–মাছ? মাছ চাই না। কিছু খাব না, যা। পিণ্ডিতে আমার অরুচি ধরেছে।
পদ্ম আর কোনো কথা না বলিয়া ভাত বাড়িতে আরম্ভ করিল।
অনিরুদ্ধ অকস্মাৎ চিৎকার করিয়া উঠিল—তুই আমার লক্ষ্মী ছাড়ালি!
–আমি?
–হাঁ, তুই। রোগ হয়ে দিনরাত পড়ে আছিস, ঘরে সন্ধ্যে নাই, ধূপ নাই। এ ঘরে লক্ষ্মী থাকে? বলি কাল যে লক্ষ্মীপুজোতার কি কুটোগাছটা ভেঙে আয়োজন করেছিস? অনিরুদ্ধ রাগে ক্ষোভে অধীর হইয়া উঠিয়া চলিয়া গেল।
পদ্ম চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। তাহার অন্তরের ক্ষোভের উন্মত্ততা ইতিমধ্যে অদ্ভুতভাবে প্রশান্ত উদাসীনতায় পরিণত হইয়া আসিয়াছে। অনিরুদ্ধের এই অপমানে ক্ষোভে তাহার তৃপ্তি হইয়াছিল কি না কে জানে, কিন্তু তাহার নিজের ক্ষোভের উন্মত্ততা—যে উন্মত্ততাবশে কিছুক্ষণ পূর্বে সে ঘরে আগুন ধরাইয়া দিতে চাহিয়াছিল—সে উন্মত্ততা বিচিত্রভাবে শান্ত হইয়া গিয়াছে। আঁচল বিছাইয়া সেইখানেই সে শুইয়া পড়িল। তাহার বুকের ভিতর যেন একরাশ কান্না উথলাইয়া পড়িতেছে।
* * *
পদ্ম নীরবে দিতেছিল; দরদরধারে তাহার চোখ হইতে জল গড়াইয়া গাল ভিজাইয়া মাটির উপর ঝরিয়া পড়িতেছিল। কাঁদলে তাহার বুকের ভিতরে গভীর যন্ত্রণাদায়ক আবেগটা কমিয়া যায়। কাঁদিতে কাঁদিতে সে কিছুক্ষণ পর তৃপ্তি অনুভব করে, তাহার পর একটা আনন্দ পায়।
—কই হে, কামার-বউ কই হে?
কে ডাকিতেছে? পদ্ম নিঃশব্দে চোখের জল অ্যাঁচলে মুছিয়া ফেলিল। মুছিয়া ফেলিয়াও কিন্তু সাড়া দিল না, সাড়া দিতে ইচ্ছা হইল না।
–কামার-বউ! ওমা এই বিকেলবেলা উনোনের মুখে শুয়ে ক্যানে হে?
তাহাকে দেখিয়া পদ্মের সর্বশরীর জ্বলিয়া উঠিল। যে ডাকিতেছিল সে ঘরে আসিয়া ঢুকিয়াছে। সে দুর্গা।
কি আস্পর্ধা মুচিনীর! ডাকিবার ধরন দেখ না। অত্যন্ত অপ্রসন্ন কণ্ঠেই সে বলিল—কানে? কি দরকার?
হাসিয়া দুর্গা বলিল—একটা কথা আছে ভাই তোমার সঙ্গে।
—আমার সঙ্গে? কি কথা? কিসের কথা শুনি?
–বলব, তা উঠেই বস।
–আমার শরীরটা ভাল নাই।
দুর্গা শঙ্কিত কণ্ঠে বলিল—অসুখ করেছে? দাওয়ার উপর উঠব?
তড়িৎস্পৃষ্টের মত পদ্ম উঠিয়া বসিল, বলিল–না।
দুর্গা তাহার মুখের দিকে চাহিয়া হাসিয়া বলিল-ওমা, কাঁদছিলে বুঝি? কি হল? কর্মকারের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে বুঝি?
সে হি-হি করিয়া হাসিতে আরম্ভ করিল।
—সে খবরে তোমার দরকার কি? কি বলছ বল না? খোঁজ দেখ না! যেন আমার কত আপনার জন!
–আপনার জন তো বটে, ভাই। লই কিনা—তুমিই বল!
–তুই আমার আপনার জন? পদ্ম ক্ৰোধে এবার তুই বলিয়া সম্বোধন করিল।
দুর্গা কিন্তু তাহাতেও রাগ করিল না, হাসিল। হাসিয়া বুলিলা হে হ্যাঁ। যদি বলি আমি তোমার সতীন! তোমার কৰ্তা তো আমাকে ভালবাসে হে!
পদ্ম এবার ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল। দুরন্ত ক্ৰোধে রান্নাশালার ঝাটাগাছটা কুড়াইয়া লইল। দুর্গা হাসিয়া খানিকটা সরিয়া গিয়া বলিল ছোঁয়া পড়লে অবেলায় চান করতে হবে। আমার কথাটাই আগে শোন ভাই, তারপর না-হয় ঝাঁটাটা ছুড়েই মেরো! পদ্ম অবাক হইয়া গেল।
দুর্গা বলিল–দাঁড়াও ভাই, বারদরজাটা আগে বন্ধ করে দি। কে কখন এসে পড়বে।
পদ্ম তখনও শান্ত হয় নাই, সে কঁজালো সুরে বলিল—দরজা দিয়ে কি হবে? গণ্ডায় গণ্ডায় আমার তো নাগর নাই।
দুর্গা আবার হাসিয়া উঠিল, বলিল—আমার তো আছে ভাই। তারা যদি গন্ধে গন্ধে এসে পড়ে!
—আমার বাড়ি এলে ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেব না?
দুর্গা ততক্ষণে দরজা বন্ধ করিয়া দিয়াছে। ফিরিয়া সে সংস্পৰ্শ বাঁচাইয়া খানিকটা দূর হইতে বলিল—পরকে না হয় পার, কিন্তু তোমার আপন কত্তাটিকে? সেও যে আমার তুমি যা বললে—তাই! যাক শোন ভাই, ঠাট্টা লয়, এইগুলো ঘরে তুলে রাখ দেখি। সে ততক্ষণে কাখাল হইতে কাপড়-ঢাকা একটা চুপড়ি নামাইল। তাহার মধ্য হইতে নামাইয়া দিল—এক ঘটি দুধ, এক ভাঁড় গুড়, গোটাদুয়েক ছাড়ানো নারিকেল, সেরখানেক তিল, একটা পাত্রে আধসেটাক তেল—আরও কতকগুলি মসলাপত্র। বলিল—যাও, লক্ষ্মীপুজোর উয্যুগ করে ফেল। আতপ চাল তো আমার নাই, আর আমাদের চালগুঁড়োতে তো হবে না। আমি শুনলাম তোমার কর্তার কাছে।
পদ্মর সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া উঠিল, ইচ্ছা হইল লাথি মারিয়া জিনিসগুলোকে ছড়াইয়া ফেলিয়া দেয়। তাই সে দিত। কিন্তু ঠিক তখনই বাহির দরজায় ধাক্কা দিল। হয়ত অনিরুদ্ধ। ভাল, সে-ই আসুক-তারপর সামনেই সে লাথি মারিয়া ফেলিয়া দিবে।
দ্রুতপদে সে নিজেই গিয়া খুলিয়া দিল। কিন্তু সে অনিরুদ্ধ নয়—বুড়ি রাঙাদিদি। পদ্ম শান্তভাবে সম্ভাষণ করিলকে, রাঙাদিদি?
হ্যাঁ। তা হ্যাঁ লো নাতবউ!—বলিতে বলিতে বৃদ্ধার দৃষ্টি পড়িল দুর্গার উপর। ওমা, ও কে বসে? ওটা কে?
—আমি। কণ্ঠস্বর উচ্চ করিয়া দুর্গা বলিল রাঙাদিদি, আমি দুগ্গা, বায়েনদের দুগ্গা!
দুগ্গা! তোর কি আ-ছাটা মিত্তিকে নাই লা? এই হেথা, এই হোথা, একেবারে হুই মুলুকে! কঙ্কণা, জংশন কোথায় বা না যাস! তা হেথা কি করছিস লা? ওগুলো কি বটে।
—এই, কামার-বউ টাকা দিয়েছিল জংশন থেকে জিনিস কিনতে; তাই এনে দিলাম, রাঙাদিদি।
—তা আমাকে বলতে নাই? গাঁয়ে বসে চার আনার বাজার করলাম আজ, চাল বেচলাম এক টাকার। জংশনে চার আনার বাজারেও একটা পয়সা বাচত, চালের দরেও দুটো পয়সা বেশি পেতাম। আমার তো শক্তলোমথ সোয়ামী নাই, আবাগী আমি আমার উবৃগার করবি ক্যানে ব?
হাসিয়া দুর্গা বলিল—এইবার একদিন দিও দিদি, এনে দোব।
