বিলু একটি কথাও বলিতে পারিল না।
দেবু হাসিয়া সবশেষে তাহাকে বুকে টানিয়া লইয়া প্রগাঢ় আবেগে একটি চুম্বন দিয়া ঘর থেকে বাহির হইয়া আসিল।
বাহিরে ছিল পদ্ম ও দুর্গা। দেবু বলিল—মিতেনী, তুমি রইলে, দুর্গা রইল; বিলুকে তোমরা একটু দেখো।
সে চণ্ডীমণ্ডপে আসিয়া বলিল—চলুন।
–ওয়েট! চণ্ডীমণ্ডপে নাটকীয়ভাবে প্রবেশ করিল হরেন ঘোষাল। তাহার হাতে একটি অতি সুন্দর গাঁদা ফুলের মালা। মালাখানি সে দেবুর গলায় পরাইয়া দিয়া উত্তেজিত আবেগে চিৎকার করিয়া উঠিল-জয়, দেবু ঘোষের জয়!
মুহূর্তে ব্যাপারটার চেহারা পাল্টাইয়া গেল।
দারোগা যাইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিল। ফুলের মালা ও জয়ধ্বনিতে দেবুর পা হইতে মাথা পর্যন্ত একটা অদ্ভুত শিহরন বহিয়া গেল। বুকের মধ্যে যে ক্ষীণতম দুর্বলতার আবেগটুকু
স্পন্দিত হইতেছিল—সেটুকুও আর রহিল না, তাহার পরিবর্তে ভাটার নদীর বুকে জোয়ারের মত একটা বিপরীতমুখী উচ্ছ্বসিত আবেগ আসিয়া তাহাকে স্ফীত প্রশস্ত করিয়া তুলিল। সঙ্গে সঙ্গে সমবেত জনতা দারোগা কনস্টেবলের উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকিয়াও প্ৰতিধ্বনি তুলিল জয়, দেবু ঘোষের জয়। দৃঢ় দীর্ঘ পদক্ষেপে দেবু সম্মুখে অগ্রসর হইল।
* **
লক্ষ্মীপূজার আয়োজন করিতে বিলুর হাত উঠিতেছিল না। এক-অন্ন পঞ্চাশ-ব্যঞ্জনে লক্ষ্মীর পূজা। এই বেদনা বুকে লইয়া সে-আয়োজন কেমন করিয়া কি করিবে সে; কাহার জন্য লক্ষ্মী পাতিবে। পুরুষকে আশ্ৰয় করিয়াই নারীর বাস, নারায়ণের পাশে লক্ষ্মীর আসন। দেবুই যখন আজ এই আয়োজনের মধ্যস্থলে উপস্থিত নাই, তখন—! বারবার তাহার চোখ ফাটিয়া জল আসিতেছিল।
কিন্তু রাঙাদিদি আসিয়া বলিলভাবিস না ভাই, পণ্ডিত ভাই আজই ফিরে আসবে। আর আমার পানে তাকিয়ে দেখ, তিনকুলে কেউ নাই, তবু তো পুজো করছি। তোর কোলে সোনার চাদ, দেবু আমার ফিরে আসছে—তোর পূজা না করলে চলে? দে, আমি বরং তোর লক্ষ্মী পেতে দিয়ে যাই। ওই চারদিকে শাঁখ বাজছে-লক্ষ্মী পাতা হয়ে গেল সব।
রাঙাদিদি কত বাহার করিয়া নিপুণ হাতে সাজাইয়া লক্ষ্মী পাতিয়া দিয়াছে। লাল রেশমি কাপড়ে এমন করিয়া ধান ও কড়িগুলি ঢাকিয়া দিয়াছে যে মনে হয় যেন ছোট্ট একটি বন্ধু সিংহাসনের উপর বসিয়া আছে।
পদ্ম দুই-তিনবার আসিয়াছিল। দুর্গা তো সকাল হইতে বসিয়াই আছে, নড়ে নাই। শ্ৰীহরির মা-বউও আসিয়াছিল।
মা মৌখিক তত্ত্ব করিয়া গিয়াছে; বউটি আনিয়াছিল একছড়া মর্তমান কলা, একটা থোড়, একটা মোচা-শ্ৰীহরির নূতন কাটানো পুকুরের পাড়ের ফসল। আর কতকগুলি মটরশুটি, একটা। কপি, বাড়িতে লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে শ্রীহরি শহর হইতে আনাইয়াছে। বউটি বলিয়া গিয়াছে তুমি ভেবো না, শাশুড়ি! তোমার ভাসুর-পো সকালেই গিয়েছে হাকিমের সঙ্গে দেখা করতে। খুড়শ্বশুরকে সঙ্গে নিয়ে সে আজই ফিরে আসবে।
প্রায় প্রতি ঘরের মেয়েরা আসিয়া বিলুর তত্ত্ব লইয়া গিয়াছে। জগন ডাক্তারের স্ত্রী পাবার আসিয়াছে। হরিজনেরা জনে জনে আসিয়াছে। খেজুরগুড়ের মহলাদারটি খেজুরগুড় দিয়া গিয়াছে। সতীশ হইতে প্রত্যেকেই ছোট ছোট ঘটিতে কাঁচা দুধ আনিয়া দিয়া গিয়াছে। আর প্রয়োজন নাই বলিলে শোনে নাই, বোঝে নাই; উত্তরে বিষণ্ণ মুখে বলিয়াছে অপরাধ করলাম, মা?
দুর্গা বলিল-বিলু-দিদি, ক্ষীর করে রাখ।
বিলু বলিল—কি হবে বল দেখি? পচে যাবে তো।
—পচবে কেন? দেখ না, জামাই ঠিক ঘুরে আসছে।
কয়েকটি বাড়ির গুটিকয়েক কুমারী মেয়ে আসিয়া দাঁড়াইল। ঘড়া দাও, বউদিদি, জল এনে
বিলুর ইহারা সম্পর্কে নন। বিলু মিষ্ট-হাসি হাসিয়া বলিল জল আমি এনেছি ভাই।
বিলু বলিল—বস, জল খাও।
–না। আমরা কাজ করতে এসেছি।
ইহাদের এই অকপট আত্মীয়তা বিলুর বড় ভাল লাগিল। এত আপনার জন তাহার আছে! মানুষ এত ভাল!
চণ্ডীমণ্ডপে তিলকুটো ভোগের ঢাক বাজিলে তবে মেয়ে কয়টি গেল। চণ্ডীমণ্ডপে আজও তিলকুটো সন্দেশে বাবা-শিব ও মা-কালীর ভোগ হইবে। ওখানে ভোগ হইলে, তবে বাড়িতে লক্ষ্মীর ভোগ হইবে। বাউরি-ডাম-মুচিদের ছেলেরা চণ্ডীমণ্ডপে ভিড় জমাইয়া বসিয়া আছে। একটুকরা তিলকুটোর জন্য। ইহার পর আবার বাড়ি বাড়ি পিঠা সাধিতে যাইবে।
বয়স্কেরা অনেকেই দেবুর জন্য সেটেলমেন্ট ক্যাম্পে গিয়াছিল। ফিরিল প্রায় একটার সময়। সকলেই গম্ভীর, চিন্তান্বিত। বিচার এখনও হয় নাই। তবে সবই বুঝা গিয়াছে। কিন্তু কি করিবে তাহারা? সকলের চেয়ে গম্ভীর শ্ৰীহরি। আমিন শ্ৰীহরিকে ডাকিয়া স্পষ্টই বলিয়াছে—দেবুর পক্ষ লইয়া যে সাক্ষী দিবে, তাহার সহিত বুঝাপড়া হইবে পরে। কারণ দেবু কিছুতেই ক্ষমা চাহিতে রাজি হয় নাই।
মুরব্বিরা পরামর্শ করিয়া ঠিক করিয়াছে—তাহার চেয়ে কোনো পক্ষেই সাক্ষ্য তাহারা দিবে না।
বাড়ি আসে নাই কেবল জনকয়েক,জগন ডাক্তার, অনিরুদ্ধ, হরেন ঘোষাল, দ্বারকা চৌধুরী, তারা নাপিত। তাহারা বাড়ি ফিরিল প্রায় সন্ধ্যার সময়—বিষণ্ণ মুখে, মন্থর পদে। দুর্গা পথে দাঁড়াইয়া ছিল, সে প্রশ্ন করিল—কি হল ডাক্তারবাবু, চৌধুরীমশায়?
জগন বলিল—সমস্ত দিন বসিয়ে রেখে, সন্ধেবেলায় দিন ফেলে সদরে চালান দিলে! বদমায়েশি আর কি!
–চালান দিলে?
–হ্যাঁ। কালই যাব আমি সদরে, জামিনে পণ্ডিতকে খালাস করে আন।
কথাটা মিথ্যা। দেবুর এক বৎসর তিন মাস পনের মাসের মেয়াদে জেল হইয়াছে। কাল জগন সদরে যাইবে আপিল করিবার জন্য। দেবু কিন্তু আপিল করিতে বারণ করিয়াছে। সাক্ষীর অবস্থা দেখিয়া সে আপিলের ফলও আন্দাজ করিয়া লইয়াছে।
