পদ্মের অসুখ সম্বন্ধে নিজের ধারণার কথা অনিরুদ্ধ গিরিশকে বলিলেও তারাকে বলে নাই তারাচরণকে তাহারা ঠিক বিশ্বাস করে না।
কিন্তু তারাচরণ অনেক সন্ধান রাখে, ভাল রোজা, জাগ্ৰত দেবতার অথবা প্রেতদানার স্থান, যেখানে ভর হয়—এ সবের সন্ধান তারা নাপিত দিতে পারে। অনিরুদ্ধ ভাবিয়াছিল—তারা নাপিতকে কথাটা বলিবে কি না।
সেদিন মনের আবেগে অনিরুদ্ধ কথাটা তারাচরণের পরিবর্তে বলিয়া ফেলিল জগন ডাক্তারকে। দ্বিপ্রহরে জংশনের কামারশালা হইতে ফিরিয়া অনিরুদ্ধ দেখিল, পদ্ম মূৰ্ছিত হইয়া পড়িয়া আছে। ইদানীং পদ্মর মূর্ঘা-রোগের পর সে দুপুরে বাড়ি ফিরিয়া আসে। সেদিন ফিরিয়া পদ্মকে মূৰ্ছিত দেখিয়া বারকয়েক নাড়া দিয়া ডাকিল, কিন্তু সাড়া পাইল না। কখন যে মূৰ্ছা হইয়াছে—কে জানে! মুখে-চোখে জল দিয়াও চেতনা হইল না। কামারশালায় তাতিয়া পুড়িয়া এতটা আসিয়া অনিরুদ্ধের মেজাজ ভাল ছিল না। বিরক্তিতে ক্রোধে সে কাণ্ডজ্ঞান হারাইয়া ফেলিল। জলের ঘটিটা ফেলিয়া দিয়া, পদ্মের চুলের মুঠি ধরিয়া সে নিষ্ঠুরভাবে আকৰ্ষণ করিল। কিন্তু পদ্ম অসাড়! চুল ছাড়িয়া দিয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া থাকিতে থাকিতে অনিরুদ্ধের বুকের ভিতরটা কান্নার আবেগে থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল। সে পাগলের মত ছুটিয়া আসিল। জগনের তেজী ওষুধের ঝুঁজে পদ্ম অচেতন অবস্থাতেই বারকয়েক মুখ সরাইয়া শেষে গভীর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া চোখ মেলিয়া চাহিল।
ডাক্তার বলিল—এই তো চেতন হয়েছে। কাঁদছিস কেন তুই?
অনিরুদ্ধের চোখ দিয়া দরদরধারে জল পড়িতেছিল। সে ক্রন্দনজড়িত কণ্ঠেই বলিল–আমার অদেষ্ট দেখুন দেখি, ডাক্তার? আগুন-তাতে পুড়ে এই এক ক্রোশ দেড় ক্রোশ রাস্তা এসে আমার ভোগান্তি দেখুন দেখি একবার!
ডাক্তার বলিল—কি করব বল? রোগের উপর তো হাত নাই! এ তো আর মানুষে করে দেয় নাই!
অনিরুদ্ধ আজ আর আত্মসংবরণ করিতে পারি না, সে বলিয়া উঠিল—মানুষ, মানুষেই করে দিয়েছে ডাক্তার; তাতে আমার এতটুকুন সন্দেহ নাই। রোগ হলে এত ওষুধপত্র পড়ছে, তাতেও একটুকু বারণ শুনছে না রোগ! এ রোগ নয়—এ মানুষের কীর্তি।
জগন, ডাক্তার হইলেও, প্রাচীন সংস্কার একেবারে ভুলিতে পারে না। রোগীকে মকরধ্বজ এবং ইনজেকশন দিয়াও সে দেবতার পাদোদকের উপর ভরসা রাখে। অনিরুদ্ধের মুখের দিকে চাহিয়া সে বলিলতা-যে না হতে পারে তা নয়। ডাইনী-ডাকিনী দেশ থেকে একেবারে যায় নাই। আমাদের ডাক্তারি শাস্ত্রে তো বিশ্বাস করে না! ওরা বলছে
বাধা দিয়া অনিরুদ্ধ বলিল বলুক, এ কীর্তি ওই হারামজাদা ছিরের।
ক্রোধে ফুলিয়া সে এতখানি হইয়া উঠিল।
সবিস্ময়ে জগন প্রশ্ন করিলছিরের?
–হ্যাঁ, ছিরের। ক্রুদ্ধ আবেগে অনিরুদ্ধ পদ্মের সেই স্বপ্নর কথাটা আনুপূর্বিক ডাক্তারকে বলিয়া সে বলিলই যে চন্দর গড়াই, ছিরে শালার প্রাণের বন্ধু–ও শালা ডাকিনী-বিদ্যে জানে! যোগী গড়ায়ের বিধবা মেয়েটাকে কেমন বশীকরণ করে বের করে নিলে—দেখলেন তো! ওকে দিয়েই এই কীর্তি করেছে। এ একেবারে নিশ্চয় করে বলতে পারি আমি।
জগন গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হইয়া গেল, কিছুক্ষণ পর বার দুই ঘাড় নাড়িয়া বলিল। ক্রোধে অনিরুদ্ধের ঠোঁট থরথর করিয়া কাঁপিতেছিল। পদ্ম এই কথাবার্তার মধ্যে উঠিয়া বসিয়াছিল; দেওয়ালে ঠেস দিয়া বসিয়া সে হাঁপাইতেছিল। অনিরুদ্ধের ধারণার কথাটা শুনিয়া সে অবাক হইয়া গেল।
জগন বলিল—তাই তুই দেখ্ অনিরুদ্ধ; একটা মাদুলি কি তাবিজ হলেই ভাল হয়। তারপর বলিল—দেখ্, একটা কথা কিন্তু আমার মনে হচ্ছে; দেখিস তুই-এ ঠিক ফলে যাবে; নিজের বাণে বেটা নিজেই মরবে।
অনিরুদ্ধ সবিস্ময়ে জগনের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। জগন বলিল-সাপের স্বপ্ন দেখলে কি হয় জানিস তো?
–কি হয়?
–বংশবৃদ্ধি হয়, ছেলে হয়, তাদের কপালে ছেলে নাই, কিন্তু ছিরে নিজে যখন সাপ ছেড়েছে, তখন ওই বেটার ছেলে মরে—তোর ঘুরে এসে জন্মাবে। তোর হয়ত নাই, কিন্তু ও নিজে থেকে দিয়েছে।
জগনের এই বিচিত্র ব্যাখ্যা শুনিয়া অনিরুদ্ধ বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া গেল, তাহার চোখ দুইটা বিস্ফারিত হইয়া উঠিয়াছিল, সে জগনের মুখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল।
পদ্মের মাথার ঘোমটা অল্প সরিয়া গিয়াছে, সে-ও স্থির বিচিত্র দৃষ্টিতে চাহিয়া ছিল সম্মুখের দিকে। তাহার মনে পড়িয়া গেল—ছিরুর শীর্ণ গৌরবর্ণা স্ত্রীর কথা। তাহার চোখ-মুখের মিনতি, তাহার সেই কথা—আমার ছেলে দুটিকে যেন গাল দিয়ো না ভাই! তোমার পায়ে ধরতে এসেছি আমি।
জগন ও অনিরুদ্ধ কথা বলিতে বলিতে বাহিরে চলিয়া গেল। জগন বলিল চিকিৎসা এর তেমন কিছু নাই। তবে মাথাটা যাতে একটু ঠাণ্ডা থাকে, এমনি কিছু চলুক। আর তুই বরং একবার সাওগ্রামের শিবনাথতলাটাই না হয় ঘুরে আয়। শিবনাথতলার নামডাক তো খুব আছে।
শিবতলার ব্যাপারটা ভৌতিক ব্যাপার। কোন পুত্ৰহারা শোকার্ত মায়ের অবিরাম কান্নায় বিচলিত হইয়া নাকি তাহার মৃত পুত্রের প্রেতাত্মা নিত্য সন্ধ্যায় মায়ের কাছে আসিয়া থাকে। অন্ধকার ঘরের মধ্যে তাহার মা খাবার রাখিয়া দেয়, আসন পাতিয়া রাখে; প্রেতাত্মা আসিয়া সেই ঘরে বসিয়া মায়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলে। সেই অবসরে নানা স্থান হইতে লোকজন আসিয়া আপন আপন রোগ-দুঃখ অভাব-অভিযোগ প্রেতাত্মার কাছে নিবেদন করে; প্রেতাত্মা সেসবের প্রতিকারের উপায় করিয়া দেয়। কাহাকেও দেয় মাদুলি, কাহাকেও তাবিজ, কাহাকেও জড়ি, কাহাকেও বুটি, কাহাকেও আর কিছু।
