দেবু প্রথম দিন মাঠে গিয়া দেখিল—সার্ভে টেবিলের ধারে দাঁড়াইয়া আছে সেই কানুনগো লোকটি। কানুনগোও দেবুকে দেখিল। দুজনের চিত্তই তিক্ত হইয়া উঠিল। কানুনগো লোকটি ডিস্পেপটিক, অত্যন্ত রুক্ষ মেজাজের লোক, লোকজনের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করা তাহার স্বভাব। দেবু সাবধানে তাহাকে এড়াইয়া চলিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েকটা ক্ষুদ্র ব্যাপার উপলক্ষ করিয়া কানুনগো তাহাকে ক্যাম্পে হাজির হইতে নোটিশ দিল।
তিক্তচিত্তে দেবু অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল। সে স্থির করিল–যাহা হয় হউক, সে কিছুতেই ওই কানুনগোর সম্মুখে হাজির হইয়া হাত জোড় করিয়া দাঁড়াইবে না।
কানুনগো সুযোগ পাইয়া এই অনুপস্থিতির কথা সেটেলমেন্ট-ডেপুটিকে রিপোর্ট করিল। ডেপুটি সাহেব নোটিশগুলি দেখিয়া একটু বিস্মিত হইলেন। এই তুচ্ছ কারণে নোটিশ করা হইয়াছে? তাহার ওপর তিনি এই কানুন্গোটির স্বভাবও জানিতেন। তবুও আইনানুযায়ী দেবুকে নোটিশ করিলেন। দেবু এ নোটিশও অমান্য করিল। তারপরই ওয়ারেন্ট হওয়ার নিয়ম। এদিকে ঠিক এই সময়েই এক চরম ব্যাপার ঘটিয়া গেল।
দেবুরই একটা জমি পরিমাপের সময় কানুনগোর সঙ্গে তাহার বচসা আরম্ভ হইল। দেবু জমির রসিদ আনে নাই। বচসার উপলক্ষ তাই। কথার উত্তর দিতে দিতেই দেবুর নজর পড়িল,তাহার জমির ঠিক মাঝখানে পাকা ধানের উপর জরিপের শিকল টানা হইতেছে। সে ভাবিল—এটাও কানুনগোর ইচ্ছাকৃত ব্যাপার। কিন্তু সত্য বলিতে কি এটা কানুনগোর ইচ্ছাকৃত ছিল না, দেবুর জমিটার আকারই এমন অসমান যে, মাঝখানে প্রস্থের একটা মাপ না লইয়া উপায় ছিল না। রাগের মাথায় ভুল বুঝিয়া দেবু চরম কাণ্ড করিয়া বসিল। জরিপের চেন টানিয়া তুলিয়া ফেলিয়া দিল। কানুনগো সঙ্গে সঙ্গে টেবিল শিকল লইয়া মাঠ হইতে উঠিয়া একেবারে ডেপুটির ক্যাম্পে হাজির হইয়া রিপোর্ট করিল।
ডেপুটিবাবু সত্যকারের ভদ্রলোক, তিনি বাংলার চাষীর নিরীহ প্রকৃতির কথা জানেন, তিনিও এই দেশেরই মানুষ; তিনি অবাক হইয়া গেলেন। কিন্তু কানুনগোর বন্ধু পেশকারটি ধুরন্ধর লোক, সে তাহাকে পরিষ্কার বুঝাইয়া দিল–লোকটা ওই জে. এল. ব্যানার্জীর শিষ্য।
ডেপুটি আর উপেক্ষা করিতে পারিলেন না।
তারপরই এই পরিণতি। একেবারে ওয়ারেন্ট অব অ্যারেস্ট।
শ্ৰীহরি সত্যই বলিয়াছে—সে কয়েকবারই অনুরোধ করিয়াছে খুড়ো, চল তুমি, আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি, কানুন্গোকে আমি নরম করে এনেছি, তুমি একবারটি গেলেই সব মিটে যাবে।
দেবু বলিয়াছে–না।
জগন বলিয়াছে—পণ্ডিত, তুমিও একটা দরখাস্ত কর, সমস্ত ব্যাপার জানিয়ে দাও সি. ও.-কে.; ডি. এল. আর.-কেও একটা দরখাস্ত কর।
দেবু বলিয়াছে–না, থাক।
বিলু শঙ্কিত, উদ্বিগ্ন মুখে প্রশ্ন করিয়াছো—হ্যাঁ গো, কি হবে?
দেবু হাসিয়াছে—যা হয় হবে।
যাহা হইবার হইয়া গেল।
* * * *
শ্ৰীহরি দেবুর কাছে আসিয়া বলিল—ছোট দারোগাকে রাজি করিয়েছি, খুড়ো। প্রথমে কানুনগোর ক্যাম্পে যাবে, সেখানে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিয়ে, কানুনগোর চিঠি নিয়ে যাবে সার্কেল ডেপুটির কাছে। কেস খারিজ হয়ে যাবে, আমরা বাড়ি চলে আসব।
দেবু বলিল–না।
—না কি গো?
–না, সে আমি যাব না, ছিরু।
–ফল কি হবে, ভাবছ তা!
–যা হয় হবে। দেবু এবারও হাসিল।
শ্ৰীহরি গভীর দুঃখের সঙ্গে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়াও বিরক্তি সংবরণ করিতে পারি না, বলিল—কাজটা কিন্তু ভাল করছ না, খুড়ো।
দাশজী বলিলতা হলে আমরা আর কি করব বল?
মজলিসসুদ্ধ লোকই সমস্বরে বলিল-আমরা আর কি করব বল?
কেবল মজলিসের সঙ্গে সায় দিল না তিন জন জগন ডাক্তার, অনিরুদ্ধ আর হরেন। ঘোষাল। হরেন ঘোষালের অভ্যাস সকলের আগে কথা বলা, কিন্তু সে আজ কিছু না বলিয়াই। দ্রুতপদে উঠিয়া চলিয়া গেল।
জগন বলিল-ভেবো না দেবু ভাই! কাল যদি কেস না করে হাজতী আসামি করে জেলে পাঠায়, তবে সদরে গিয়ে মোক্তার এনে মামলা লড়ব। আর যদি কালই বিচার করে জেল দেয়, তবে সদরে আপিল করব। জামিন সঙ্গে সঙ্গে হবে।
দেবু বলিল—শতখানেক টাকা আমার পোস্ট আপিসে আছে, বিলুর কাছে ফরম সই করে দিয়েছি। দরকারমত টাকা বার করে নিয়ো। মামলা করে কিছু হবে না জানি, কিন্তু জেরা করে।
আমি সব একবার ফাঁস করে দিতে চাই।
অনিরুদ্ধ অত্যন্ত কাতরস্বরে বলিল দেবু ভাই, তার চেয়ে মামলা মিটিয়ে ফেল।
হাসিয়া দেবু বলিল—তুমি একটু সাবধানে থেকো, অনি-ভাই। ডাক্তার, ওকে তুমি একটু দেখো।
ছোট দারোগা বলিল–সন্ধে হয়ে গেল। কি ঠিক হল আপনাদের?
দেবু উঠিয়া দাঁড়াইল—চলুন, আমি তৈরি।
ছোট দারোগা ডাকিল-ভূপাল! রামকিষণ।
–একটুকুন দাঁড়ান, দারোগাবাবু! কোথা হইতে আসিয়া হাতজোড় করিয়া দাঁড়াইল দুর্গা। দেবুকে বলিল-আর একবার বিলুদিদির সঙ্গে দেখা করে যাও পণ্ডিত।
দারোগা বলিল—যান, দেখা করে আসুন।
মুখরা দুর্গা আজ নীরব হইয়া দেবুর আগে আগে পথ চলিতেছিল।
দেবু বলিল-দুর্গা, তুই কিন্তু ওদের একটু দেখিস, একটু খোঁজখবর নিস্।
অগ্ৰগামিনী শুধু নীরবে ঘাড় নাড়িয়া সায় দিল।
বিলু কাঁদতেছিল। দেবু চোখ মুছাইয়া দিল। তারপর শুধু কয়টা কাজের কথাই বলিল–পোস্ট আপিসের টাকাগুলো তুলে এনে নিজের কাছে রেখো, ডাক্তার যা চাইবে দিয়ো মামলার জন্যে। সাবধানে থেকো। ধান-পান হিসেব করে নিয়ে নিজেই তুমি হিসেব করে নিয়ো। তুমি তো হিসেব জান। মন-খারাপ কোরো না। খোকার ভার তোমার ওপর রইল—ঘরদোর সব। তুমি আমার ঘরের লক্ষ্মী, তুমি চঞ্চল হলে তো চলবে না; তোমায় থাকতে হবে অচলা হয়ে।
