নায়েবের ছেলে। ম্যাট্রিক পাস, গুরু-ট্রেনিংও পাস করেছেন। কিন্তু আপনি কেন?
সুধীরের কথা শেষ হইবার পূর্বেই ওদিক হইতে আগন্তুক একজন খুব অল্পবয়সী ভদ্রলোক সুধীরকে ডাকিয়া বলিল–খোকা বুঝি ইস্কুলে যাচ্ছ? দেখি, তোমার খাতা আর পেন্সিলটা একবার দেখি।
সুধীর খাতা-পেন্সিল বাহির করিয়া দিল। এ ছেলেটি-হাভদ্ৰলোক অপেক্ষা ইহাকে ছেলে বলিলেই বেশি মানায়। কে এ ছেলেটির বয়স বোধহয় আঠার-উনিশ বৎসর। চোখে চশমা গায়ে একটা ফরসা পাঞ্জাবি; এখানকার লোক নিশ্চয়ই নয়। সুন্দর ধারালো চেহারা। সুধীর অবশ্য ভদ্রলোকটিকে চেনে। কিন্তু ভদ্রলোকের সামনে দেবু তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিতে পারি না। অন্য প্রসঙ্গই উত্থাপন করিল—চৌধুরীমশায়—তোমার ঠাকুরদা ভাল আছেন?
–হ্যাঁ। তিনি আপনার কত নাম করেন!
দেবু হাসিল। চৌধুরীকে সে বরাবরই শ্রদ্ধা করে; চমৎকার, মানুষ। তিনি তাহার নাম করেন? দেবুর আনন্দ হইল। সে আবার প্রশ্ন করিল-বাড়ির আর সকলে?
—সবাই ভাল আছেন। কেবল আমার একটি ছোট বোন মারা গিয়েছে।
–মারা গিয়েছে?
হ্যাঁ। বেশি বড় নয়, এই এক মাসের হয়ে মারা গিয়েছে।
