ওদিকে মজলিসে আবার পরামর্শের গুঞ্জনধ্বনি উঠিল। হরেন ঘোষালেরই চাপাগলা বেশ স্পষ্ট শোনা যাইতেছিলভেরি নাইস হবে! ভেরি গুড পরামর্শ!
দাশজী এবার খোকন মিস্ত্রিকে বলিল—ধ দড়ি ধ। ভূপাল তুই ধর একদিকে।
খোকন বৈরাগী খানিকটা বাবুই ঘাসের দড়ি হাতে অগ্রসর হইয়া আসিল, সর্বাগ্রে ভূমিষ্ঠ হইয়া দেবদেবীকে প্রণাম করিল—তারপর জোড়হাতে বলিল—আরম্ভ করি তা হলে?
দাশজী বলিল-দুগ্গা বলে, তার আর কথা কি? শুনছেন গোহরিশ মণ্ডল মশায়, ভবেশ পাল! চণ্ডীমণ্ডপ পাকা করে বাঁধানো হচ্ছে। আপনারাও একটা অনুমতি দেন।
–বাঁধানো হচ্ছে? পাকা করে? সমস্ত মজলিসসুদ্ধ লোক অবাক হইয়া গেল।
–হ্যাঁ। একটা কুয়োও হচ্ছে—ওই ষষ্ঠীতলায়। ঘোষমশায়, মানে, আমাদের শ্ৰীহরি ঘোষ গ্রামের উপকারের জন্য এইসব করে দিচ্ছেন।
শ্ৰীহরি নিজে হাত জোড় করিয়া সবিনয়ে বলিল—অনুমতি দেন আপনারা সবাই।
হরিশ বলিল-দীর্ঘজীবী হও বাবা। এই তো চাই। তা মা-ষষ্ঠীকে আর ধুলোয় মাটিতে রাখছ ক্যানে? ষষ্ঠীতলাটিও বাধিয়ে দাও।
শ্ৰীহরি বলিল—বেশ তো, তাও হোক। ষষ্ঠীতলা বলে খেয়ালই হয় নাই আমার।
হরিশ মজলিসের দিকে চাহিয়া বলিলতা হলে সেটেলমেন্টারের সম্বন্ধে দাশজী যা বলেছেন তাই ঠিক হল; বুঝলেন গো সব? দরখাস্ত-টরখাস্ত লয়।
শ্ৰীহরির খুড়া ভবেশ অকস্মাৎ ভ্রাতুষ্পত্রের গৌরবে ভাবাবেগে প্রায় কাঁদিয়া ফেলিল, উঠিয়া আসিয়া শ্ৰীহরির মাথায় হাত দিয়া আশীৰ্বাদ করিয়া বলিল মঙ্গল হবে, তোমার মঙ্গল হবে বাবা।
শ্ৰীহরি খুড়াকে প্রণাম করিল।
ঘোষাল চুপি চুপি বলিল, যি উইল ডাইছি এইবার নিশ্চয় মরবে। হঠাৎ এত বড় সাধু? এ তো ভাল লক্ষণ নয়! মতিভ্ৰম—দিস ইজ মতিভ্ৰম!
মজলিস ভাঙিয়া গিয়াছে। সকলে বাড়ি চলিয়া গিয়াছে। ওদিকে জলখাবারের বেলা হইয়াছে। রোদ মন্দিরের চূড়া হইতে গা বাহিয়া আটচালার ফাঁকে ফাঁকে ঢুকিয়াছে। দেবু ছেলেদের ছুটি দিয়া বলিল কাল থেকে আমার বাড়িতে পাঠশালা বসবে, বুঝেছ? সেইখানে যাবে সবাই।
–বাঁধানো হয়ে গেলে আবার এইখানেই বসবে তো পণ্ডিতমশায়?
–পাকা হলে বসবে বৈকি। যাও আজ ছুটি।
সে উঠিল, উঠিতে গিয়া তাহার নজরে পড়িল বৃদ্ধ দ্বারকা চৌধুরী এতক্ষণে টুকটুক করিয়া চণ্ডীমণ্ডপের উপরে উঠিতেছে। দেবু সম্ভাষণ করিয়া বলিল–চৌধুরীমশায় এত বেলায়?
–হ্যাঁ একটু বেলা হয়ে গেল। সকালে আসতে পারলাম না। দরখাস্তে সই করবার ডাক ছিল।
দেবু হাসিয়া বলিল–কষ্টই সার হল আপনার, দরখাস্ত করা হল না।
চৌধুরী হাসিয়া বলিলপথে আসতে তা সব শুনলাম। সদরে যাবার পরামর্শ হয়েছিল তা-ও শুনলাম। আবার নতুন হুকুম শুনলাম, বিকেলে আসতে হবে। তাই চলুন, বিকেলে দেখা যাক কি হয়।
–আমি যাব না চৌধুরীমশাই।
বৃদ্ধ দেবুর মুখের দিকে চাহিয়া বলিল যা–পাঁচজনে ভাল বোঝে করুক, পণ্ডিত, আপনি মন খারাপ করবেন না।
দেবু জোর করিয়া একটু হাসিল।
–চলুন পণ্ডিত, আপনার ওখানে একটু জল খাব।
–আসুন, আসুন। দেবু ব্যস্ত হইয়া অগ্রসর হইল।
চলিতে চলিতে বৃদ্ধ বলিল–ও কিছু হবে না, পণ্ডিত! একদিন আমারও ভাল দিন ছিল–আর তখন ডালি দেওয়া তো হরির লুটের শামিল ছিল গো। আজকাল বরং একটু কম হয়েছে। তা দেখেছি বিশেষ কিছু হয় না। তার চেয়ে বরং সবাই মিলে গিয়ে পড়লে। কিছু হইত এ কথাও ভরসা করিয়া বলিতে পারি না।
দেবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল—এতটুকু সাহস নাই, মতিস্থির নাই; এরা মানুষ নয়, চৌধুরীমশায়! সে আর আত্মসংবরণ করিতে পারি না, চোখ ফাটিয়া জল আসিল। চোখ মুছিয়া হাসিয়া সে আবার বলিল—জানেন, পাঁচখানা গায়ের লোক যদি সদরে যেত, আমি বলতে পারি চৌধুরীমশায়, কাজ নিশ্চয় হত। সায়েব নিশ্চয় কথা শুনত। প্ৰজার দুঃখ শুনবে না কেন? হাজরা সাহেব ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে সেবার বলেছিলেন। আমার মনে আছে।
বৃদ্ধ হাসিল—আপনি মিছে দুঃখু করছেন পণ্ডিত।
–দুঃখ একটু হয় বৈকি।
–একটা গল্প বলব চলুন।
জল খাইয়া কলার পেটোয় তামাক খাইতে খাইতে চৌধুরী বলিল—অনেক দিন আগে মহাগ্রামের ঠাকুরমশায়ের সঙ্গে গিয়েছিলাম প্রয়াগে কুম্ভস্নান করতে। হরেক রকমের সন্ন্যাসী দেখে অবাক হয়ে গেলাম। নাগা সন্ন্যাসী দেখলাম-উলঙ্গ বসে রয়েছে সব। কেউ বুক পর্যন্ত বালিতে পুঁতে রয়েছে, কেউ ঊর্ধ্ববাহু, কেউ বসে আছে লোহার কাঁটার আসনে, কেউ চারিদিকে অগ্নিকুণ্ড জেলে বসে রয়েছে। দেখে অবাক হয়ে গেলাম। বললাম-স্বর্গ এদের হাতের মুঠোয়। আঃ! শুনে ঠাকুরমশায় বললেন চৌধুরী, একটা গল্প বলি শোন।
তখন সত্যযুগের আরম্ভ। সবে মানুষের সৃষ্টি হয়েছে। সবাই তখন সাধু; সত্যযুগ তো! বনে কুটির বেঁধে সব থাকেন ফলমূলে জীবন ধারণ চলে, ভগবানের নাম করেন, আর পরমানন্দে দিন বাটে। মা-লক্ষ্মী তখন বৈকুণ্ঠে, অন্নপূর্ণা কৈলাসে, মানে সোনা-রুপো, এমনকি অন্নেরও পর্যন্ত প্রচলন হয় নাই সংসারে। যাক্, এইভাবে এক পুরুষ কেটে গেল। তখন অকালমৃত্যু ছিল না, কাজেই হাজার বছর পরে একসঙ্গে একপুরুষের মৃত্যুর সময় হয়ে এল। মানুষেরা ঠিক করলেন—চল, আমরা সশরীরে স্বর্গে যাব। যেমন সঙ্কল্প তেমনি কাজ। বেরিয়ে পড়ল সব।
বদরিকাশ্ৰম পার হয়ে হিমালয়ের পথে পিঁপড়ের সারির মত মানুষ চলতে লাগল। ওদিকে স্বৰ্গদ্বারে দ্বারী ছিল, সে দেখতে পেলে, কোটি কোটি মানুষ কলরব করতে করতে সেই দিকেই চলে আসছে। সে ভয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে—দেবরাজ, মহা বিপদ উপস্থিত!
