–কিসের বিপদ হে?
–কোটি কোটি কারা স্বর্গের দিকে চলে আসছে পিঁপড়ের সারির মত। বোধহয় দৈত্য-সৈন্য!
—দৈত্য-সৈন্য? বল কি?
সঙ্গে সঙ্গে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। এমন সময় এলেন দেবর্ষি নারদ। বললেন দৈত্য নয় দেবরাজ, মানুষ।
–মানুষ?
–হ্যাঁ, মানুষ। তোমাদের অস্ত্রে তাদের কিছুই হবে না; কারণ পাপ তো তাদের দেহে নাই, সুতরাং দেব-অস্ত্র অচল। দিব্যাস্ত্ৰ ফুলের মালা হয়ে যাবে তাদের গায়ে ঠেকে।
—তবে উপায়? এত মানুষ যদি সশরীরে এখানে আসে তবে ইন্দ্ৰ আর কথা বলতে পারলেন না। সবাই হয়ত দাবি করবে এই সিংহাসন!
শেষে বললেনচল নারায়ণের কাছে চল সব।
নারায়ণ শুনে হাসলেন। বললেন–আচ্ছা, চল দেখি। বলে প্রথমেই তিনি পাঠালেন মা। অন্নপূর্ণাকে।
অন্নপূর্ণা এসে পথে পুরী নির্মাণ করে ফেললেন—ভাণ্ডার পরিপূর্ণ করে রাখলেন এক-অন্ন। পঞ্চাশ ব্যঞ্জনে। তারপর মানুষের সেই দল সেখানে আসবামাত্র তাদের বললেন পথশ্রমে বড়ই ক্লান্ত তোমরা, আজকের মত তোমরা আমার আতিথ্য গ্রহণ কর।
মানুষেরা পরস্পরের মুখের দিকে চাইল, রান্নার সুগন্ধে সকলেই মোহিত হয়ে গেল। দলের কতক লোক কিন্তু মোহ কাটিয়ে বললে—স্বর্গের পথে বিশ্রাম করতে নাই! তারা চলে গেল। যারা থাকল তারা অন্ন-ব্যঞ্জন খেয়ে পেট ফুলিয়ে সেইখানেই শুয়ে পড়ল। বললেমা, আমরা এইখানেই যদি থাকি, রোজ এমনি খেতে দেবে তো?
মা বললেন-–নিশ্চয়।
থেকে গেল তারা সেইখানেই।
যারা থামে নি, তারা চলল এগিয়ে। নারায়ণ তখন পাঠিয়ে দিলেন লক্ষ্মীকে। লক্ষ্মীর পুরী সোনার পুরী! সোনার পথ, সোনার ঘাট; সোনার ধুলো পুরীতে। দেখে মানুষের চোখ বেঁধে গেল।
মা বললেন—এসব তোমাদের জন্যে বাবা। এস-এস; পুরীতে প্রবেশ কর।
একদল প্রবেশ করলে।
পথে আরও এক পুরী তখন নিৰ্মাণ হয়ে আছে। ফুলের বাগান চারিদিকে, কোকিল ডাকছে, ভুবন-ভুলানো গান শোনা যাচ্ছে—আর এক অপূর্ব সুগন্ধ ভেসে আসছে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। অপ্সরার দল, এক হাতে তাদের অপরূপ ফুলের মালা আর এক হাতে সোনার পানপাত্র। তারা ডাকছে—আসুন, বিশ্রাম করুন; আমরা আপনাদের দাসী, সেবা করবার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি। আপনারা তৃষ্ণার্ত এই পানীয় পান করুন।
সে পানীয় হচ্ছে স্বৰ্গীয় সুরা। দলে দলে লোকে সেখানে ঢুকে পড়ল।
নারায়ণ বললেন, দেখ তো ইন্দ্র, আর কেউ আসছে কি না?
ইন্দ্ৰ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন না।
–ভাল করে দেখ।
একটা কি নড়ছে, বোধহয় একজন মানুষ!
নারায়ণ বললেন—স্বৰ্গদ্বার খুলে রাখ, তুমি নিজে পারিজাতের মালা হাতে দাঁড়িয়ে থাক। আমার মত সম্মান করে স্বর্গে নিয়ে এস। ওর পায়ের ধুলোয় স্বৰ্গ পবিত্র হোক।
হাসিয়া চৌধুরী বলিল—জানেন পণ্ডিত, গল্পটি শেষ করে ঠাকুরমশায় বলেছিলেন চৌধুরী, এরপর কেউ গুরু হয়ে ভক্তের রসালো খাদ্যদ্রব্যে ভুলবে, কেউ মোহন্ত হয়ে সোনা-রুপোসম্পত্তি নিয়ে ভুলবে, কেউ সেবাদাসীর দল নিয়ে স্ত্রীলোকে আসক্ত হবে। স্বর্গে যাবে। কোটি কোটির মধ্যে একজন। দুঃখ করবেন না পণ্ডিত। মানুষের ভুল-ভ্রান্তি-মতিভ্ৰম পদে পদে। এরা মানুষ নয় বলে দুঃখ করছেন? মানুষ হওয়া কি সোজা কথা? আচ্ছা আমি উঠি তা হলে। ওই ডাক্তার আসছেন—উনি এসে পড়লে আবার খানিকক্ষণ দেরি হয়ে যাবে। আমি চলি।
বৃদ্ধ তাড়াতাড়ি নামিয়া পড়িল।
গল্পটি দেবুর বড় ভাল লাগিল। বিলুকে আজ গল্পটি বলিতে হইবে। আশ্চর্য বিলুর ক্ষমতা, একবার শুনিলেই সে গল্পটি শিখিয়া লয়।
ডাক্তার আসিয়া বিনা ভূমিকায় বলিল—শুনলাম সব।
দেবু হাসিল, বলিল—তুমি সকাল থেকে কোথায় ছিলে হে?
–অনিরুদ্ধের বাড়ি। কামার-বউয়ের আজ আবার ফিট হয়েছিল।
–আবার?
–হ্যাঁ। সে সাংঘাতিক ফিটু, ঘরে মেয়ে নাই, ছেলে নাই, সে এক বিপদ। তবু দুর্গা মুচিনী ছিল, তাই খানিক সাহায্য হল। বউটার বোধহয় মৃগীরোগে দাঁড়িয়ে গেল। অনিরুদ্ধ তো বলছে অন্য রকম। মানুষে নাকি তুক্ করেছে।
–মানুষে তুক্ করেছে?
–হ্যাঁ, ছিরে পালের নাম করছে। যাক গে! এ দিকের এ যা হয়েছে ভাল হয়েছে দেবু। পরে সব ঝুঁকি পড়ত তোমার আর আমার ঘাড়ে। জে.এল. ব্যানার্জীর অ্যারেস্টের খবর জান তো? হয়ত আমাদেরও অ্যারেস্ট করত। আর সব শালা সুড়সুড় করে ঘরে ঢুকত। আচ্ছা, আমি চলি। সকাল থেকে রোগী বসে আছে, ওষুধ দিতে হবে।
ডাক্তার ব্যস্ত হইয়াই চলিয়া গেল। দেবু একটু হাসিল। ডাক্তারের এই ব্যস্ততার অর্ধেকটা সত্য বাকিটা কৃত্রিম। রোগীদের জন্য জগনের দরদ অকৃত্রিম; চিকিৎসকের কর্তব্য সম্বন্ধে সে সত্যই সজাগ। শত্রু হোক মিত্র হোক-সময় অসময় যখনই হোক ডাকিলে সে বাহির হইয়া আসিবে, যত্ন করিয়া নিজে ঔষধ তৈয়ারি করিয়া দিবে। কিন্তু আজিকার ব্যস্ততাটা কিছু বেশি, একটু অস্বাভাবিক। জে.এল. ব্যানার্জীর গ্রেপ্তারের সংবাদে ডাক্তার বেশ একটু ভয় পাইয়া গিয়াছে, আসলে সে আলোচনাটা এড়াইতে চাহিল।
–পণ্ডিতমশাই গো! বাড়ির ভিতর থেকে কে ডাকিল।
–পণ্ডিত পিছন ফিরিয়া দেখিল—বিলু দাঁড়াইয়া হাসিতেছে; সে-ই ডাকিয়াছে।
রাগের ভান করিয়া দেবু বলিল-দুষ্ট বালিকে, হাসিছে কেন? পড়া করিয়াছ?
বিলু খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল; দেবু উঠিয়া আসিয়া বলিল-আজ ভারি সুন্দর একটা গল্প শুনেছি, তোমাকে বলব, একবার শুনেই শিখতে হবে।
বিলু বলিলখোকার কাছে একবার বস তুমি। কামার-বউকে একবার আমি দেখে আসি।
১৫. পদ্মের মূৰ্ছা
পদ্মের মূৰ্ছা রীতিমত মূৰ্ছা-রোগে দাঁড়াইয়া গেল। এবং মাসখানেক ধরিয়া নিত্যই সে মূৰ্ছিত হইয়া পড়িতে লাগিল।
