—কে রে? পদ্ম জিজ্ঞাসা করিল।
ছোঁড়াটা আলোটা তুলিয়া ধরিয়া বলিল–দুগ্গা দিদি বটে।
লণ্ঠনের আলোটা দুর্গার উপর পড়িল পরিপূর্ণভাবে, পরনে পাটভাঙা খয়ের রঙের তাঁতের শাড়ি, চুলের পারিপাট্যও চমৎকার, কপালে টিপ; কিন্তু সমস্তই বিশৃঙ্খল—বিপর্যস্ত। সে যেন হাঁপাইতেছিল—চোখের দৃষ্টি যেন উদভ্ৰান্ত।
আলোর দিকে পরিপূর্ণভাবে ফিরিয়া দাঁড়াইল। এতটুকু লজ্জা করিল না, সে বলিল—মিছে। কথা বিলু-দিদি, মিছে কথা। পণ্ডিত জামাইয়ের পনের মাসের মেয়াদ হয়ে গিয়েছে! বলিতে বলিতে সে ফুঁপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল।
বিলু হতবাক হইয়া পাথরের মত দাঁড়াইয়া রহিল।
দুর্গা গিয়াছিল নৈশ অভিসারে। কঙ্কণায় সেটেলমেন্ট ক্যাম্পে। আমিন, পিয়ন, এমনকি কানুনগোদের মধ্যেও দুই-এক জন, স্থানীয় দুৰ্গা-শ্রেণীর নারীদের ওপর গোপনে অনুগ্রহ করিয়া থাকে। পেশকারটি আবার এ বিষয়ে সকলের সেরা, দুর্গার কাছে কয়েকদিনই সে অনুগ্রহের। আহ্বান পাঠাইয়াছিল, কিন্তু দুর্গা যায় নাই। আজ সে গিয়াছিল নিজে। বলিয়াছিল, পণ্ডিতকে কিন্তু হাকিমকে বলে-কয়ে ছাড়িয়ে দিতে হবে।
পেশকার বলিয়াছিল—আচ্ছা; কাল সকালে।
ভোরবেলায় আসিবার সময় দুর্গার ভুল ভাঙিয়া দিয়াছে—তাহার অনুগ্রহপ্রার্থী পেশকারের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ একজন পিয়ন।
দুর্গা আর পাঁড়াইল না, চলিয়া গেল। সে মনে মনে বাছিতেছিল—আপনার সগোত্ৰাদের মধ্যে একটি বাহ্যশ্রীময়ী অথচ ব্যাধিযুক্তা সখী।
ওদিকে তখন চণ্ডীমণ্ডপে মেয়েদের সমস্বরে ধ্বনি উঠিতেছিল—পৌষ-বন্দনার, পৌষবন্ধনের।
পৌষ—পৌষ–সোনার পৌষ।
এস পৌষ যেয়ো না—জন্ম জন্ম ছেড়ে না।
না যেয়ো ছাড়িয়ে পৌষ–না যেয়ো ছাড়িয়ে,
স্বামী-পুত্ৰ ভাত খাবে কটোরা ভরিয়ে।
পৌষ–পৌষ—সোনার পৌষ,
বড় ঘরের মেঝেয় বোস,
বড় ঘরের মেঝে ভরে–বাহান্ন হোস!
সোনার পৌষ।…
পদ্ম তাহার কধে হাত দিয়া ডাকিল—এস ভাই!
বিলু স্বপোথি তের মত বলিল–চল।
কি করিবে? উপায় কি? যাইবার সময় সে বলিয়া গিয়াছে—খোকার ভার তোমার ওপর রহিল, আরও রহিল ঘর-দুয়ার-মরাইগরু-বাছুর-ধান-জমি—সবের ভার। তুমি আমার ঘরের লক্ষ্মী, তুমি চঞ্চল হইলে চলিবে না। সর্ব-অবস্থায় অচলা হইয়া থাকিতে হইবে তোমাকে।
তাই থাকিবে সে, তাই থাকিবে। তাহার ঘরের সোনার পৌষ চলিয়া যাইতেছে, তাহাকে পূজা করিয়া বাঁধিতে হইবে। না যেয়ো ছাড়িয়ে পৌষনা যেয়ো ছাড়িয়ে! পনের মাস পরে তো সে ফিরিয়া আসিবে। তখন তাহাকে যে পঞ্চাশ ব্যঞ্জন দিয়া কটোরা ভরিয়া অন্ন সাজাইয়া দিতে হইবে!
১৮. এক বৎসরেরও বেশি সময়
দেখিতে দেখিতে এক বৎসরেরও বেশি সময় চলিয়া গেল। এক পৌষ-সংক্রান্তি হইতে আর এক পৌষ সংক্রান্তিতে এক বৎসর পূর্ণ হইয়া মাঘ-ফাল্গুন আরও দুইটি মাস কাটিয়া গেল। সেদিন চৈত্রের পাঁচ তারিখ। দেবু ঘোষ জংশন স্টেশনে নামিল। চৈত্র মাসের শীর্ণ ময়ূরাক্ষী পার হইয়া শিবকালীপুরের ঘাটে উঠিয়া সে একবার দাঁড়াইল। দীর্ঘ এক বৎসর তিন মাস কারাদণ্ড ভোেগ শেষ করিয়া সে আজ বাড়ি ফিরিতেছে। পনের মাসের মধ্যে কয়েকদিন সে মকুব পাইয়াছে। এতক্ষণে আপনার গ্রামখানির সীমানায় পদাৰ্পণ করিয়া যেন পরিপূর্ণ মুক্তির আস্বাদ সে অনুভব করিল।
ওই তাহার গ্রাম শিবকালীপুর, তাহার পরই মহাগ্রাম। পশ্চিমে শেখপাড়া কুসুমপুর, তাহার পশ্চিমে ওই দালানকোঠায় ভরা কঙ্কণা, একেবাবে পূর্বে ওই দেখুড়িয়া। আর দক্ষিণে ময়ূরাক্ষীর ওপারে জংশন। শেখপাড়া কুসুমপুরের মসজিদের উঁচু সাদা থামগুলি সবুজ গাছপালার ফাঁক দিয়া দেখা যাইতেছে। শিবকালীপুরের পূর্বেওই মহাগ্রামে ন্যায়রত্ন মহাশয়ের বাড়ি। মহাগ্রামের পূর্বে ওই দেখুড়িয়া। দেখুড়িয়ার খানিকটা পূর্বে ময়ূরাক্ষী একটা বাঁক ফিরিয়াছে। ওই বাঁকের উপর ঘন সবুজ গাছপালার মধ্যে বন্যায় নিশ্চিহ্ন ঘোষপাড়া মহিষডহর।
ঘাট হইতে সে ময়ূরাক্ষীর বন্যারোধী বাঁধের উপর উঠিল। চৈত্র মাসের বেলা দশটা পার হইয়া গিয়াছে, ইহারই মধ্যে বেশ খরা উঠিয়াছে। বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্র এখন প্রায় রিক্ত। গম, কলাই, যব, সরিষা, রবিফসল প্রায়ই ঘরে উঠিয়াছে। মাঠে এখন কেবল কিছু তিল, কিছু আলু এবং কিছু কিছু রবি ফসলও রহিয়াছে। তিলই এ সময়ের মোটা ফসল, গাঢ় সবুজ সতেজ গাছগুলি পরিপূর্ণরূপে বাড়িয়া উঠিয়াছে। এইবার ফুল ধরিবে। চৈত্রলক্ষ্মীর কথা দেবুর মনে পড়িল—এই তিলফুল তুলিয়া কৰ্ণাভরণ করিয়া পরিয়াছিলেন। মা-লক্ষ্মী, তাই চাষী ব্রাহ্মণের ঘরে তাহাকে আসিতে হইয়াছিল। তিলফুলের ঋণ শোধ দিতে। বেগুনি রঙের তিলফুলগুলির অপূর্ব গঠন। মনে পড়িল তিলফুল জিনি নাসা।
আজ এক বৎসরেরও অধিককাল সে জেলখানায় ছিল—সেখানে ভাগ্যক্রমে জনকয়েক রাজবন্দির সাহচর্য সে কিছুদিনের জন্য লাভ করিয়াছিল। ওই লাভের সম্পদ-কল্যাণেই তাহার বন্দিজীবন পরম সুখে না হোক প্রচুর আনন্দের মধ্যে কাটিয়া গিয়াছে। দেহ তাঁহার ক্ষীণ। হইয়াছে, ওজনে সে প্রায় সাত সের কমিয়া গিয়াছে কিন্তু মন ভাঙে নাই। মুক্তি পাইয়া আপনার গ্রামের সম্মুখে আসিয়াও সাধারণ মানুষের মত অধীর আনন্দে ছুটিয়া বা দ্রুতপদে চলিতেছিল না। সে একবার দাঁড়াইল। চারিদিকে ভাল করিয়া দেখিয়া লইল। শিবকালীপুর স্পষ্ট দেখা যাইতেছে। আম, কাঁঠাল, জাম, তেঁতুল গাছগুলির উঁচু মাথা নীল আকাশপটে অ্যাঁকা ছবির মত মনে হইতেছে। দুলিতেছে কেবল বাঁশের ডগাগুলি। ওই মৃদু দোল-খাওয়া বাঁশগুলির পিছনে তাদের ঘর। গাছের ফাঁকে ফাঁকে কতকগুলি ঘর দেখা যাইতেছে।
