জগন ডাক্তার বলে আরও কর্কশ কঠোর কথা, বলে—কেউ চোর, কেউ উঁচড়া, কেউ ছেনাল; হিংসুটে-বদমাশ-কুঁদুলি তো সবাই; সকালে আসেন সব পুণ্যি করতে! নিয়ম করে দাও, দেবতার দোরে জল দিতে হলে সবাইকে রোজ একটি করে পয়সা দিতে হবে; দেখবে একজনাও আর আসবে না। দেখ না পুকুরের জল সব ঘড়া ঘড়া আনছে আর ঢালছে।
দেবু কোনো কথাই বলে না। জগনের কথা অবশ্য মিথ্যা নয়; যে অপবাদ সে দেয়, তাহা। অনেকাংশেই সত্য। কিন্তু নিত্য-নিয়মিত প্রথম প্রভাতে দেবু যখন ইহাদের দেখে, তখন ওই পরিচয়গুলির কোনো চিহ্নই তাহাদের চোখেমুখে ভাবে ভঙ্গিতে সে দেখিতে পায় না। সম্পূৰ্ণ স্বতন্ত্র একদল মানুষকে সে দেখে। তখন ইহারা প্রত্যেকেই যেন এক এক কল্পলোকের যাত্ৰী! ইহারা যদি সদাসর্বদা এমনই মানুষ থাকিত। কিন্তু এই চণ্ডীমণ্ডপ হইতে বাহির হইয়া বাড়িতে পা দিতে না দিতেই প্রতিটি জনই আবার নিজমূর্তি ধারণ করে। কেহ আপনার দুঃখ-কষ্টের জন্য ভগবানকে শতমুখে গালি পাড়ে; কেহ হয়ত ঘাট হইতে অন্যের বাসন তুলিয়া লয়, কেহ হয়ত রাস্তায় প্রতীক্ষা করে পাইকারের অর্থাৎ গরু-বাছুরের দালালের, বুড়ো গাইটাকে বেচিয়া দিবে, দালালেরা বুড়ো গাই লইয়া কি করে সে সকলেই জানে। কিন্তু কয়েকটা টাকার লোভও সংবরণ করা তখন ইহাদের সাধ্যের অতীত। মানুষেরা আশ্চর্য, মানুষেরা বিচিত্ৰ—একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া দেবু চণ্ডীমণ্ডপ হইতে নামিয়া আসিল।
কৃষাণেরা মাঠে চলিয়াছে; বাউরি, ডোম, মুচি প্রভৃতি শ্ৰমিক চাষীর দল। পরনে খাটো কাপড়, মাথায় গামছাখানা পাগড়ি করিয়া বাধা। তাহার সঙ্গে একখানা পরনের কাপড়ই গায়ে র্যাপারের মত জড়াইয়া হুঁকো টানিতে টানিতে চলিয়াছে। অন্য হাতে কাস্তে। ধান কাটার পালা এখন। গ্রামের চাষী গৃহস্থেরাও অধিকাংশই নিজহাতে কৃষাণদের সঙ্গেই চাষ করে, তাহারাও কাস্তে হাতে চলিয়াছে। খাটে খাটায় দুনো পায় অর্থাৎ চাষে যাহারা নিজেরাও সঙ্গে খাঁটিয়া চাষী মজুরদের খাটায়, তাহাদের চাষে দ্বিগুণ ফসল উৎপন্ন হয়—এই প্রবাদবাক্যটা ইহারা আজও মানিয়া চলে। এ গ্রামে কেবল দুই-চারিজন নিজেরা চাষে খাটে না। হরেন্দ্র ঘোষাল ব্রাহ্মণ, জগন ঘোষ একে কায়স্থ তায় আবার ডাক্তার, দেবু ঘোষ পাঠশালার পণ্ডিত, শ্ৰীহরি সম্প্রতি কুলীন সদ্গোপ এবং বহু ধন-সম্পত্তির মালিক, এই কয়জনই চাষে খাটে না। সতীশ বাউরি তাহাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে মাতব্বর গোছের লোক। লোকটির নিজের হালগরু আছে। জমি অবশ্য তাহার নিজের নয়—পরের জমি ভাগে চাষ করে। বেশ বিজ্ঞধরনের কথা কয়। দেবুকে দেখিয়া হেঁট হইয়া সে প্রণাম করিল, বলিল—পেনাম হই পণ্ডিতমশায়!… সঙ্গে সঙ্গে দলের সকলেই প্রণাম করিল।
দেবু প্রতিনমস্কার করিয়া বলিল-মাঠে যাচ্ছ?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। সতীশ নিজের সঙ্গীদের বলিলপণ্ডিতমশায়ের মত মানুষটি আর দ্যাখলাম না। পেনাম করলে অনেক মণ্ডল মশাইরা তো রা পর্যন্ত কাড়ে না। পণ্ডিতমশায় কিন্তুক কপালে হাতটি ঠেকাবেই। কখনও তুইকারি শুনলাম না উহার মুখে।
দেবু কথা বলিল না, দ্রুতপদে আগাইয়া যাইবার চেষ্টা করি। কিন্তু সতীশ বলিলহ গো, পণ্ডিতমশায়—এ কি হবে বলেন দেখি?
–কিসের? কি হল তোদের?
–আজ্ঞে, একা আমাদের লয়, গোটা গায়ের নোকেরই বটে। এই সেটেলমেন্টোরের কথা বলছি। সাত দিন পরেই বলছে আরম্ভ হবে। দিনরাত হাজির থাকতে হবে, নোয়ার শেকল টেনে মাপ হবে; তা হলে ধান কাটাই বা কি করে হয় আর পাকা ধানের ওপর শেকল টানলে ধানই বা থাকে কি করে?
–গোমস্তা কি বললেন? পালই বা কি বলল?
–আজ্ঞে ঘোষমশাই বলুন।
–ঘোষ মশায়?
–আজ্ঞে, উনি এখন ছিহরি ঘোষ মশাই গো! ঘোষ বলতে হুকুম হয়েছে। জমিদারের কাগজ-পত্তরে, মায় আদালতে পর্যন্ত ঘোষ করে লিয়েছেন পাল কাটিয়ে।
—তাই নাকি? ওঁরা কি বললেন? কাল তো তোমরা গিয়েছিলেন সব!
আজ্ঞে ডাক হয়েছিল, গিয়েছিলাম। তা ওঁরা বললেন–দিনরাত খেটে ধান কেটে ফেল সব সাত দিনের মধ্যে। তাই কি হয় গো? আপনিই বলেন ক্যান পণ্ডিতমশায়?
দেবু চুপ করিয়া রহিল, কোনো উত্তর দিল না। কাল সমস্ত রাত্রি সে এই কথাটাই ভাবিয়াছে। কিন্তু কোনো উপায়ই স্থির করতে পারে নাই। সতীশ বলিল—হোথা থেকে এলাম তো দেখি, ডাক্তারবাবু পাড়ায় এসেছেন, বলছেন–টিপছাপ দিতে হবে, দরখাস্ত পাঠাবেন। তা হ্যাঁ মশায়, দরখাস্তে কি হবে গো? এই তো ঘরপোড়ার লেগে দরখাস্ত করলাম—কি হল? তা ছাড়া দরখাস্ত করলে সেটেলমেন্টোর হাকিম যদি রেগে যায়!
* * *
বাংলাদেশে ইংরাজি ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় কোনো জরিপবন্দি হয় নাই। তখনকার দিনে সীমানা-সরহদ্দ লইয়া দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মামলা-মকদ্দমার আর অন্ত ছিল না। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে গভর্নমেন্ট হইতে পঁয়ত্রিশ বৎসর ধরিয়া জরিপ করিয়া মাত্র গ্রামগুলির সীমানা নির্ধারিত হইয়াছিল। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে জরিপ আইন পাস হইবার পর বাংলাদেশে নূতন জরিপের এক পরিকল্পনা হয়। প্রতিটি টুকরা জমি, তাহার বিবরণ এবং তাহার স্বত্ব-স্বামিত্ব নির্ধারণ করিবার জন্যই এ জরিপের আয়োজন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে তাহার জের এই গ্রামাঞ্চলে আসিয়া পড়িয়াছে। গ্রাম্য লোকগুলি বিভীষিকায় একেবারে ক্ৰস্ত হইয়া উঠিয়াছে।
জরিপের সময়ে এতটুকু ক্রটিতে হাকিম নাকি বেত লাগায়, হাতকড়ি দিয়া জেলে পাঠাইয়া দেয়। এই ধরনের নানা গুজবে অঞ্চলটা উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছে।
