আরও আছে, জরিপের পর প্রজাদের জরিপের খরচের অংশ দিতে হইবে। না দিলে অস্থাবর ক্রোক হইবে, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হইবে।
তাহার পর জমিদার দাবি করিবে খাজনা-বৃদ্ধি; প্রতি টাকায় চার আনা, আট আনা, এমনকি টাকায় টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধিও হইতে পারে, হাইকোর্টের নাকি নজির আছে। নাখরাজ বাজেয়াপ্ত হইয়া যাইবে। বজায় থাকিলে সেস লাগিবে, সে সেসের পরিমাণ নাকি খাজনারই সমান—কম নয়; এমনি আরও অনেক কিছু হইবে।
ফিরিবার পথে দেবু দেখিল—জনকয়েক মাতব্বর ইতিমধ্যেই চণ্ডীমণ্ডপে সমবেত হইয়াছে; সকলে তাহারই প্রতীক্ষা করিতেছিল। দেবু চণ্ডীমণ্ডপেই উঠিয়া আসিল। হরিশ প্রশ্ন করিলহয়েছে?
রাত্রে তাহার একখানা দরখাস্ত লিখিয়া রাখিবার কথা ছিল। কিন্তু দেবুর দরখাস্ত লেখা হইয়া ওঠে নাই। দরখাস্তে তাহার আস্থা নাই। দরখাস্তের প্রসঙ্গে মনে পড়িয়া গিয়াছিল কয়েকটি তিক্ত ঘটনার স্মৃতি। নিজে সে এককালে কয়েকবার দরখাস্ত করিয়াছিল, সেই দরখাস্তের ফলের কথা মনে পড়িয়া গিয়াছিল।
তখন বাপের মৃত্যুর পর সদ্য সে স্কুল ছাড়িয়া নিজের হাতেই চাষ করিত। সেদিন মাঠে সে হাল চালাইতেছিল। খাকি পোশাক-পরা টুপি মাথায় পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর মাঠের পথে যাইতে যাইতে তাহাকে ডাকিয়া বলিয়াছিল—এই শোন্।
দেবু এই অভদ্রজনোচিত সম্ভাষণে অসন্তুষ্ট হইয়াই উত্তর দেয় নাই।
—এই উল্লুক!
দেবু এবারও উত্তর দেয় নাই। দেবুর সেই প্রথম দরখাস্ত। দরখাস্ত করিয়াছিল পুলিশ সাহেবের কাছে। তদন্ত হইল মাস কয়েক পর। তদন্তে আসিলেন ইন্সপেক্টর।
দেবুর অভিযোগ শুনিয়া তিনি মিষ্ট কথায় ব্যাপারটা মিটাইয়া দিলেন, বলিলেনদেখ বাপু, জমাদার বাবু তোমার বাপের বয়সী। তুই বললেও তোমার রাগ করা উচিত নয়। উল্লুক বলাটা অন্যায় হয়েছে, যদি উনি বলে থাকেন।
দেবু বলিল—উনি বলেছেন।
—বুঝলাম, কিন্তু সাক্ষী কে বল?
সাক্ষী ছিল না। ইন্সপেক্টর বলিলেন—যাক, তুমি বাড়ি যাও। কিছু মনে কোরো না।
দেবুর ক্ষোভ কিন্তু মেটে না।
দ্বিতীয় দরখাস্তের অভিজ্ঞতা বিচিত্র। জমিদার বৈশাখ মাসে খাসপুকুর হইতে মাছ ধরিবার ব্যবস্থা করিয়াছিল। সেইটিই একমাত্র পানীয় জলের পুকুর। জল অল্পই ছিল, সেই জল আরও খানিকটা বাহির করিয়া দিয়া মাছ ধরিবার কথা হইল। গ্রামের লোকে শিহরিয়া উঠিল। বলিল–ওটুকু জল, কেটে বের করে দিলে থাকবে কতটুকু? তার উপর মাছ ধরলে যে কাদা ছাড়া কিছু থাকবে না। আমরা খাব কি?
গোমস্তা বলিল—জমিদারের বাড়িতে কাজ, তিনিই বা মাছ কোথায় পাবেন বল?
প্রজারা খোদ জমিদারের কাছে গেল; জমিদার বলিলেনতোমরা মাছ দাও, নয় মাছের দাম দাও।
তরুণ দেবু এক দরখাস্ত করিল ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কাছে। কিন্তু কিছুই হইল না। জমিদারের চাপরাসীরা শোভাযাত্ৰা করিয়া আসিয়া মাছ ধরাইয়া পুকুরটাকে পঙ্ক-পৰ্ব্বলে পরিণত করিয়া দিয়া গেল। দেবুর ক্ষোভের আর সীমা রহিল না। হঠাৎ সাত দিন পর, অকস্মাৎ দারোগাকনস্টেবল-চৌকিদারের আগমনে গ্রামখানা ক্ৰস্ত হইয়া উঠিল। তাহাদের সঙ্গে একজন সাহেবি পোশাক-পরা অল্পবয়সী ভদ্রলোক। দারোগা আসিয়া দেবুকে ডাকিল। বলিল ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বাহাদুর ডাকছেন তোমাকে।
দেবু অবাক হইয়া গেল। সাহেব নিজে আসিয়াছেন। কিন্তু এখন আসিয়া ফল কি? সাহেবকে সে নমস্কার করিয়া দাঁড়াইল। সাহেব প্রতিনমস্কার করিলেন। সে আরও আশ্চর্য হইয়া গেল সাহেবের কথায়।
—আপনি দেবনাথ ঘোষ?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
দারোগা বলিল—আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর বলতে হয়।
সাহেব বলিলেন—থাক। তারপর সমস্ত শুনিলেন-পুকুর নিজে দেখিলেন। পুকুরের পাড়ে দাঁড়াইয়া জলের অবস্থা দেখিয়া তিনি স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। দেবুর আজও মনে আছে ভদ্রলোকের চোখ হইতে ফোঁটাকয়েক জল ঝরিয়া পড়িয়ছিল। রুমালে চোখ মুছিয়া সাহেব বলিলেন—তাই তো দেবুবাবু, এসে তো কিছু করতে পারলাম না আমি।
দেবু বলিল-আমি দরখাস্ত করেছিলাম পাঁচ দিন আগে হুজুর!
—ডাকে যেতে এক দিন লেগেছে। দরখাস্ত যথানিয়মে পেশ হতেও কোনো কারণে দেরি হয়েছে। সে কারণ আমি একোয়ারি করব। তারপর সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেনদেবনাথবাবু, এসব ক্ষেত্রে দরখাস্ত করবেন না। নিজে যাবেন, একেবারে আমাদের কাছে গিয়ে সরাসরি জানাবেন। দরখাস্ত?—শব্দটা উচ্চারণ করিতে করিতে তিনি হাসিয়াছিলেন।
সাহেব গ্রামের জন্য একটা ইদারা মঞ্জুর করিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু তাহাও শেষ পর্যন্ত হয় নাই। কারণ, সাহেব এ জেলা হইতে চলিয়া যাওয়ার সুযোগে ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট কঙ্কণার বাবু সেটা অন্য গ্রামে মঞ্জুর করিয়া দিয়াছে। এ গ্রামের মেম্বার হিসাবে শ্রীহরিও তাহাতে সম্মতি ভোট দিয়াছে। দেবনাথ জমিদারের মাছ ধরার জন্য দরখাস্ত করিয়াছিল। সাজাটা তাহারই জন্য গোটা গ্রামের লোক ভোগ করিল।
দরখাস্ত! একটা গল্প তাহার মনে পড়ে। কোনো রাজার বাড়িতে আগুন লাগিয়াছিল; রাজা ছিলেন দার্জিলিঙে। আগুন নিভাইবার হাঁড়ি বালতি কিনিবার জন্য বরাদ্দ না থাকায় রাজার নিকট টেলিগ্রাম করা হইল। হুকুম টেলিগ্রামে আসিলেও চব্বিশ ঘণ্টার পর। ততক্ষণে সবকিছুকে ভস্মসাৎ করিয়া আগুন আপনা-আপনি নিভিয়া গিয়াছে। দরখাস্তের কথায় ওই গল্প তাহার মনে পড়ে, মুখে তিক্ত হাসি ফুটিয়া ওঠে, সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে সেই সাহেবকে। মিঃ এস. কে. হাজরা, আই—সি—এস। দেবু তাহাকে শ্রদ্ধা করে।
