অনিরুদ্ধ বলিল—তাই দেখি।
–দেখি নয়, শিবনাথতলাতেই যা তুই। দেখ না, কি বলে।
একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া অনিরুদ্ধ একটু হাসিল—অত্যন্ত ম্লান হাসি। বলিল–এদিকে যে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে, এগিয়ে যাই কি করে?
ডাক্তার অনিরুদ্ধের দিকে চাহিল, অনিরুদ্ধ বলিলপুঁজি ফাঁক হয়ে গেল ডাক্তারবাবু, বর্ষাতে হয়ত ভাই জুটবে না। বাকুড়ির ধান মূলে-চুলে গিয়েছে, গাঁয়ের লোকে ধান দেয় নাই, আমিও চাইতে যাই নাই। তার ওপর মাগীর এই রোগে কি খরচটা হচ্ছে, তা তো আপনি সবই জানেন গো। শিবনাথের শুনেছি বেজায় খাই।
প্ৰেত-দেবতা শিবনাথ রোগ-দুঃখের প্রতিকার করিয়া দেয়, কিন্তু বিনিময়ে তাহার মাকে মূল্য দিতে হয়। সেটা লাগে প্রথমেই।
জগন বলিল—সঁচ-সাত টাকা হলে আমি না-হয় কোনো রকমে দেখতাম অনিরুদ্ধ, কিন্তু বেশি হলে তো—
অনিরুদ্ধ উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল—ডাক্তারের অসমাপ্ত কথার উত্তরে সে বলিয়া উঠিল, তাতেই হবে ডাক্তারবাবু, তাতেই হবে, আরও কিছু আমি ধারধোর করে চালিয়ে নোব। দেবুর কাছে কিছু, আপনার আর দুগ্গার কাছে যদি
ডাক্তার ক্র কুঞ্চিত করিয়া প্রশ্ন করিল দুগ্গা?
অনিরুদ্ধ ফিক করিয়া হাসিয়া ফেলিল, তারপর মাথা চুলকাইয়া একটু লজ্জিতভাবেই বলিল—পেতো মুচির বোন দুগ্গা গো!
চোখ দুইটা বড় করিয়া ডাক্তারও একটু হাসিলও! তারপর আবার প্রশ্ন করিল-ষ্টুড়ির হাতে টাকাকড়ি আছে, নয়?
—তা আছে বৈকি। শালা ছিরের অনেক টাকা ও বাগিয়ে নিয়েছে। তা ছাড়া কঙ্কণার বাবুদের কাছেও বেশ পায়। পাঁচ টাকার কমে হাঁটেই না।
–ছিরের সঙ্গে নাকি এখন একেবারেই ছাড়াছাড়ি শুনলাম?
চোখ দুইটা বড় বড় করিয়া অনিরুদ্ধ বলিল-আমার কাছে একখানা বগিদা করিয়ে নিয়েছে, বলে—ক্ষ্যাপা কুকুরকে বিশ্বাস নাই। রাত্রে সেখানা হাতের কাছে নিয়ে ঘুমোয়।
—বলিস্ কি?
–আজ্ঞে হ্যাঁ!
–কিন্তু তোর সঙ্গে এত মাখামাখি কিসের? আশনাই নাকি?
মাথা চুলকাইয়া অনিরুদ্ধ বলিল–না–তা নয়, দুগ্গা লোক ভাল, যাই-আসি গল্পসল্প করি।
—মদটদ চলে তো?
–তা—এক-আধ দিন মধ্যে-মাঝে—
অনিরুদ্ধ লজ্জিত হইয়া হাসিল।
* * *
পথের উপর দাঁড়াইয়া ডাক্তারকে অকপটে সে সব থাই খুলিয়া বলিল।
দুর্গার সঙ্গে সত্যিই অনিরুদ্ধের ঘনিষ্ঠতা হৃদ্য হই গড়িয়া উঠিতেছে। আজকাল দুর্গা শ্ৰীহরির সহিত সকল সংস্রব ছাড়িয়া নূতনভাবে জীবনের ছক কাটিবার চেষ্টা করিতেছে।
আজকাল দুর্গা জংশনে যায় নিত্যই, দুধের যোগান দিতে। ফিরিবার পথে অনিরুদ্ধের কামারশালায় একটি বিড়ি বা সিগারেট খাইয়া, সরস হাস্য-পরিহাসে খানিকটা সময় কাটাইয়া তবে বাড়ি ফেরে। অনিরুদ্ধও সকালে দুপুরে বিকালে জংশনে যাওয়া-আসার পথে দুর্গার বাড়ির সম্মুখ দিয়াই যায়; দুৰ্গাও একটি করিয়া বিড়ি দেয়, বিড়ি টানিতে টানিতে দাঁড়াইয়াই দুই-চারিটা কথাবার্তা হয়। দাখানাকে উপলক্ষ করিয়া হৃদ্যতাটুকু স্বল্পদিনের মধ্যেই বেশ ঘন হইয়া উঠিয়াছে; মধ্যে একদিন লোহা কিনিবার একটা গুরুতর প্রয়োজনে—টাকার অভাবে বিব্রত হইয়া অনিরুদ্ধ চিন্তিতমুখেই কামারশালায় বসিয়া ছিল, সেদিন দুর্গা আসিয়া প্রশ্ন করিয়াছিল—এমন করে গুম মেরে বসে কেন হে?
দুর্গাকে বিড়ি দিয়া নিজেও বিড়ি ধরাইয়া অনিরুদ্ধ কথায় কথায় অভাবের কথাটা খুলিয়া বলিয়াছিল। দুর্গা তৎক্ষণাৎ অ্যাঁচলের খুঁট খুলিয়া দুইটা ঢাকা বাহির করিয়া তাহাকে দিয়া বলিয়াছিল চার দিন পরেই কিন্তুক শোধ দিতে হবে ভাই।
অনিরুদ্ধ সে টাকাটা ঠিক চার দিন পরেই দিয়াছিল। দুৰ্গা সেদিন হাসিয়া বলিয়াছিল–সোনার চাঁদ খাতক আমার!
অনিরুদ্ধকে দুর্গার বড় ভাল লাগে। ভারি তেজী লোক, কাহারও সে তোয়াক্কা রাখে না। অথচ কি মিষ্ট স্বভাব! সবচেয়ে ভাল লাগে কামারের চেহারাখনি। লম্বা মানুষটি। দেহখানিও যেন পাথর কাটিয়া গড়া! প্ৰকাণ্ড লোহার হাতুড়িটা লইয়া সে যখন অবলীলাক্রমে লোহার উপর আঘাতের পর আঘাত করিতে থাকে তখন ভয়ে তাহার সর্বাঙ্গ শিহরিয়া ওঠে; কিন্তু তবুও ভাল লাগে, একটি আঘাতও বেঠিক পড়ে না।
***
ডাক্তারকে বিদায় করিয়া অনিরুদ্ধ বাড়ির মধ্যে ফিরিয়া দেখিল পদ্ম চুপ করিয়া বসিয়া আছে, রান্নাবান্নার নাম-গন্ধ নাই। পদ্মকে সে আর কিছু বলিল না, কতকগুলো কাঠ-কুটা উনানের মুখে আনিয়া উনান ধরাইতে বসিল। রান্না করিতে হইবে, তাহার পর আবার ছুটিতে হইবে জংশনে। রাজ্যের কাজ বাকি পড়িয়া গিয়াছে।
পদ্ম কাহাকে ধমক দিল–যা!
অনিরুদ্ধ ফিরিয়া চাহিল, কিন্তু কেহ কোথাও নাই। কাক কি কুকুর, কি বিড়াল, তাও কোথাও নাই। সে ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া প্রশ্ন করিল–কি?
পদ্ম উত্তরে প্রশ্ন করিল–কি?
অনিরুদ্ধ একেবারে ক্ষেপিয়া গেল, বলিল—ক্ষেপেছিস নাকি তুই? কিছু কোথাও নাই, ধমক দিচ্ছিস কাকে?
পদ্ম এইবার লজ্জিত হইয়া পড়িল, শুধু লজ্জিতই নয়, একটু অধিক মাত্রায় সচেতন হইয়া সে ধীরে ধীরে উঠিয়া উনানশালে আসিয়া বলিল—সর। আমি পারব। তুমি যাও।
অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ তাহার মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া উঠিয়া গেল। আর সে পারিতেছে না।
কিন্তু তাহার অনুপস্থিতিতে যদি পদ্মের রোগ উঠিয়া পড়ে! সে দ্বিধাগ্রস্ত হইয়া দাঁড়াইল। পড়ে পড়ুক, সে আর পারে না। সে বাহির হইয়া গেল।
পদ্ম রান্না চাপাইল। ভাতের সঙ্গে কতকগুলো আলু, একটা ন্যাড়ায় বাঁধিয়া কতকগুলি মসুরির ডাল ফেলিয়া দিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
