জগন গালিগালাজ করিয়াছিল গ্রামের লোককে। দ্বারকা চৌধুরী পর্যন্ত আত্মসংবরণ করিতে পারে নাই। বৃদ্ধ দন্তহীন মুখে কম্পিত অধরে বলিয়াছিল-ভগবান এর বিচার করবেন।
দেবু হাসিয়া বলিয়াছে—আপনি সেদিন যে গল্পটা বললেন—সেটা ভুলে গেলেন চৌধুরীমশাই? মানুষের ভুল-চুক পদে পদে, আর একটা কথা চৌধুরীমশায়, এরা আমার পক্ষে সাক্ষি না দিক, বিপক্ষেও তো দেয় নাই!
অনিরুদ্ধ চিৎকার করিয়া উঠিয়াছিল—দিলে মাথায় বজ্রাঘাত হত না?
জেলের কথাটা তাহারা চাপিয়া গেল; দেবুর স্ত্রীর কথা বিবেচনা করিয়াই প্ৰকাশ করিল না।
দুর্গা আসিয়া বিলুকে সংবাদ দিয়া বুলিল—তোমার কাছে আমার মা শোবে, বিলু-দিদি।
বিলু বলিল—তুই থাক্ না দুগ্গা, বেশ দুজনে গল্প করব। আমি ঘরে শোব, তুই বারান্দার দোরটিতে শুবি।
দুর্গা বলিলনা, বিলু-দিদি!
–কেন দুর্গা?
–আমার ভাই, নিজের বিছানা নইলে ঘুম হয় না।
বিলু আর অনুরোধ করিল না। ব্যাপারটা সে বুঝিল; একটু কেবল হাসিল, কিন্তু রাগ করিল। না। মরিলেও নাকি মানুষের স্বভাব যায় না।
সমস্ত দিনটা কাটিল, কিন্তু সন্ধ্যা হইতে সময় আর কাটিতে চায় না। বিলু চুপ করিয়া বসিয়া ছিল। সে জেলে। সন্ধ্যায় গোটা গ্রামটায় শাঁখ বাজিয়া উঠিতে তাহার চমক ভাঙিল–ঘরে মা-লক্ষ্মী রহিয়াছেন, ধূপ-দীপ দিতে হইবে। মায়ের শীতল-ভোগের আয়োজন এখনও করা হয় নাই। দুর্গা যাইবার সময় বাড়ির রাখালটাকে ডাকিয়া গিয়াছিল, ঘোড়াটা প্রচুর পরিমাণে। পিঠা খাইয়া কাপড় মুড়ি দিয়া একপাশে অঘোরে ঘুমাইতেছিল। বেচারির পেটটা ফুলিয়া বুকের চেয়েও উঁচু হইয়া উঠিয়াছে হসফাস করিতেছে। ছোঁড়াটাও আশপাশের বাড়ির শাঁখের শব্দে উঠিয়া বসিল, বলিল—সঁজ লেগে গেইচে লাগছে! মনিব্যান, সঁজ জ্বাল গো, শাঁখ বাজাও, ধূপপিদিম দাও।
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বিলু উঠিল। ছোঁড়াটা বসিয়া বসিয়া আপন মনেই কথা বলিতেছিল সবই মনিবের অর্থাৎ দেবুর কথা।
—মনিব এতক্ষণ বসে বসে আমাদের কথাই ভাবছে, লয় মনিব্যা?
বিলু চোখ মুছিল।
–আচ্ছা, মনিব্যান্! জেহেলে কি লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে দেয়? মনিব তা হলে কি করে শোবে?
আৰ্তস্বরে বিলু বলিল ওরে তুই আর বকিস্ না, থাম্।
ছোঁড়াটা অপ্রস্তুত হইয়া চুপ করিয়া গেল।
সন্ধ্যা-প্রদীপ, ধূপ, শীতল-ভোগ সাজাইয়া বিলু বলিল-আমার সঙ্গে আয় বাবা, খামারে গোয়ালে যাব-বলিতে বলিতেই মনে পড়িলঘুমন্ত শিশুর কথা; তাহার কাছে কে থাকিবে? অন্যদিন এই সময়টিতে থাকিত সে। বিলু একাই খামারে গোয়ালে, মরাইয়ের তলে জল দিয়া সন্ধ্যা দেখাইয়া আসিত। আজ সে নাই বলিয়া অকারণে তাহার ভয় করিতেছে, তাহার আকস্মিক সকরুণ অসহায় অবস্থা ক্ষণে ক্ষণে তাহাকে অভিভূত করিয়া ফেলিতেছে।
ছোঁড়াটা উঠিয়া বলিল—চল।
–কিন্তু খোকার কাছে থাকবে কে?
—আমি থাকছি। বলিয়া সে শুইয়া পড়িয়া বলিল—এত ভয় কিসের গো, মনিব্যান? যাও ক্যানে, কিরষেণ রইছে সব খামারে।
–কিষানরা রয়েছে?
–নাই? আমি যে হেথা রইছি, তারাই তো গরু ঢোকালে গোয়ালে। রেতে একজন থাকবে বাড়িতে শুয়ে। পালা করে রোজ একজন করে থাকবে। মনিব নাই, থাকবে না? আমিও থাকব মনিব্যান, একটি করে কাহিনী কিন্তুক বলতে হবে।
বিলু সন্ধ্যা দেখাইয়া ফিরিয়া আসিল—সঙ্গে সঙ্গে কৃষাণ দুই জন।
লক্ষ্মীর সিংহাসনের সম্মুখে ধূপ-দীপ, শীতল-ভোগ রাখিয়া প্ৰণাম করিয়া বিলু কামনা করিলওঁকে মানে মানে খালাস করে দাও, মা। ওঁর মঙ্গল কর। ঘরে আমার অচলা হয়ে বাস। কর।
ছোঁড়াটা বলিল–মনিব্যান, সেই ক্ষীরের পিঠে আর আছে নাকি?
বিলু মৃদু হাসিয়া বলিল আছে।
–তবে তাই গণ্ডা দুয়েক দাও, আর কিছু খাব না রেতে।
–হ্যাঁ বাবা, তোমরা? বিলু প্রশ্ন করিল কৃষাণ দুই জনকে।
–দেন অল্প করে চারডি।
দুপুরবেলায় এক-একজন ভীমের আহার করিয়াছে। ইহাদের খাওয়াইতে বিলুর এত ভাল লাগে! দেবু নিজে ইহাদের খাওয়াইত। বিলু যোগাইয়া দিত, পরিবেশন করিত সে নিজে।
আবার অ্যাঁউরি-বাউরি দিয়া সব বাঁধিতে হইবে। মুঠ-লক্ষ্মীর ধানের খড়ের দড়িতে সমস্ত সামগ্রীতে বন্ধন দিতে হইবে। আজিকার ধন থাক, কালিকার ধন আসুক, পুরানে-নূতনে সঞ্চয় বাড়ুক। লক্ষ্মীর প্রসাদে পুরাতন অন্নে নূতন বস্ত্রে জীবন কাটিয়া যাক নিশ্চিন্তে নিৰ্ভাবনায়। অচলা হইয়া থাক মা, অচল হইয়া থাক।
শেষরাত্রে আর এক পর্ব। পৌষ-আগলানো পর্ব-এই পৌষ সংক্রান্তির রাত্রির শেষ প্রহর। পৌষ মাস যখন বিদায় লইয়া অন্ধকারের আবরণে পশ্চিম দিগন্তের মুখে পা বাড়ায়, পূর্ব দিগন্তে আলোক আভাসের পশ্চাতে মকর রাশিস্থ সূর্যের রথের সঙ্গে উদয় হয় মাঘের প্রথম দিন তখন কৃষক-বনিতারা পৌষকে বন্দনা করিয়া সনির্বন্ধ অনুরোধ করে—পৌষ তুমি যাইও না। চিরদিন তুমি থাক।
চণ্ডীমণ্ডপের আটচালায় পৌষ-আগলানো হইয়া থাকে।
ভোররাত্রে ঘরে ঘরে লোক জাগিয়া উঠিয়াছে, গ্রামময় মানুষের সাড়া। শাখও বাজিতেছে।
বিলুও উঠিল। ছেলেটিও জাগিয়াছিল—তাহাকে কাপড় জড়াইয়া রাখাল-ছেলেটার কোলে দিয়া বিলু পূজার আয়োজন করিতে বসিল।
–ও ভাই, পণ্ডিত-বউ! সব হল তোমার? এস!
ডাকিতেছিল পদ্ম।
বিলু দুয়ার খুলিয়া দিল।এই হয়েছে। ধূপের আগুন হলেই হয়, চল যাই।
উনানের কাঠ জ্বলিতেছিল; পদ্ম দাঁড়াইয়া রহিল, ধূপদানিতে আগুন তুলিয়া লইয়া বিলু বলিল—চল।
রাখাল-ছেলেটা লইল হারিকেন। বাড়িতে কৃষাণেরা রহিল। দুর্গার মা শুইয়াই রহিল–সে ওঠে নাই। বাড়ি হইতে বাহির হইয়াই রাখালটা চমকিয়া উঠিল, জিজ্ঞাসা করিল—কে?
