সর্বদেহ সঙ্কুচিত করিয়া পদ্ম বোধহয় অনিরুদ্ধের নিকট হইতে সরিয়া যাইতে চাহিল, কিন্তু পারিল নাপিতে কাঁপিতে সে দেওয়ালে ঠেস দিয়া ধীরে ধীরে বসিয়া পড়িয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িল।
***
অনিরুদ্ধ ছুটিয়া জগন ডাক্তারের কাছে চলিয়াছিল।
পথে চণ্ডীমণ্ডপের উপরে ডাক্তারের আস্ফালন শুনিয়া সে চণ্ডীমণ্ডপেই উঠিয়া আসিল। চণ্ডীমণ্ডপে তখন গ্রামের প্রায় সমস্ত লোকই আসিয়া সমবেত হইয়াছে। ডাক্তার কেবল আস্ফালন করিতেছে—দরখাস্ত করব। কমিশনারের কাছে টেলিগ্রাম করব।
উর্দি-পরা একজন সরকারি পিয়ন চণ্ডীমণ্ডপের দেওয়ালের গায়ে একটা নোটিশ লাইয়া দিতেছে-আগামী ৭ই পৌষ হইতে এই গ্রামে সার্ভে-সেটেলমেন্টের খানাপুরী আরম্ভ হইবেক। অতএব প্রত্যেক ব্যক্তিকে আপন আপন জমির নিকট উপস্থিত থাকিয়া সীমানা সরহ দেখাইয়া দিতে আদেশ দেওয়া যাইতেছে। অন্যথায় আইন অনুযায়ী কার্য করা যাইবেক।
গ্রামের লোকগুলি চিন্তিতমুখে গুঞ্জন করিতেছে।
শ্ৰীহরি ও গোমস্তা কথা বলিতেছে সেটেলমেন্ট হাকিমের পেশকারের সঙ্গে।–মাছ-একটা বড় মাছ।
দেবু নীরবে একপাশে দাঁড়াইয়া ছিল। অনিরুদ্ধ তাহারই কাছে ছুটিয়া গেল। জংশন হইতে ফিরিবার পথে দুর্গার বাড়িতে সে সকালবেলার কথা সব শুনিয়াছে। দেবুকে সে বরাবরই ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে; সেদিন সে তাহার উপর রাগ ঠিক করে নাই—অভিমানই করিয়াছিল। আজও দুর্গার কাছে সব শুনিয়া, দেবুর উপর তাহার অভিমান দূর হইয়া প্রগাঢ় অনুরাগে হৃদয় ভরিয়া উঠিয়াছে।
আবেগকম্পিত কণ্ঠে সে বলিল দেবু-ভাই!
–কি, অনি-ভাই, কি বল?
অনিরুদ্ধ কাঁদিয়া ফেলিল।
***
দেবুই জগন ডাক্তারকে ডাকিল—শিগগির চল, অনিরুদ্ধের স্ত্রীর মূৰ্ছা হয়েছে।
জগন ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে অনিরুদ্ধের দিকে একবার চাহিল, তারপর নিজেই অগ্রসর হইয়া ডাকিল—এস তা হলে।
সেটেলমেন্ট সংক্রান্ত বক্তৃতা আপাতত মুলতুবি থাকিল, চলিতে চলিতে সে আরম্ভ করিল গ্রাম্য লোকের অকৃতজ্ঞতার উপর এক বক্তৃতা—তবু আমার কর্তব্য করে যাব আমি। চিকিৎসক। যখন হয়েছি তখন ডাকবামাত্র যেতে হবে আমাকে, যাব আমি। তিন পুরুষ ধরে গায়ে ফি দেয় নি, আমিও নেব না ফি। ফি? ডাক্তার হাসিল-ওষুধের দামই কেউ দেয় না তো ফি!
দেবু পকেট হইতে বিড়ি বাহির করিয়া বলিলবিড়ি খাও ডাক্তার।
—দাও। বিড়িটা পাঁতে চাপিয়া ধরিয়া ডাক্তার বলিল তোমায় খাতা দেখাব পণ্ডিত—দশ হাজার টাকা! আমাদের দশ হাজার টাকা ড়ুবিয়ে দিলে লোকে, খাতিরের লোক হল মহাজন যারা সুদ নেয়; কঙ্কণার বাবুরা ছিরে পাল এরাই।
জগনের ডাক্তারখানার সম্মুখেই সকলে আসিয়া পড়িয়াছিল। ডাক্তারখানা হইতে একটা শিশি লইয়া ডাক্তার বলিল—চল! এক মিনিট—এক মিনিটেই চেতন হয়ে যাবে, ভয় নেই।
১৪. আকাশের ভোরের আলো
আকাশের ভোরের আলো ভাল করিয়া তখনও ফোটে নাই—দেবু বিছানা ছাড়িয়া ওঠে। শৈশব হইতেই তাঁহার এই অভ্যাস। একা দেবুর নয় পল্লীর অধিকাংশ লোকই, দিন শুরু হইবার পূর্ব। হইতেই দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আরম্ভ করে। মেয়েরা উঠিয়া দুয়ারে জল দেয়, ঘর-দুয়ার পরিষ্কার করে, নিকায়, পুরুষেরা গরু-বাছুরকে খাইতে দেয়। ইহা ছাড়াও যাহার বাড়িতে যখন ধানোনার কাজ থাকে, তখন তাহার বাড়িতে জীবনের সাড়া জাগিয়া ওঠে রাত্রির শেষ প্রহর হইতে। রাত্রির নিস্তব্ধ শেষ-প্রহরে পেঁকির শব্দ ওঠে দুম-দুম-দুম করিয়া একটি নির্দিষ্ট তালে; মৃদু কথাবার্তার সাড়া পাওয়া যায়, কেরোসিনের ডিবের আলোর আভাস জাগে। পল্লীর এই সময় ওই নূতন ধানের সময় অনেক বাড়ি হইতে চেঁকির সাড়া ওঠেই। আজ কোনো বাড়িতেই সাড়া। ওঠে নাই। ইতুলক্ষ্মীর পর্ব, শস্যের উপর ভেঁকির আঘাত দিতে নাই; আজ সঞ্চয়ের দিন।
বিলুকে দেবু বলিল—দেখ আজ বাইরের উঠানটাও নিকুতে হবে। গোমস্তা এসেছে—এখন কিছুদিন বাড়িতেই পাঠশালা বসবে।
গোমস্তা আসিয়াছে, চণ্ডীমণ্ডপে এখন গোমস্তার কাছারি বসিবে। গ্রাম্য দেবোত্তর সম্পত্তির সেবাইত হিসাবে চণ্ডীমণ্ডপের মালিক জমিদার; তবে সাধারণের ব্যবহার্য স্থানসাধারণের ব্যবহারের অধিকার আছে। সেই অধিকারেই গ্রামের লোক ব্যবহার করে সেই দায়িত্বে। চণ্ডীমণ্ডপটির রক্ষণাবেক্ষণও তাহারাই করে। চাঁদা করিয়া খড় তুলিয়া তাহারাই ছাওয়ায়, প্রয়োজন হইলে ভাঙা-ফুটো তাহারাই মেরামত করায়, এমনকি চণ্ডীমণ্ডপটি তাহারাই একদা নিজেরা চাঁদা তুলিয়া সৃষ্টি করিয়াছিল। সে অনেক পূর্বের কথা, তখনকার জমিদার মালিক হিসাবে তাহাতে সম্মতি দিয়াছিলেন মাত্র। তাহার অধিক দিয়াছিলেন গোটা দুই তাল গাছ চালকাঠের জন্য।
চণ্ডীমণ্ডপে প্রণাম করিয়া দেবু মাঠের দিকে বাহির হইয়া গেল; গ্রামের প্রবীণারা তখন বাবা-শিব ও মা-কালীর দুয়ারে জল ছিটাইয়া প্ৰণাম করিতেছে। জলে-জলে দেবতার ঘরের চৌকাঠের নিচের কাঠ একেবারে পচিয়া খসিয়া গিয়াছে, কপাটের নিচের খানিকটাও ক্ষয়িষ্ণু হইয়াছে। এবার মেরামত না করাইলে পূজার সময় ভোগের সামগ্রীর গন্ধে বিড়াল তো ঢুকিবেই—কুকুর প্রবেশ করিলেও আশ্চর্য হইবার কিছু থাকিবে না।
ঘোড়া পুরোহিত বলে—এত করে জল দিও না, মা-সকল, জল একটুকুন কম করেই দিও; তোমাদেরই পরনোকের পথে কাদা হবে, পেছল হবে-তাতেই বলছি। শেষে রথের চাকা গেড়ে গিয়ে আর উঠবে না।
মোড়লপিসি মূর্খের মত জবাব দেয়, বলে—রথের ঘোড়া তো আর তোমার ওই তেঠেঙে বেতো ঘোড়া নয়, ঠাকুর, তার লেগে আর তোমাকে ভাবতে হবে না। পুরোহিত হাসিয়া বলে—আমার ঘোড়া সেই রথের ঘোড়ারই বাচ্চা মোড়লপিসি। আমার ঘোড়ার তো তিনটে ঠ্যাঙ, ওর মা-বাবার মাত্তর দুটো, শোন নাই, ডান ঠ্যাঙটা লটর-পটর, বা ঠ্যাঙটা খোঁড়া, বাবা বদ্যিনাথের ঘোড়া।
