দেশের রাজা সংবাদ পাইয়া আসিয়া সোনা দিয়া কিনিতে চাহিলেন সমস্ত ধান। রাজার ভাণ্ডারের সোনা ফুরাইয়া গেল কিন্তু রাখালের ধান অফুরন্ত। রাজার বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না। তখন রাজা আপনার কন্যাকে আনিয়া দান করিলেন রাখালের হাতে। সম্মুখেই পৌষসংক্রান্তিতে রাখাল লক্ষ্মীদেবীকে পূজা করিল। ওই ধানকেই স্থাপিত করিল সিংহাসনে, সিন্দুর কজ্জলে বসনে-ভূষণে তাহাকে বিচিত্র শোভায় সাজাইল, সম্মুখেই স্থাপন করিল জলপূৰ্ণ ঘট, ঘটের মাথায় দিল ডাব-আমের পল্লব। রাজকন্যা ঐ ধান ভানিয়া চাল করিলেন, চাল হইতে প্রস্তুত হইল সেই নানাবিধ সুখাদ্য, ঘৃতে-অন্নে ঘৃতান্ন, দুধে-অন্নে মিষ্টান্ন-পায়সান্ন-পরমান্ন, হরেক রকমের পিঠা সরুচাকলি, তাহার সঙ্গে পঞ্চপুষ্পে ধূপে-দীপে-চন্দনে-গন্ধে দেবীর পূজা করিয়া রাখাল ও রাজকন্যা দেবীর ভোগ দিয়া সর্বাগ্রে দিলেন কৃষাণকে, রাখালকে নিজের স্বামীকে, ঘরের জনকে তাহার পর বিলাইলেন পাড়া-প্রতিবেশীকে, হেলে বলদ, গাই-গুরু, ছাগল-ভেড়া—এমনকি বাড়ির উচ্ছিষ্টভভাজী কুকুরটা পর্যন্ত প্রসাদ পাইল।
লক্ষ্মীদেবী মূর্তিমতী হইয়া দেখা দিলেন, আপন পরিচয় দিলেন, বর দিলেন, তোমার মত এই পৌষ সংক্রান্তিতে যে আমার পূজার্চনা করিবে তাহার ঘরে আমি অচলা হইয়া বাস। করিব। পৃথিবীতে তাহার কোনো অভাব বা কোনো দুঃখ থাকিবে না। পরলোকে সে করিবে বৈকুণ্ঠে বাস।
* * *
ব্ৰত-কথাটি মনে মনে স্মরণ করিতে করিতে আশা-আকাঙ্ক্ষায় বুক বাঁধিয়া পরিতুষ্ট মনেই পদ্ম লক্ষ্মীর আয়োজন আরম্ভ করিল। ঘর-দুয়ার, খামার হইতে গোয়াল পর্যন্ত আলপনা অ্যাঁকিয়া এবার সে যেন একটু বেশি বিচিত্রিত করিয়া তুলিল। দুয়ার হইতে আঙিনার মধ্যস্থল পর্যন্ত আলপনায় অ্যাঁকিল চরণ-চিহ্ন। ওই চরণ-চিহ্ন। ওই চরণ-চিহ্নে পা ফেলিয়া লক্ষ্মী ঘরে আসিবেন। ঘরের মধ্যস্থলে সিংহাসনের সম্মুখে অ্যাঁকিল প্রকাও এক পদ্ম। অপরূপ তাহার কারুকার্য। মা আসিয়া বিশ্রাম করিবেন। শখ ধুইল, ধূপ বাহির করিল, প্রদীপ মার্জনা করিল, সিন্দুর রাখিল, কাজল পাড়িল। এদিকের আয়োজন শেষ করিয়া গুড়ে-নারিকেলে, গুড়ে-তিলে মিষ্টান্ন প্রস্তুত করিবে, দুধ জ্বাল দিয়া ক্ষীর হইবে। কত কাজ, কত কাজ! কাজের কি অন্ত আছে! আজ যদি তাহার একটা ছোট মেয়ে থাকি, তবে সে-ই জিনিসপত্রগুলি হাতে হাতে আগাইয়া দিতে পারিত। সহসা তাহার মনে পড়িয়া গেল—আলপনার কাজে তাহার একটা ভুল হইয়া গিয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপে পৌষ-আগলানোর আলপনা চাই সেটা দেওয়া হয় নাই।
এক মুহূর্তে সে দাঁড়াইয়া ভাবিয়া লইল। মনে পড়িল অনিরুদ্ধ তখন বলিতেছিল, চণ্ডীমণ্ডপে তাহার কেহ যাইবে না, তাহার পৌষ-আগলানো পর্ব হইবে তাহার বাড়ির দুয়ারে!
না, সে হইবে না। পদ্ম তাহা করিবে না, করিতে দিবে না। মাকালী, বাবা বুড়োশিবের চরণতল ওই চণ্ডীমণ্ডপ ছাড়িয়া,না, সে হইবে না। পদ্ম আলপনা গোলার বাটি হাতে চণ্ডীমণ্ডপ অভিমুখেই বাহির হইয়া গেল।
চণ্ডীমণ্ডপের সামনে দাঁড়াইয়া পদ্মের বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না। এ কি সেই চণ্ডীমণ্ডপ? কোন্ জাদুকরের মায়াদণ্ডের স্পর্শে তাহার আমূল পরিবর্তিত হইয়া গিয়া এমন অপরূপ শোভায় হাসিতেছে! এ যে সব পাকা হইয়া গিয়াছে। পথ হইতে চণ্ডীমণ্ডপে উঠিবার পাকা সিঁড়ির দুই পাশে দুইটি হাতির গঁড় সিঁড়িগুলিকে বেষ্টন করিয়া যেন ধরিয়া রাখিয়াছে ষষ্ঠীতলার বকুল গাছটির চারিপাশ পাকা গোল বেদি করিয়া বাঁধানো। চণ্ডীমণ্ডপের মেঝে পাকা হইয়াছে, মসৃণ সিমেন্টের পালিশ ঝকমক করিতেছে। থামগুলিতে পলেস্তারা কবা হইয়াছে। তাহাতে দুধবরন কলি-চুন দেওয়া হইয়াছে। ওপাশে নূতন একটা কুয়া। পদ্মের মনে পড়িয়া গেল—এসব শ্রীহরি ঘোষের কীর্তি। সে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া আলপনা অ্যাঁকিতে বসিল। পৌষ পৌষ পৌষ, বড় ঘরের মেঝেয় এসে বস–একটা ঘর অ্যাঁকিতে হইবে। মরাই অ্যাঁকিতে হইবে। এস পৌষ বস তুমি, না যেয়ো ছাড়িয়া। পৌষ মাস তো শ্ৰীহরির, তাহাদের আবার পৌষ মাস কিসের?
—কে গা? কে তুমি, একরাশ আলপনা যেন দিয়ে না, বাছা। মুঠো মুঠো খরচ করে একজন বাধিয়ে দিলে—আর তোমরা তো আপনার কল্যাণ করে চাল গোলা ঢালছ। এরপর ধোবে মুছবে কে?
পদ্ম মুখ ফিরাইয়া দেখিল, শ্ৰীহরির মা পথের উপর হইতে চিৎকার করিতেছে। পদ্ম প্রতিবাদ করতে পারিল না। শ্ৰীহরির মায়ের এ-কথা বলিবার অধিকার আছে বৈকি। সে কোনোমতে আলপনা শেষ করিয়া চলিয়া আসিল।
বাড়ি ঢুকিতে গিয়াই দেখিল, দেবু তাহাদেরই বাড়ি হইতে বাহির হইয়া আসিতেছে। ঘোমটা টানিয়া সে একপাশে সরিয়া দাঁড়াইল। দেবুর পিছনে বাড়ির দরজায় দাঁড়াইয়াছিল অনিরুদ্ধ। দেবু হাসিয়া পদ্মকেই বলিল—কাল তা হলে পণ্ডিতগিন্নির কাছে লক্ষ্মীর কথা শুনতে যেয়ো মিতেনী। সে বলে দিয়েছে।
পদ্ম অবগুণ্ঠিত মস্তকে সায় দিয়া ইঙ্গিতে জানাইল, সে যাইবে।
দেবু চলিয়া গেল।
অনিরুদ্ধ বলিল পণ্ডিত এসেছিল; কার কাছে শুনেছে, লক্ষ্মীর উ্যুগ হয় নাই আমার, তাই দুটো টাকা দিয়ে গেল। এমন মানুষ আর হয় না! কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া সে আবার বলিল, কিন্তু সংসারে বাড়-বাড়ন্ত তো ওর হবে না, হবে ছিরের।
পদ্ম চুপ করিয়া রহিল। সে-ও একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।
অনিরুদ্ধ আবার প্রশ্ন করিল, আর কিছু আনতে হয় তো বল?
