ফলে মাসখানেকের মধ্যে বন্ধ্যা মেয়েটির সবল পরিপুষ্ট দেহখানি হইয়া গেল দুর্বল এবং শীর্ণ। একটি দীর্ঘাঙ্গী মেয়ে সে; এই শীর্ণতায় এখন তাহাকে অধিকতর দীর্ঘাঙ্গী বলিয়া মনে হয়; দুর্বলতাও বড় বেশি চোখে পড়ে। চলিতে ফিরিতে দুর্বলতাবশত সে যখন কোনো কিছুকে আশ্রয় করিয়া দাঁড়াইয়া আত্মসংবরণ করে, তখন মনে হয় দীর্ঘাঙ্গী পদ্ম যেন থরথর করিয়া কাঁপিতেছে। সেই বলিষ্ঠ ক্ষিপ্রচারিণী পদ্মের প্রতি পদক্ষেপে এখন ক্লান্তি ফুটিয়া ওঠে, ধীরে মন্দগতিতে চলিতেও তাহার পা যেন টলে। কেবল তাহার চোখের দৃষ্টি হইয়া উঠিয়াছে অস্বাভাবিক প্রখর। দুর্বল পাণ্ডুর মুখের মধ্যে পদ্মের ডাগর চোখ দুইটা অনিরুদ্ধের শখের শাণিত বগি দাখানায় অ্যাঁকা পিতলের চোখ দুইটার মতই ঝকঝক করে। স্ত্রীর চোখের দিকে চাহিয়া অনিরুদ্ধ শিহরিয়া ওঠে।
অনটনের দুঃখের উপর এই দারুণ দুশ্চিন্তায় অনিরুদ্ধ বোধ করি পাগল হইয়া যাইবে। জগন ডাক্তারের পরামর্শে সেদিন সে কঙ্কণার হাসপাতালের ডাক্তারকে ডাকিয়া আনিল।
জগন বলিয়াছিল—মৃগী রোগ।
হাসপাতালের ডাক্তার বলিল-এ এক রকম মূৰ্ছা-রোগ। বন্ধ্যা মেয়েদেরইমানে যাদের ছেলেপুলে হয় না তাদেরই এ রোগ বেশি হয়। হিস্টিরিয়া।
পাড়া-পড়শীরা কিন্তু প্ৰায় সকলেই বলিল—দেবরোগ। কারণও খুঁজিয়া পাইতে দেরি হইল না। বাবা বুড়োশিব ভাঙাকালীকে উপেক্ষা করিয়া কেহ কোনোকালে পার পায় নাই! নবান্নের ভোগ দেবস্থলে আনিয়া সে বস্তু তুলিয়া লওয়ার অপরাধ তো সামান্য নয়! অনিরুদ্ধের পাপে তাহার স্ত্রীর এই রোগ হইয়াছে। কিন্তু অনিরুদ্ধ ও-কথা গ্ৰাহ্য করিল না। তাহার মত কাহারও। সহিত মেলে না। তাহার ধারণা, দুষ্ট লোকে তুক্ করিয়া এমন করিয়াছে। ডাইনী-ডাকিনী বিদ্যার অভাব দেশে এখনও হয় নাই। ছিরুর বন্ধু চন্দ গড়ী এ বিদ্যায় ওস্তাদ। সে বাণ। মারিয়া মানুষকে পাথরের মত পঙ্গু করিয়া দিতে পারে। পদ্মের একটা কথা যে তাহার মনে অহরহ জাগিতেছে!
প্রথম দিন পদ্মের মূৰ্ছা জগন ডাক্তার ভাঙাইয়া দেওয়ার পর সেই রাত্রের ভোরের দিকে সে ঘুমের ঘোরে একটা বিকট চিৎকার করিয়া আবার মূৰ্ছিত হইয়া পড়িয়াছিল। সেই নিশুতি রাত্রে অনিরুদ্ধ আর জগনকে ডাকিতে পারে নাই এবং সেই রাত্রে মূৰ্ছিতা পদ্মকে ফেলিয়া যাওয়ার উপায় তাহার ছিল না। বহু কষ্টে পদ্মের চেতনা সঞ্চার হইলে নিতান্ত অসহায়ের মত পদ্ম তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিয়াছিল—আমার বড় ভয় লাগছে গো!
–ভয়? ভয় কি? কিসের ভয়?
–আমি স্বপ্ন দেখলাম—
–কি? কি স্বপ্ন দেখলি? অমন করে পেঁচিয়ে উঠলি ক্যানে?
–স্বপ্ন দেখলাম—মস্ত বড় একটা কালো কেউটে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।
–সাপ?
–হ্যাঁ, সাপ! আর—
–আর?
–সাপটা ছেড়ে দিয়েছে ওই মুখপোড়া–
–কে? কোন্ মুখপোড়া?
–ওই শত্তুর–ছিরে মোড়ল। সাপ ছেড়ে দিয়ে আমাদের সদর দুয়োরের চালাতে দাঁড়িয়ে হাসছে।
পদ্ম আবার থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিয়া তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়াছিল।
কথাটা অনিরুদ্ধের মনে আছে। পদ্মের অসুখের কথা মনে হইলেই ওই কথাটাই তাহার মনে পড়িয়া যায়। ডাক্তারেরা যখন চিকিৎসা করিতেছিল, তখন মনে হইলেও কথাটাকে সে আমল দেয় নাই, কিন্তু দিন দিন ধারণাটা তাহার মনে বদ্ধমূল হইয়া উঠিতেছে। এখন সে রোজার কথা ভাবিতেছে, অথবা কোনো দেবস্থল বা ভূতস্থল।
তাঁহার এই ধারণার কথা কেহ জানে না, পদ্মকেও সে বলে নাই। বলিয়াছে—কেবল মিতা গিরিশ ছুতারকে। জংশনের দোকানে যখন দুজন যায়, তখন পথে অনেক সুখ-দুঃখের কথা হয়। দুজনে ভালমন্দ অনেক মন্ত্ৰণা করিয়া থাকে। সমস্ত গ্রামই প্রায় একদিকে, তাহাদিগকে জব্দ করিবার একটা সজ্ঞাবদ্ধ ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চলিতেছে। অনিরুদ্ধ ও গিরিশের সঙ্গে আর একজন। আছে, পাতু মুচি। ছিরু পালকে এখন শ্রীহরি ঘোষ নামে গ্রামের প্রধানরূপে খাড়া করিয়া গোমস্তা। দাশজী বসিয়া বসিয়া কল টিপিতেছে; গ্রামের দলের মধ্যে নাই কেবল দেবু পণ্ডিত, জগন ঘোষ এবং তারা নাপিত। দেবু নিরপেক্ষ, তাহার প্রীতি-স্নেহের উপর অনিরুদ্ধের অনেক ভরসা; কিন্তু এ সকল কথা লইয়া অহরহ তাহাকে বিরক্ত করিতেও অনিরুদ্ধের সংকোচ হয়। জগন ডাক্তা দিবারাত্র ছিকে গালাগালি করে, কিন্তু ওই পর্যন্ত তাহার কাছে তাহার অতিরিক্ত কিছু প্রত্যাশা করা ভুল। তারাচরণকে বিশ্বাস করা যায় না। তারাচরণ নাপিতের সঙ্গে গ্রামের লোকের হাঙ্গামাটা মিটিয়া গিয়াছে। গ্রামের লোকই মিটাইতে বাধ্য হইয়াছে, কারণ সামাজিক ক্রিয়াকলাপে নাপিতের প্রয়োজন বড় বেশি। জাতকৰ্ম হইতে শ্রাদ্ধ পর্যন্ত প্রত্যেকটি ক্রিয়াতেই নাপিতকে চাই। তারাচরণ এখন নগদ পয়সা লইয়াই কাজ করিতেছে, রেট অবশ্য বাজারের রেটের অর্ধেক দাড়ি-গোঁফ কামাইতে এক পয়সা, চুল কাটিতে দু পয়সা, চুলকাটা এবং কামানো একসঙ্গে তিন পয়সা।
অন্যদিকে সামাজিক ক্রিয়াকলাপে নাপিতের প্রাপ্যও কমিয়া গিয়াছে। নগদ বিদায় ছাড়া চাল, কাপড় ইত্যাদি যে-সব পাওনা নাপিতের ছিল, তাহার দাবি নাপিত পরিত্যাগ করিয়াছে। তারাচরণ নাপিত ঠিক কোনো পক্ষভুক্ত নয়, অনেকটা নিরপেক্ষ ব্যক্তি। অনিরুদ্ধ বা গিরিশ জিজ্ঞাসা করিলে চুপি চুপি সে গ্রামের লোকের অনেক পরামর্শের কথাই বলিয়া যায়। আবার অনিরুদ্ধ ও গিরিশের সংবাদ গ্রামের লোক জিজ্ঞাসা করিলে তা-ও হা-না করিয়া দুই-চারিটা বলে। তবে তারাচরণের আকর্ষণ অনিরুদ্ধ-গিরিশের দিকেই বেশি। পাতুর সহিত তাহার কোনো সম্বন্ধ নাই। ইহাদেরই সে দুই-চারিটি বেশি খবর দেয়, কিন্তু অযাচিতভাবে সকল খবর দিয়া যায় দেবুকে। দেবুকে সে ভালবাসে। আর কিছু কিছু খবর বলে জগন ডাক্তারকে। বাছিয়া বাছিয়া উত্তেজিত করিবার মত সংবাদ সে ডাক্তারকে বলে। ডাক্তার চিৎকার করিয়া গালিগালাজ দেয়; তারাচরণ তাহাতে খুশি হয়, দাঁত বাহির করিয়া হাসে। কৌশলী তারাচরণ কিন্তু কোনোদিন প্রকাশ্যে অনিরুদ্ধ-গিরিশের সঙ্গে হৃদ্যতা দেখায় না। কথাবার্তা যাহা কিছু হয় সেসব ওপারের জংশন শহরে বটতলায়। সেও আজকাল গিয়া ক্ষুর ভাঁড় লইয়া হাঁটের পাশেই একটা গাছতলায় বসিতে আরম্ভ করিয়াছে। শিবকালী, দেখুড়িয়া, কুসুমপুর, মহুগ্রাম, কঙ্কণা এই পাঁচখানা গ্রামে তাহার যজমান আছে, তাহার দুইখানার কাজ সে একেবারে ছাড়িয়া দিয়াছে। বাকি তিনখানার একখানি নিজের গ্রাম—অপর দুইখানি মহুগ্রাম ও কঙ্কণা। মহুগ্রামের ঠাকুরমশায় বলেন মহাগ্রাম। এই ঠাকুরমশায় শিবশেখর ন্যায়রত্ন জীবিত থাকিতে ও-গ্রামের কাজ ছাড়া অসম্ভব। ন্যায়রত্ন সাক্ষাৎ দেবতা। এই দুইখানা গ্রামে দুদিন বাদে সপ্তাহের পাঁচ দিন সে অনিরুদ্ধ-গিরিশের মত সকালে উঠিয়া জংশনে যায়। হাঁটতলায় অনিরুদ্ধের কামারশালার পাশেই বটগাছের ছায়ায় কয়েকখানা ইট পাতিয়া সে বসে। সেই তাহার হেয়ার কাটিং সেলুন। দস্তুরমত সেলুনের কল্পনাও তাহার আছে। অনিরুদ্ধের সঙ্গে কথাবার্তা হয় সেইখানে। কঙ্কণা তাহাকে বড় একটা যাইতে হয় না। বাবুরা সবাই ক্ষুর কিনিয়াছে। যাইতে হয় ক্রিয়াকর্মে, পূজা-পার্বণে। সেগুলা লাভের ব্যাপার।
