অনিরুদ্ধ বাহিরে গিয়াছে। বাড়িতে কেহ কোথাও নাই। নির্জন নিঃসহ অবস্থায় আজ অহরহ। মনে হইতেছে তাহার সেই স্বপ্নের কথাগুলি, জগন ডাক্তারের কথাগুলি। ছিরু পালের বড়। ছেলেটা তাহার মাকে কি ভালই না বাসে।
ওই–ওই কি আসিবে?
ধক্ধক্ করিয়া তাহার হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হইয়া উঠিল।
সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল, ছেলেটির শীর্ণ গৌরাঙ্গী মা ওই খিড়কির দরজার মুখেই আধকালো আধ-অন্ধকারের মধ্যে পদ্মের দিকে মিনতিভরা চোখে চাহিয়া দাঁড়াইয়া আছে। সে একটা সকাতর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল। বার বার আপন মনেই বলিলনা-না-না, তোমার বুকের ধন। কেড়ে নিতে আমি চাই না। আমি চাই না। আমি চাই না।
উনানের মধ্যে কাঠগুলা জ্বলিয়া উঠিয়াছে, হাঁড়ি-কড়া সম্মুখেই–এইবার রান্না চড়াইয়া দেওয়া উচিত; কিন্তু সে তাহার কিছুই করিল না। চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। অন্তরের মধ্যে থাকিয়া থাকিয়া অকস্মাৎ চকিতের মত অধীর অতৃপ্ত কেহ অতি নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে বলিয়া উঠিতেছে–মরুক, মরুক! মনশ্চক্ষে ভাসিয়া উঠিতেছে পাল-বধূর সন্তান। সভয়ে চাঞ্চল্যে শিহরিয়া উঠিয়া নীরবেই পদ্ম বলিতেছিলনা-না-না।
পাল-বধূর আটটি সন্তান হইয়াছিল, তাহার মধ্যে মাত্র দুইটি অবশিষ্ট আছে; আবারও নাকি সে সন্তানসম্ভবা। তাহার গেলে সে আবার পায়। যাক, তাহার আর একটা যাক। ক্ষতি কি!
উনানের আগুন বেশ প্রখরভাবেই জ্বলিয়া উঠিয়াছিল, তবুও সে কাঠগুলাকে অকারণে ভিতরে ঠেলিয়া দিল, অকারণেই স্কুটস্বরে বলিয়া উঠিল—আঃ, ছিছিছি! ছি-ছিকার করিল
সে আপন মনের ভাবনাকে।
তারপরই সে ডাকিল পোষা বিড়ালটাকে—মেনী মেনী, আয় আয়, পুষি আয়!
ছেলে না হইলে কিসের জন্য মেয়েমানুষের জীবন! শিশু না থাকিলে ঘর-সংসার! শিশু রাজ্যের জঞ্জাল আনিয়া ছড়াইবে,-পাতা, কাগজ, কাঠি, ধুলা, মাটি, ঢেলা, পাথর কত কি! কি তিরস্কার করিবে, আবার পরিষ্কার করিবে, রূঢ় তিরস্কারে শিশু কাঁদবে, পদ্ম তখন তাহাকে বুকে লইয়া আদর করিবে। তাহার আবদারে নিজের ধুলার মুঠা মুখের কাছে লইয়া খাওয়ার অভিনয় করিবে। হামহামহাম! শিশু কাঁদবে হাসিবে, বকবক করিয়া বকিবে, কত বায়না ধরিবে, সঙ্গে সঙ্গে পদ্মও আবোল-তাবোল বকিয়া ক্লান্ত হইয়া শেষে তাহাকে একটা চড় কষাইয়া দিবে। কাঁদিতে কাঁদতে সে কোলে আসিয়া ঘুমাইয়া পড়িবে। তাহার গায়ে-মাথায় হাত বুলাইয়া, দুটি গালে দুটি চুমা খাইয়া তাহাকে লইয়া উঠানময় ঘুরিয়া বেড়াইবে আর চাদকে ডাকিবে-আয় চাদ, আয় আয়, চাঁদের কপালে চাঁদ দিয়ে যা!
এইসব কল্পনা করিতে করিতে ঝরঝর করিয়া তাহার চোখ দিয়া জল ঝরিয়া পড়িতে আরম্ভ করিল।
তাহার নিজের নাই, কেহ যদি তাহাকে একটি শিশু পালন করিতেও দেয়! একটি মাতৃহীন শিশু। শিশুসন্তানের জননী কেহ মরে না! ওই পালবধূ মরে না! পণ্ডিতের স্ত্রী মরে না! না হয় তো তাহার নিজের মরণ হয় না কেন। সে মরিলে তো সকল জ্বালা জুড়ায়।
বাহিরে অনিরুদ্ধের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, চণ্ডীমণ্ডপের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ নাই। ওখানে আর যাচ্ছি না। আমার পৌষ-আগলানো আমার নিজের বাড়ির দরজায় হবে।
পদ্মের মনের মধ্যে অকস্মাৎ জাগিয়া উঠিল একটা দুরন্ত ক্ৰোধ। ইচ্ছা হইল—উনানের জ্বলন্ত আগুন লইয়া এই ঘরের চারিদিকে লাগাইয়া দেয়। যাক, সব পুড়িয়া ছাই হইয়া যাক। অনিরুদ্ধ পর্যন্ত পুড়িয়া মরুক। পরমুহূর্তেই সে জ্বলন্ত উনানের উপর হাড়িটা চাপাইয়া দিল, তাহাতে জল ঢালিয়া, চাল ধুইতে আরম্ভ করিল।
কাল আবার লক্ষ্মীপূজা, পৌষ-সংক্রান্তিতে পৌষ-লক্ষ্মী।
লক্ষ্মী! তাহার আবার লক্ষ্মী! কার জন্যে লক্ষ্মী? কিসের লক্ষ্মী?
১৬. পৌষ-লক্ষ্মী অর্থাৎ পৌষ-পার্বণ
পৌষ-সংক্রান্তির দিন পৌষ-লক্ষ্মী অর্থাৎ পৌষ-পার্বণ। নবান্নের দিন হইতে মাস দেড়েক পর পল্লীবাসীর জীবনে আর একটি সর্বজনীন উৎসব আসিল। যে জীবনে উদয়কাল হইতে অস্তকাল পর্যন্ত বার ঘণ্টা সময়ের অর্ধেকটা চলে হল-আকর্ষণকারী কুজপৃষ্ঠ বলদের অতি-মন্থর পদক্ষেপের পিছনে পিছনে, অথবা ঘরের সমান উঁচু ধান ও খড়-বোঝাই গরুর গাড়ির চাকা ঠেলিয়া অথবা শ্বাস রোগীর মত দুঃসহ কষ্টে হাঁপাইতে হাঁপাইতে ধানের বোঝা মাথায় করিয়া আনিতে আনিতে কাটিয়া যায় টানিয়া টানিয়া শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলিয়া, সেখানে দেড় মাস সময় পরিমাপে নগর-জীবনের তুলনায় নিশ্চয়ই দীর্ঘ। একটানা একঘেয়ে জীবন।
মধ্যে ইতুলক্ষ্মী গিয়াছে; কিন্তু ইলক্ষ্মীতে নিয়ম আছে, পালন আছে, পার্বণের সমারোহ নাই। পৌষ-পার্বণে ঘরে ঘরে সমারোহ, পিঠা-পরব। অগ্রহায়ণ-সংক্রান্তিতে খামারে লক্ষ্মী পাতিয়া চিঁড়া, মুড়কি, মুড়ি, মুড়ির নাড়ু, কলাই ভাজা ইত্যাদিতে পূজা হইয়াছিল। পৌষসংক্রান্তিতে ঘরের মধ্যে লক্ষ্মীর আসন পাতিয়া ধান-কড়ি সাজাইয়া সিংহাসনের দুইপাশে দুইটি কাঠের পেঁচা রাখিয়া লক্ষ্মীপূজা হইবে। এক অন্ন পঞ্চাশ ব্যঞ্জনে লক্ষ্মীর সঙ্গে নানা দেবতার ভোগ দেওয়া হইবে। রাশিকৃত চাল চেঁকিতে কুটিয়া পুঁড়া প্রস্তুত হইয়াছে—পিঠা তৈয়ারি হইবে হরেক রকমের। রস প্রস্তুত হইয়াছে, রসে সিদ্ধ পিঠা হইবে। তাহা ছাড়া গুড়ে-নারিকেলে, গুড়েতিলে মিষ্টান্ন প্রস্তুত হইয়াছে, পাতলা ক্ষীর হইয়াছে, চাচি বা খোয়া ক্ষীর হইয়াছে—লোকে আকণ্ঠ পুরিয়া প্ৰসাদ পাইবে।
অনিরুদ্ধের এসবের আয়োজন কিছুই হয় নাই। একে পদ্মের দেহ অসুস্থ, তার উপর একটি পয়সাও তাহার হাতে নাই। গোটা পৌষটাই অনিরুদ্ধের কামারশালা একরকম বন্ধ গিয়াছে। বলিলেই হয়। লোহার কাজ এ সময়ে বেশি না হইলেও কিছু হয়; ধান কাটার কাস্তে পাজানো এবং গরুর গাড়ির চাকার খুলিয়া-পড়া লোহার বেড় লাগানো কাজ না করাইয়া চাষীদের উপায় নাই। কিন্তু অবসরের অভাবে অনিরুদ্ধ তাহাও করিতে পারে নাই। অবসর পাইবে কোথায়? পদ্মের অসুখ লইয়াই মাথা খারাপ করিয়া তাহার দিন কাটিয়াছে। আজ এখানে গিয়াছে, কাল ওখানে গিয়াছে। শিবনাথতলা, কোন্ এক মুসলমান ওস্তাদের বাড়ি যাইতে সে বাকি রাখে নাই। সব করিয়াছে ধার করিয়া। খরিদ্দারের টাকা ভাঙিয়া। এদিকে পাঁচ বিঘা বাকুড়ির ধান তাহার গিয়াছে। বাকি জমির ধান ভাগ-জোতদারের সঙ্গে নিজে লাগিয়া কাটিতেছে ও ঘাড়ে করিয়া আনিয়া ঘরে তুলিতেছে।
