দেবু উত্তর দিল—না হরিশ-কাকা, লেখা হয় নাই।
লেখা হয় নাই শুনিয়া হরিশ, ভবেশ প্রভৃতি প্রবীণগণ সকলেই অসন্তুষ্ট হইল। হরিশ। বলিল—তুমি বললে লিখে রাখবে, ভার নিলে! জল খাওয়ার পর গায়ের লোক সব আসবে, দস্তখত করবে। এখন বলছ হয় নাই! এ কি রকম কথা হে? পারবে না বললে ডাক্তারই লিখে রাখত।
ভবেশ বলিল—এাই কথা। স্পষ্ট কথার কষ্ট নাই। বললেই তো অন্য ব্যবস্থা হত।
দেবু হাসিল, বলিল-দরখাস্ত না হয় আমি এখনই লিখে দিচ্ছি ভবেশদাদা, কিন্তু দরখাস্ত। করে হবে কি বলতে পার?
সকলেই চুপ করিয়া রহিল। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া হরিশ বলিল—তা হলে কি করব বল? কিছু করতে তো হবে, এমন করে-ধর–আপনাকেই বা পেবোধ দিই কি বলে?
—এক কাজ করবেন?
–কি, বল?
–পাঁচখানা গায়ের লোক ডাকুন, তারপর চলুন সকলে মিলে সদরে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে।
–তাতে ফল হবে বলছ?
–দরখাস্তের চেয়ে বেশি হবে নিশ্চয়।
সকলে আপনাদের মধ্যেই আবার গুঞ্জন শুরু করিল।
পাঠশালার ছেলেরা ইতিমধ্যে চণ্ডীমণ্ডপেই আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল; দেবু তাহাদের বলিল—এইখানেই এসেছ সব? আচ্ছা আজ এইখানেই ওই পাশে বসে সব পড়তে আরম্ভ কর। কালকে যে পদ্যের মানে লিখতে দিয়েছিলাম সবাই লিখেছ তো? খাতা আন সব রাখ এইখানে।
হরিশ ডাকিল–দেবু!
–বলুন!
—তবে না হয় তাই চল। না কি গো? তোমাদের মত কি? হরিশ জিজ্ঞাসু নেত্রে সকলের দিকে চাহিল।
ভবেশ উৎসাহিত হইয়া উঠিয়া বলিল হরির নাম নিয়ে তাই চল সব। ধরে তো আর খেয়ে ফেলবে না সায়েব! আমি রাজি। বল হে সব বল, আপন আপন কথা বল সব!
মনে মনে সকলেই একটা উত্তেজনার উচ্ছ্বাস অনুভব করিল। হরেন ঘোষাল সর্বাপেক্ষা বেশি উত্তেজিত হইয়াছিল, সে সঙ্গে সঙ্গে উঠিয়া দাঁড়াইয়া বুকে হাত রাখিয়া বলিল-আই হ্যাম রেডি! এস্পার কি ওভার, যা হয় হয়ে যাক।
–ব্যস, তাই চল, কাল সক্কালেই!
–হ্যাঁ! হ্যাঁ! হ্যাঁ!
এবার একটা সমবেত সম্মতি প্রায় ঐকতানের মত ধ্বনিত হইল।
–কিন্তু!–ভবেশের একটা কথা মনে পড়িয়া গেল।
–কিন্তু কি? হরিশ বলিল—আবার কিন্তু করছ কেনে?
–পাঁজিটা একবার দেখবে না? দিন-খ্যান কেমন–?
–তা বটে। ঠিক কথা।
সকলে মুহূর্তে সায় দিয়া উঠিল।
দেবু তিক্ত স্বরে বলিল—আপনারা মানেন কিন্তু রাজার কাজে তো পাজি মানে না। দশ দিন যদি ভাল দিন-ক্ষণ না থাকে?
ঘোষাল উত্তেজিত স্বরে বলিলড্যাম ইওর পাজি! বোগাস্ ওসব।
দেবু বলিল-মামলার দিন থাকলে যে মঘাতেও যেতে হয়।
হরিশ একটু ভাবিয়া বলিলতা ঠিক। রাজদ্বারে পাঁজি-পুঁথি নাই।
দেবু বলিলভোর ভোর বেরিয়ে পড়লে দশটা নাগাদ ঠিক কোর্টের সময়েই গিয়ে পৌঁছানো যাবে। আপন আপন খাবার সকলে সঙ্গে নেবেন; চিড়ে গুড় যে যা পারেন। একটা দিন বৈ তো নয়।
ঠিক এই সময় চণ্ডীমণ্ডপে আসিয়া উপস্থিত হইলগোমস্তা দাশজী, শ্ৰীহরি ঘোষ, ভূপাল নন্দী এবং আরও কয়েকজন; তাহার মধ্যে একজন খোকন বৈরাগীলোকটি এ অঞ্চলে রাজমিস্ত্রির কাজ করিয়া থাকে।
দাশজী হাসিয়া বলিল—কি গো, দেবু মাস্টারের পাঠশালায় সব আবার নূতন করে নাম লেখালেন নাকি? ব্যাপার কি সব?
কে কি উত্তর দিত কে জানে, কিন্তু সে দায় হইতে সকলকে নিষ্কৃতি দিয়া হরেন ঘোষাল সঙ্গে সঙ্গে বলিয়া উঠিল—উই আর গোয়িং টু দি ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট-কাল ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কাছে যাচ্ছি সব ধান কটা না হওয়া পর্যন্ত খানাপুরী স্টড বন্ধ রাখতে হবে।
ভ্রূ নাচাইয়া দাশজী প্ৰশ্ন করিল, ঘোষাল মহাশয়ের হাত কটা? দুটো না চারটে?
এমন ভঙ্গিতে সে কথাগুলি বলিল যে, ঘোষাল কিছুক্ষণের জন্য হতভম্ব হইয়া চুপ করিয়া গেল। তারপর সে-ই চিৎকার করিয়া উঠিল—ব্রাহ্মণকে তুমি এত বড় কথা বল?
দাশজী সে কথার উত্তর দিল না, শ্ৰীহরির হাতে একখানা কাগজ ছিল, সেখানা টানিয়া লইয়া বলিল এই দেখ। বেশি লাফিয়ো না। জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রেপ্তার। সেটেলমেন্টের কার্যে বাধা দেওয়ার অপরাধে জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রেপ্তার হইয়াছেন। এই নাও, পড়ে দেখ। সে কাগজখানা মজলিসের মধ্যে ছড়িয়া ফেলিয়া দিল।
ঘোষালই কাগজখানা কুড়াইয়া লইয়া হেড লাইনে চোখ বুলাইয়া বলিয়া উঠিল—মাই গড়! পাংশু বিবৰ্ণ মুখে কাগজখানা দেবুর দিকে বাড়াইয়া দিল। দেবু কাগজখানা পড়িতে আরম্ভ করিল।
শ্ৰীহরি বলিল-আমাকে তো আপনারা বাদ দিয়েই সব করছেন, তা করুন। আমি কিন্তু আপনাদের কথা না ভেবে পারি না। ওসব করতে যাবেন না। পাথরের চেয়ে মাথা শক্ত নয়। তার চেয়ে চলুন বিকালবেলা সেটেলমেন্ট হাকিমের সঙ্গে দেখা করে আসি। দাশজী যাবেন, আমি যাব, মাতব্বর জনকয়েক আপনারাও চলুন। ভাল রকমের ডালিও একটা নিয়ে যাই। মাছ একটা ভালই পড়েছে, বুঝলেন হরিশখুড়ো, পাকি বার সের।
বলিতে বলিতেই বোধ করি তাহার একটা কথা মনে পড়িয়া গেল। দাশজীকে বলিলা গো, সেই ইয়ে, মানে মুরগির জন্য লোক পাঠানো হয়েছে তো? সবাই মিলে ধরে পেড়ে যা হোক একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। আর, ওই না-রাজি দরখাস্ত করা, কি একেবারে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কাছে দরবার করতে যাওয়াও একরকম সরকারের হুকুমের বিরোধিতা করা। তাত আমাদের বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না। নাকি গো? শ্ৰীহরি জিজ্ঞাসা করিল গোমস্তা দাশজীকে।
দেবু কাগজখানা দাশজীর হাতেই ফেরত দিল, তারপর মজলিসের দিকে পিছন ফিরিয়া অখণ্ড মনোযোগের সহিত সে ছেলেদের পড়াইতে আরম্ভ করিল। সে ইহাদের জানে। ইহারই মধ্যে সব সঙ্কল্প তাসের ঘরের মত ভাঙিয়া পড়িয়াছে। সে উঠিয়া গিয়া। ব্ল্যাকবোর্ডের উপর খড়ি দিয়া লিখিল, মুখে বলিতে লাগিল, এক মণ দুধের দাম যদি পাঁচ টাকা দশ আনা হয়।
