বৃদ্ধা সস্নেহে তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিল-আমি তোকে আশীর্বাদ করছি ভাই, সায়েব তোকে দেখবামাত্তর ছেড়ে দেবে, চেয়ারে বসিয়ে বলবে পণ্ডিত লোক, তোমাকে কি জেহেল দিতে পারি বাপ!
দেবু হাসিল।
ওদিকে ব্যাপারটাকে চাপা দিয়া কৌশলে মুক্তিলাভ করাইবার কথাবার্তা হইতেছিল। শ্ৰীহরি ঘোষ তাহার অগ্রণী, সঙ্গে জমিদারের গোমস্তা দাশজী আছে। ছোট দারোগা শ্ৰীহরি ঘোষের বন্ধু। লোক, শ্ৰীহরি তাহাকেই ধরিয়াছে। প্রত্যক্ষভাবে না হইলেও পরোক্ষভাবে দেবু শ্রীহরির বিরোধীপক্ষ; অন্তরে অন্তরে দেবু তাহাকে ঘৃণা করে—তাহা শ্ৰীহরি জানে। কিন্তু গ্রামের প্রধান ব্যক্তি হিসাবে শ্রীহরি আজ দেবুর পক্ষ অবলম্বন না করিয়া পারে না। সে থাকিতে তাহার গ্রামবাসী বিশেষ করিয়া তাহার জ্ঞাতি একজনকে হাতে দড়ি দিয়া লইয়া গেলে লোকে কি বুলিবে? সে ছোট দারোগাকে খুশি করিয়া একটা উপায় উদ্ভাবনের চেষ্টা করিতেছে।
ছোট দারোগা বলিল—পেশকারের কাছে যাও, ধরে-পেড়ে হয়ে যাবে একরকম করে। যে আমিন-কানুনগোর সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে—তাদেরই খুশি কর, বিনয় করে মাফ চেয়ে নিক দেবু ঘোষ, ব্যস—মিটে যাবে। এ তো আকছার হচ্ছে।
শ্ৰীহরি বলিলখুডোর যে আমার বেজায় মাথাগরম গো—আমি প্রথম দিন শুনেই বলে পাঠিয়েছিলাম, খুড়া, একবার কানুনগো বাবুর সঙ্গে দেখা করে ব্যাপারটা মিটিয়ে এসো। রাজকর্মচারী তুই-তুকারি করলে তো হল কি?
ভবেশ অমনি বলিয়া উঠিল—এাই, গায়ে তো আর ফোকা পড়ে নাই।
শ্ৰীহরি বলিল—যখন ঘটনা ঘটল, তখুনি তখুনি জানতে পারলে তো সে ঢেউ আমিই তখুনি মেরে দিতাম ব্যাপারটা মিটিয়ে দিতাম। আমি যে অনেক পরে শুনলাম।
ব্যাপারটা এইভাবে ঘটিয়া গিয়াছিল। এও সেই তুই-তুকারি লইয়া ঘটনা।
দেবু আপনার দাওয়ায় বসিয়া ছিল—তখন বেলা প্রায় বারটা। সাইকেলে চড়িয়া সম্মুখের পথ দিয়া যাইতেছিল একজন কানুনগো। বোধহয় বহুদূর হইতে আসিতেছিল শীতের দিনে এক গা ঘামিয়া ধুলায় ও ঘামে আচ্ছন্ন এবং ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল ভদ্রলোক; দেবুকে দেখিয়া সাইকেল হইতে নামিয়াই সম্ভাষণ করিল—এই! ওরে! এই শোন্!
এই সম্ভাষণ শুনিলেই দেবু ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া ওঠে; তাহার তিক্ত কটু অতীতের স্মৃতি জাগিয়া ওঠে। তবু লোকটির মাথায় টুপি, সাদা শার্ট, খাকি হাফপ্যান্ট ও সাইকেল দেখিয়া সরকারি কর্মচারী অনুমান করিয়া সে চুপ করিয়াই রহিল।
—এই ইডিয়েট, শুনতে পাচ্ছিস?
এবার দেবু ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া লোকটির দিকে চাহিল-ইচ্ছা ছিল কোনো উত্তর না দিয়াই সে উঠিয়া গিয়া বাড়ির ভিতরে ঢুকিবে, উত্তর দিবে না, ওই লোকটার কোনো কথাই শুনিবে না। কিন্তু উঠিতে-উঠিতেও একবার সে লোকটির দিকে না চাহিয়া পারিল না।
চোখাচোখি হইতেই কানুনগো বলিল—যা, এক গ্রাস জল আন দেখি। বেশ ঠাণ্ডা জল। পরিষ্কার গ্লাসে, বুঝলি?
দেবু বিপদে পড়িয়া গেল। তৃষ্ণার জলের জন্য এই আবেদন অভদ্র হইলেও সে না বলিতে পারি না। তবুও সে মুখে কোনো কথা বলিল না, ঘরের ভিতর হইতে একটা মোড়া আনিয়া দাওয়ায় রাখিল; পিচবোর্ডে তৈয়ারি একখানা পাখা আনিয়া দিল। ওইগুলির মারফতেই নীরব আমন্ত্রণ জানাইয়া সে বাড়ির ভিতর চলিয়া গেল। কিছুক্ষণ পরই এক হাতে ঝকঝকে মাজা একখানি থালায় একটি বড় কদমা ও এক গ্লাস জল এবং অন্য হাতে একটি বড় ঘটির এক ঘটি জল ও পরিষ্কার একখানি গামছা আনিয়া হাজির করিল।
লোকটি হাত-মুখ ধুইল, গামছা আগাইয়া দিলে বা হাত দিয়া কানুনগো গামছাখানা সরাইয়া দিল। হাত-মুখ মুছিয়া ফেলিল সে আপনার রুমালে; তারপর কদমাটার খানিকটা ভাঙিয়া মুখে দিয়া বোধহয় চাখিয়া দেখিল। কদমাটা টাটকা কদমা, বেশ ভালই লাগিবার কথা। লাগিলও বোধহয় ভাল; কারণ গোটা কদমাটাই নিঃশেষ করিয়া জল খাইয়া কানুনগো পরিতৃপ্তির একটা নিশ্বাস ফেলিল–আঃ!
দেবু ইতিমধ্যে ভিতরে গিয়াছিল। পান বা মসলা আনিতে ভুল হইয়া গিয়াছিল। বিলুকে বলিল—সুপারি লবঙ্গ আর দুটো পান দাও দেখি! শিগগির।
পান সাজাই ছিল। এক টুকরা পরিষ্কার কলাপাতার উপর দুইটি পান ও সুপারি, লবঙ্গ সাজাইয়া সে স্বামীর হাতে তুলিয়া দিল।
ঠিক এই সময়েই বাহির হইতে ডাক আসিলওরে! এই ছোকরা!
দেবু আর সহ্য করিতে পারিল না। পানের পাতাটা সেইখানেই ফেলিয়া দিয়া বাহিরে আসিয়া সে বলিল কিরে, কি বলছিল?
এমন অতর্কিত রূঢ় প্রত্যুত্তরের জন্য কানুনগো প্রস্তুত ছিল না। বিস্ময়ে ক্রোধে প্রথমে সে কয়েক মুহূর্ত হতবাক হইয়া রহিল, তারপর বলিলহোয়াট! আমায় তুই-তুকারি করিস?
নিৰ্ভয়ে দেবু উত্তর দিল—সে তো তুই-ই আগে করলি।
—কি নাম তোর শুনি? তারপর দেখছি তোকে!
দেবু তাহার মুখের দিকে চাহিল, তারপর নির্ভয়ে বলিল-আমার নাম শ্রীদেবনাথ ঘোষ। তাহার দিকে আগাইয়া গিয়া বলিল—কি করবি কর!
কানুনগো বিনা বাক্যব্যয়ে চলিয়া গিয়াছিল।
ওদিকে জরিপ স্থগিত রাখিবার জন্য শ্ৰীহরিদের দরবারে বিশেষ ফল হয় নাই; ধান কাটিবার জন্য মাত্র আর সাত দিন সময় মঞ্জুর হইয়াছিল। কিন্তু পৌষের চৌদ্দ দিনের মধ্যে বিস্তীর্ণ মাঠের ধান কটা ও তোলা অসম্ভব ব্যাপার। অসম্ভব কোনোমতেই সম্ভব হয় নাই। হইয়াছে কেবল শ্ৰীহরির এবং আর জন দুই-তিনের-হরিশ দোকানি, বৃন্দাবন দত্ত এবং কৃপণ হেলারাম চাটুয্যের। তাহাদের পয়সা আছে, বহু নগদ মজুর নিযুক্ত করিয়া তাহারা কাজ শেষ করিয়াছে। বাকি লোকের পাকাধানের উপর দিয়াই জরিপ চলিতে আরম্ভ করিল। সরকার হইতে অবশ্য যথাসম্ভব সাবধানতা অবলম্বন করিয়া ধান বাঁচাইয়া আইলের উপর দিয়া কাজ করিতে নির্দেশ রহিল।
