—তা দিস। তুই মানুষ তো ভাল, তবে বড় নচ্ছার। তা তুই যা করবি করগে, আমার কি?
দুর্গা সশব্দে হাসিয়া উঠিল—তা বৈকি, দিদির তো আর বুড়ো নাই। ভয়-ভাবনা কিসের? তা বাজার তোমার করে দোব দিদি।
বৃদ্ধা বলিল—মরণ। তার আবার হাসি কিসের লা?
—বেশ, আর হাসব না। এখন কি বলছ বল?
—মর, তোকে কে বলছে? বলছি নাতবউকে। হা লা নাতবউ, এবার যে বড় আমার বাড়িতে চাল কুটতে গেলি না?
রাঙাদিদির বাড়িতে চেঁকি আছে, পদ্ম বরাবরই রাঙাদিদির পেঁকিতে পিঠার চাল কুটিয়া আনে। এবার যায় নাই, তাই বৃদ্ধা আসিয়াছে।
—বলি হালা, তোকে আমি কখনও কিছু বলেছি নাকি? বল্ কিছু বলেছি কি না? মনে তো পড়ছে না ভাই!
কাহাকে কখন যে বুড়ি কি বলে সে আর পরে তাহার মনে থাকে না।
ম্লান হাসি হাসিয়া পদ্ম বলিলতার জন্য নয়; এবার চাল কোটাই হয় নাই রাঙাদিদি।
–চাল কোটাই হয় নাই? বলিস্ কি?
–না।
–আমরণ! তা আর কবে চাল কুটবি? রাত লোহালেই তো লক্ষ্মী–
পদ্ম চুপ করিয়া রহিল। দুর্গা মাঝখান হইতে বলিলনাতবউয়ের অসুখ তো জান, রাঙাদিদি। অসুখ শরীরে কি করবে বল?
—তবে? লক্ষ্মী হবে কি করে? তোর সেই হাদামুষল মিন্সে কোথা? সেই অনিরুদ্ধ? সে পারে না?
দুর্গাই বলিল হবে কোনো রকম করে। কম্মকার আসুক, দোকান থেকে কিনে আনবে।
-–কিনে আনবে? না না। কলে কোটা গঁড়োয় কি লক্ষ্মী হয়? ও নাতবউ, এক কাজ কর, আমার ঘর থেকে নিয়ে আয় চাট্টি খুঁড়ো। তা দু সের-আড়াই সের দিতে পারব। আচ্ছা, আমিই না হয় দিয়ে যাব। ওমা! তা বলতে হয়। আমি এক্ষুনি দিয়ে যাচ্ছি।
যাইতে যাইতে দরজার গোড়ায় দাঁড়াইয়া বৃদ্ধা বলিলইছু শেখ পাইকারের করণটা দেখ দেখি দুগ্গা, বুড়ো গাইটার দাম বলছে চার টাকা। শেষমেশ বলে, পাঁচ টাকা। তোদের পাড়ায় আর কেউ পাইকার এলে পাঠিয়ে দি তো বুন্।
দুৰ্গাও ঝুড়িটা লইয়া উঠিল, বলিল–বাটি-ঘটি কাল এসে নিয়ে যাব ভাই। আজ চললাম।
—এইখানে কাল খাবে।
–বেশ। দুর্গা হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেল।
অকস্মাৎ কোথা দিয়া কি হইয়া গেল। রাঙাদিদির সঙ্গে কথা বলিতে বলিতে কেমন করিয়া তাহার অন্তরের ক্ষোভ যেন জুড়াইয়া গেল। আবার সব ভাল লাগিতেছে। দুর্গার জিনিসগুলা সে প্রত্যাখ্যান করিল না, লাথি মারিয়া ফেলিয়া দিল না। দুর্গার ওই মিথ্যা কথাটা তাহার বড় ভাল। লাগিয়াছে; রাঙাদিদিকে সে বলিল—কামার-বউ তাহাকে জংশন শহর হইতে বাজার করিয়া আনিতে টাকা দিয়াছিল—এ সেই জিনিস।
সে রাঙাদিদির চালগুঁড়োর প্রতীক্ষা করিয়া রহিল। বাড়িতে আতপ চাল নাই। চাল গুঁড়াইয়া একবার বাটিয়া লইয়া আপনার গোলা তৈয়ারি করিতে হইবে। আপনা অ্যাঁকিতে হইবে বাহির দরজা হইতে ঘরের ভিতর পর্যন্ত খামারে, মরাইয়ের নিচে গোয়াল ঘরে পর্যন্ত। চণ্ডীমণ্ডপে আবার পৌষ আগলানোর আলপনা আছে। মনে পড়িল, আউরী-বাউরী চাই। কার্তিক সংক্রান্তি মুঠ লক্ষ্মীর ধানের খড় পাকাইয়া সেই দড়িতে বাঁধিতে হইবে বাড়ির প্রতিটি জিনিস। ঘরের বাক্স-পেটরা তৈজসপত্র সবেতেই পড়িবে মা-লক্ষ্মীর বন্ধন। ঘরের চালে পর্যন্ত আউরী-বাউরীর বন্ধন পড়িবে। তাহা হইলেই বৈশাখের ঝড়ে আর চাল উড়িবে না।
***
সেই পুরাকালে ছিল এক রাখাল ছেলে। বনের ধারে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সে আপনার গরুগুলিকে লইয়া চরাইয়া ফিরিত। গ্রীষ্মের রৌদ্র, বর্ষার বৃষ্টি, শীতের বাতাস তাহার মাথার। উপর দিয়া বহিয়া যাইত। মধ্যে মধ্যে দুঃখ-কষ্ট হইলে সে চোখের জল ফেলিত, আর ঊর্ধ্বমুখে দেবতাকে ডাকিত-ভগবান, আর পারি না, এ কষ্ট তুমি দূর কর, আমাকে বাঁচাও।
একদিন লক্ষ্মী-নারায়ণ চলিয়াছিলেন আকাশ-পথে। রাখালের কাতর কান্না আসিয়া পৌঁছিল। তাহাদের কানে। মা-লক্ষ্মীর কোমল হৃদয় ব্যথিত হইয়া উঠিল। দূর কর ঠাকুর, রাখালের দুঃখ। দূর কর!
নারায়ণ হাসিলেন। বলিলেন—এ দুঃখ দূর করিবার শক্তি তো আমার নাই লক্ষ্মী, সে শক্তি তোমার!
লক্ষ্মী বলিলেন—তুমি অনুমতি দাও।
নারায়ণের অনুমতি পাইয়া লক্ষ্মী আসিলেন মর্ত্যে। চারিদিক হাসিয়া উঠিল—সোনার বর্ণচ্ছটায়, বাতাস ভরিয়া উঠিল দেবীর দিব্যাঙ্গের অপরূপ সৌরভে। রাখাল অবাক হইয়া গেল। দেবী রাখালের কাছে আসিয়া বলিলেন দুঃখ তোমার দূর হইবে, তুমি আমার কথামত কাজ কর। এই লও ধানের বীজ; বর্ষার সময় মাঠে এইগুলি ছড়াইয়া দাও, বীজ হইতে গাছ হইবে। সেই গাছের বর্ণ যখন হইবে আমার দেহবর্ণের মত, আমার গাত্রগন্ধের মত, গন্ধে যখন ভরিয়া উঠিবে তাহার সর্বাঙ্গ, তখন সেগুলি কাটিয়া ঘরে তুলিবে।
রাখাল লক্ষ্মীকে প্রণাম করিল। বর্ষায় প্রান্তরের বুকে ছড়াইয়া দিল ধানের বীজ; দেখিতে দেখিতে সমস্ত মাঠ ভরিয়া গেল সবুজ ধানের গাছে। ক্ৰমে ক্ৰমে বর্ষা গেল—সবুজ ধানের ডগায় দেখা দিল শিষ। রাখাল নাড়িয়া-চাড়িয়া দেখিল, কিন্তু এখনও সেই ঠাকরুনের মত বর্ণ হয় না, সে গন্ধও উঠিতেছে না। রাখাল অপেক্ষা করিয়া রহিল। হেমন্তের শেষ অগ্রহায়ণে একদিন রাত্রে ঘরে শুইয়াই রাখাল পাইল সে গন্ধ। সকালে উঠিয়াই সে ছুটিয়া গেল মাঠে। অবাক হইয়া গেল। সোনার বর্ণে গোটা মাঠটা আলো হইয়া উঠিয়াছে, দিব্যগন্ধে আকাশ বাতাস আমোদিত। সোনার বর্ণে, দিব্যগন্ধে আকৃষ্ট হইয়া আকাশে নানাবিধ কীট-পতঙ্গ-পাখি উড়িতেছে-পশুরা, আসিয়া জুটিয়াছে চারিপাশে, সেই ঠাকরুন যেন তাহার দুঃখে বিগলিত হইয়া মাঠ জুড়িয়া অঙ্গ এলাইয়া বসিয়া আছেন। রাখাল ধান কাটিয়া ভারে ভারে ঘরে তুলিল।
