আবার সরকারের সেটেলমেন্ট আসিয়াছে, নোটিশ হইয়াছে–আপন আপন জমিতে স্বত্ব স্বামিত্বের প্রমাণাদিসহ উপস্থিত থাকিতে হইবে। অন্যথায় সেটেলমেন্ট কার্যবিধি অনুযায়ী দণ্ডনীয় হইবেক।
এক টুকরা জমির জন্য কানুনগো ও আমিন বাবুদের সঙ্গে সেই ভোর হইতে বেলা তিন প্রহর কাটিয়া যায়, পাকা ধানের উপর দিয়া শিকল টানিতে টানিতে সেই জমিটুকুতে আসিতে চার-পাঁচ দিন সময় লাগে। সে টুকরাটা হইয়া গেলে দুই-তিন দিন কি চার-পাঁচ দিন নিশ্চিত, তাহার পর হয়ত আবার এক টুকরা। শুধু অনিরুদ্ধ নয়, সমস্ত গ্রামের লোকেরই এইভাবে লাঞ্ছনা-দুর্বিপাকের আর শেষ নাই! পৌষ সংক্রান্তিতে ঘরের মধ্যে লক্ষ্মীর সিংহাসন স্থাপনের উদ্যোগ হইতেছে; কিন্তু এবার লক্ষ্মী এখনও মাঠে! গোটা গায়ের মধ্যে একটি গৃহস্থেরও দান আসে নাই। ওই আবার একটা হাঙ্গামা রহিয়া গেল। ধান তোলার শেষ দিনে দাওন আসিবে–অনিরুদ্ধের নিজেকেই শেষ ধানগুচ্ছটি কাটিতে হইবেকাটা ধানের গোড়ায় জল দিয়া ধানগুচ্ছটি লইয়া আসিতে হইবে মাথায় করিয়া। অনিরুদ্ধের কৃষাণ নাই, ভাগ-জোতদারকে পায়েস রাঁধিয়া খাওয়াইতে হইবে। অন্যান্যবার এই লক্ষ্মীর সঙ্গেই ও পর্বটি সারা হইয়া যায়–এবার সেটেলমেন্টের দায়ে বাকি পড়িয়া রহিল।
* * *
ভাতের হাঁড়িটা নামাইয়া পদ্ম ফেন গালিয়া ফেলিল। খুঁজিয়া বাছিয়া ভাতের ভিতর হইতে একটা ছোট পুঁটলি টানিয়া বাহির করিল, পুঁটলিটার মধ্যে আছে খানিকটা মসুর কলাই, গোটাচারেক বড় আলু এবং একটুকরা কুমড়ার ফালি। এগুলা মাখিয়া ফেলিয়া আবার মাছ দেখিতে হইবে; মাছ নহিলে অনিরুদ্ধের ভাত উঠিবে না। এইজন্য খিড়কির ডোবার জলের কিনারায় কতকগুলা আপা অর্থাৎ গর্ত করা আছে—পকাল মাছগুলা তাহার মধ্যে ঢুকিয়া থাকে; সতর্ক ও ক্ষিপ্রভাবে হাতে চালাইয়া দিলেই ধরা যায়। পদ্ম অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া বাহিরের দরজার দিকে চাহিল। এ কাজটুকুও তো সে করিলে পারিত! কোথায় গেলেন নবাব? সেই একবার বাহির-দরজায় সাড়া শোনা গিয়াছিল–চণ্ডীমণ্ডপ না ঘটিবার সঙ্কল্পের আস্ফালন হইতেছিল, তারপর আর সাড়া নাই। চণ্ডীমণ্ডপ ছাঁটিব না। তবে তো মাকালী ও বাবা-শিবের বেগুনক্ষেত জলপ্লাবিত হইয়া গাছগুলা পচিয়া নিদারুণ ক্ষতি হইয়া গেল! ওইরূপ মতি না হইলে এই দুৰ্গতি হইবে কেন?
–কম্মকার রইছ নাকি হে? কষ্মকার! অকম্মকার! কৰ্ম্মকার হে!
কে লোকটা? উত্তর না পাইয়াও একনাগাড়ে ডাকিয়াই চলিয়াছে।
–অ কম্মকার! এই তোমার দুগ্গা বললে বাড়ি গেল কম্মকার, আর সাড়া দিচ্ছ না। ওহে। ও কৰ্ম্মকার।
অনিরুদ্ধ তাহা হইলে দুর্গার বাড়ি গিয়াছিল। রূপ আছে বলিয়াই ওই মুচিনীর বাড়ি। ছি-ছিছি!…লক্ষ্মী? ওই লোকের বাড়িতে লক্ষ্মী থাকে? না এই লোকের বংশ থাকে: পদ্ম যেন: পাগল হইয়া উঠিল—সে উনান হইতে জ্বলন্ত কাঠ একখানা টানিয়া বাহির করিল। আগুন ধরাইয়া দিবে ঘর-সংসারে সে আগুন ধরাইয়া দিবে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই বাড়ির ভিতর আসিয়া প্রবেশ করিল ভূপাল চৌকিদার।
—বলি, কম্মকার, তুমি কি রকম মানুষ হে? ডেকে ডেকে গলা আমার ফেটে গেল! কই ককার কই?
বাড়ির মধ্যে অনিরুদ্ধকে না পাইয়া ভূপাল খানিকটা অপ্রতিভ হইয়া গেল, অবশেষে পদ্মকেই উদ্দেশ করিয়া বলিল তুমি বাপু কম্মকারকে বোলো—আমি এসেছিলাম। আমার হয়েছে এক মরণ! ডাকলে নোকে যাবে না, আর গোমস্তা বলবে—শালা, বসে বসে ভাত খাবার জন্য তোকে মাইনে দিই!
—কে রে! কে কি বলবে কষ্মকারকে? কষ্মকার কার কি ধার ধারে? বাহির দরজা হইতেই কথা বলিতে বলিতে অনিরুদ্ধ ঘরে ঢুকিল।
এই যে কষ্মকার! ভূপাল হাফ ছাড়িয়া বাঁচিল।তুমি বাপু একবার চল, গোমস্তা তো আমার মুণ্ডপাত করছে।
অনিরুদ্ধ খপ করিয়া তাহার হাতখানা ধরিয়া ফেলিয়া বলিল—এই। বাড়ির ভেতর ঢুকলি ক্যানে তুই?
তাহার মুখের দিকে চাহিয়া ভূপাল এবার রুষ্টস্বরে বলিল হাত ছাড় কৰ্ম্মকার!
বাড়ি ঢুকলি ক্যানে তুই? খাজনার তাগাদা আছে, বাড়ির বাইরে থেকে করবি। জমিদারের নন্দী-বেটা ছুঁচোর গোলাম চামচিকে!
হাতটা মোচড় দিয়া ছাড়াইয়া লইয়া ভূপাল এবার হুঙ্কার দিয়া উঠিল—এ্যাঁও! মুখ সামলে, কম্মকার, মুখ সামলে বল। দু বছর খাজনা বাকি, খাজনা দাও নাই ক্যানে? আলবৎ বাড়ি ঢুকব। ইউনান বোর্ডের ট্যাক্স—তাও আজ পর্যন্ত দাও নাই!… ভূপালও বান্দীর ছেলে, সেও এবার বুক ফুলাইয়া দাঁড়াইল।
খাজনা, ইউনিয়ন বোর্ডের ট্যাক্স! অনিরুদ্ধ অস্থির হইয়া উঠিল। কিন্তু সে আর অধিক দূর অগ্রসর হইতে সাহস করিল না। ওসব কথা আমলে না আনিয়া সে তাহার নিজের অভিযোগটাই তুবার জাহির করিল—আমি যদি বাড়িতে থাকতাম, তা হলে নয় ঢুকতিস ঢুকতিস। বাড়িতে বেটাছেলে নাই—আমার বাড়ি ঢুকবি ক্যানে তুই?
ভূপাল বলিল—চল তুমি, গোমস্তা ডাকছে!
-–যা যা, বল গে, কারুর ডাকে আমি যাই না।
–খাজনার কি বলছ বল?
–যা বল গে, খাজনা আমি দেব না।
—বেশ। ভূপাল বাহির হইয়া চলিয়া গেল। অনিরুদ্ধও সাফ জবাব দিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া আস্ফালন আরম্ভ করিয়া দিল—আদালত আছে, উকিল আছে, আইন আছে, নালিশ কর গিয়ে। বাড়ির ভেতর ঢুকবে, বাড়ির ভেতর! ওঃ আস্পদ্ধা দেখ!
অকস্মাৎ সে কাঁদো-কাঁদো সুরে আবার বলিল–গরিব বলে আমাদের যেন মান-ইজ্জত নাই! আমরা মানুষ নই!
পদ্ম একটি কথাও বলে নাই, নীরবেই সিদ্ধ সামগ্রীগুলি নুন-তেল দিয়া মাখিতেছিল। এতক্ষণে বলিল–হ্যাঁগা, মাছের কি হবে?
