–না।
–তবে নে, কাজগুলো সেরে নে। আগে একবার তামুক সেজে দে দেখি।
অনিরুদ্ধকে তামাক সাজিয়া দিয়া সে উনানে কড়া চড়াইয়া আরম্ভ করিল গুড়-নারিকেলের পাক। তাহার অন্তর আবার দুঃখের আক্ষেপের আবেগে ভরিয়া উঠিয়াছে। দেবু পণ্ডিতের কথা ছাড়িয়াই দিতে হইবে পণ্ডিত সত্যই দেবতার মত মানুষ! কিন্তু ওই দুর্গা, তাহারও দয়াধৰ্ম আছে, ভালবাসা আছে, রাঙাদিদির মত কৃপণ, সেও পুণ্যকর্ম করে। শ্ৰীহরি ঘোষের কীর্তি তাহার মহত্ত্ব দেখিয়া সে তো অবাক হইয়া গিয়াছে। কিন্তু তাহাদের জীবনে কি হইল!
দুঃখ তাহার নিজের জন্য, কিন্তু আজ সে হিংসা কাহাকেও করিল না। বরং সকলকেই সে শ্রদ্ধা নিবেদন করিল। আর বার বার কামনা করিল, মাগো! দুঃখ আমার দূর কর। সন্তানেসম্পদে আমার ঘর ভরিয়া দাও, আমি ষোড়শোপচারে তোমার পূজা দিব, আব্দুল কাটিয়া প্রদীপের সলিতা করিব, চুল কাটিয়া চামর বাঁধিয়া সে চামরে তোমায় বাতাস করিব, বুক চিরিয়া রক্ত দিয়া সেই রক্তে তোমার পায়ে আলতা পরাইব। তোমার পূজায় পঞ্চ-শব্দের বাজনা করিব, পট্টবস্ত্রের চাদোয়া টানাইবা রুপার সিংহাসনে সোনার ছাতার তলায় তোমাকে বসাইব; আত্মীয়স্বজন, পাড়া-পড়শী, দীন-দুঃখী, পশু-পক্ষীকে বিতরণ করিব তোমার প্রসাদ–একঅন্ন, পঞ্চাশ-ব্যঞ্জন!.
অনিরুদ্ধ বাড়ির বাহির হইতেই ব্যস্তসমস্ত হইয়া ব্যর্থ কণ্ঠে ডাকিল পদ্ম! ও পদ্ম!
পদ্ম চমকিয়া উঠিল। কি হইল আবার?
* * *
অনিরুদ্ধ ঘরের ভিতর ঢুকিয়া বলিল—কড়াইটা নামিয়ে রেখে আমার সঙ্গে আয় দেখি।
—কেন?
–পণ্ডিতকে ধরে নিয়ে গেল। পণ্ডিতের বাড়ি যাব।
–ধরে নিয়ে গেল? কে?
–সেটেলমেন্টের হাকিম পরোয়ানা বার করেছিল; থানা থেকে লোক এসে ধরে নিয়ে গেল।
সেটেলমেন্ট! সেটেলমেন্ট! উঃ—কোথা হইতে ইহারা আসিয়া গ্রামখানার অঁটি ধরিয়া ঝাকি দিয়া সর্ব অঙ্গ-স্নায়ুতন্ত্ৰী-মন এমন করিয়া অস্থির অবশ করিয়া দিল। নিত্য নূতন নোটিশ, নূতন হুকুম! ত-অ্যাঁটা পিয়নগুলোর যাওয়া আসার বিরাম নাই। পথে-ঘাটে সাইকেলের পর সাইকেল চলিয়াছে। কিন্তু হায় হায় এ কি কাণ্ড! দেবু পণ্ডিতের মত লোককে তাহারা ধরিয়া লইয়া গেল!
১৭. দেবু ঘোষের বিরুদ্ধে অভিযোগ
দেবু ঘোষের বিরুদ্ধে অভিযোগ একটি নয়। সরকারি জরিপের কাজে বাধা দেওয়া ও সার্ভে ডিপার্টমেন্টের কর্মচারী আমিনকে প্রহার করার অপরাধে সে অভিযুক্ত হইয়াছে। স্থানীয় সেটেলমেন্ট অফিসারের নির্দেশমত এখানকার থানার অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর একজন কনস্টেবল লইয়া আসিয়াছে। গ্রাম্য চৌকিদার ভূপালও তাহাদের সঙ্গে আছে। তাহারা চণ্ডীমণ্ডপে অপেক্ষা করিতেছিল। দেবু অনিরুদ্ধের বাড়ি হইতে আসিবামাত্র তাহাকে গ্রেপ্তার করিয়াছে। এখন হাতে হাতকড়ি দিয়া লইয়া যাওয়া হইবে। আজ রাত্রিতে থাকিবে হাজতে, কাল সকালে সেটেলমেন্ট অফিসারের নিকট হাজির করা হইবে। তিনি ইচ্ছা করিলে জা িনি দিবেন কিংবা বিচারাধীন আসামি হিসাবে তাহাকে সদর জেলে পাঠাইবেন। আবার ইচ্ছা করলে সঙ্গে সঙ্গে বিচারের দিন ধাৰ্য করিয়া নিজে বিচার করিবেন। দেবুকে লইয়া তাহারা চণ্ডীমণ্ডপেই বসিয়া আছে।
দেবুও চুপ করিয়া মাথা হেঁট করিয়া বসিয়া ছিল। মাথার ভিতরটাই কেমন যেন শূন্য হইয়া গিয়াছে; কিসে কি হইয়া গেল তাহা চিন্তা করিবার শক্তি পর্যন্ত নাই। শুধুই সে ভাবিতে পারিল যে, যাহা সে করিয়াছে-ভালই করিয়াছে; এখন যাহা হইবার হইয়া যাক!
দেখিতে দেখিতে গ্রামের প্রায় সকল লোকই জমিয়া গেল। শ্ৰীহরি ও দাশজী গোমস্তা, ছোট দারোগা সাহেবের পাশেই বসিয়া আছে। মধ্যে মধ্যে মৃদুস্বরে তিন জনে কথাও হইতেছে। হরিশ আসিয়াছে, ভবেশ আসিয়াছে, হরেন ঘোষাল, মুকুন্দ ঘোষ, কীৰ্তিবাস মণ্ডল, নটবর পাল ও গ্রামের দোকানি বৃন্দাবন, রামনারায়ণ ঘোষ, এমনকি এই শীতের সন্ধ্যায় বৃদ্ধ দ্বারকা চৌধুরীও আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। জগন ডাক্তার দেবুর পাশে বসিয়া আছে। প্ৰগল্ভ জগনও আজ স্তব্ধ, বিষণ্ণ—এমন আকস্মিক অভাবনীয় পরিণতিতে সে-ও হতভম্ব হইয়া গিয়াছে। একপাশে গ্রামের হরিজনেরা দাঁড়াইয়া আছে। সতীশ, পাতু সকলেই আসিয়াছে। দুর্গা বসিয়া আছে ষষ্ঠীতলার একপাশে একা, নীরবে, মাটির পুতুলের মত।
চিৎকার করিতেছে কেবল বুড়ি রাঙাদিদি। চণ্ডীমণ্ডপের ওপাশে গ্রামের প্রবীণারা পর্যন্ত আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। তাহাদের সম্মুখে দাঁড়াইয়া রাঙাদিদি বলিতেছিল—এ একেবারে হাতে করে মাথা কাটা! দারোগা! দারোগা হয়েছে তো সাপের পাঁচ পা দেখেছে। বলি হা গো দারোগা, চুরি না জোরি না ডাকাতি, কি করেছে বাছা যে, এই দিন সন্ধেবেলা রাত পোয়ালে লক্ষ্মী তুমি বাছার হাতে দড়ি দিতে এলে?
হরিশ বলিল-ওগো রাঙা পিসি, তুমি থাম।
–ক্যানে? থামব ক্যানে? দেখব একবার কত বড় ওই দারোগা মিনসে!
একবার ধমক দিয়া শ্ৰীহরি বলিল রাঙাদিদি, তুমি থাম। যা হয় আমরা করছি, তুমি একটু চুপ কর। তোমরা মেয়েলোক–
—মেয়েলোক? আমার সাড়ে তিন কুড়ি বয়স হল—আমি আবার মেয়েলোক কি রে? একশো বার বলব, হাজার বার বলব; আমাকে কি করবে? বাঁধবি তো বাঁধ ক্যানে, দেখি। পণ্ডিতের মতন লোককে দড়ি দিয়ে বাঁধছিল—আমাকেও বাঁধ। লে বাঁধ! আহা, পণ্ডিতের মতন মানুষ, দেবুর মত ছেলে! বুড়ি অকস্মাৎ কাঁদিয়া ফেলিল।
দেবু এবার নিজে উঠিয়া আসিয়া বলিল—একটু চুপ কর, রাঙাদিদি, আমি তোমার কাছে হাতজোড় করছি।
