পদ্ম এবার অত্যন্ত অপ্রস্তুত হইয়া একটু হাসিল,ছিরু পালের ছেলে।
দুর্গা অবাক হইয়া গেল।
পদ্ম বলিল–গলির মুখে বউটি দাঁড়িয়ে কাঁদছিল, কোলে ছোটটা ঘ্যান্ঘ্যা করছে, পায়ের কাছে বড়টা কোলে চাপবার জন্যে মায়ের কাপড় ধরে টেনে ছিঁড়ে একাকার করছে আর চেঁচাচ্ছে; বাড়ির ভেতরে শাশুড়ি গাল পাড়ছে—বিয়েনখাগী, সব খেয়েছিস, আর ও দুটো ক্যানে? ও দুটোকেও খা, খেয়ে তুইও যা, আমি বাঁচি। তাই ছোটটাকে একবার নিলাম মা তখন বড়টাকে নিয়ে চুপ করাল। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া সে আবার বলিলপালের বউটি কিন্তুক বড় ভাল মেয়ে, বড় ভাল।
তাহার মনে পড়িয়া গেল সেই সেদিনের কথা।
শ্ৰীহরির স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্গার কোনো অভিযোগ নাই, বরং তাহার কাছে তাহার নিজেরই একটি গোপন অপরাধবোধ আছে। এ গ্রামের বধূদের সক লই তাহাকে অভিসম্পাত দেয়, কটু কথা বলে—সে-কথা সে জানে। কেবল দুটি বউয়ের বিরুদ্ধে সে এ অভিযোগ করিতে পারে। না; একজন বিলু দিদি পণ্ডিতের স্ত্রী, অপরজন শ্ৰীহরির স্ত্রী। পণ্ডিতের স্ত্রী না করিবারই কথা–পণ্ডিত সম্বন্ধে তো তাহার আশঙ্কার কিছু নাই, সে সাধু লোক; কিন্তু ছিরু র সহিত তার প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও শ্ৰীহরির স্ত্রী কোনোদিন তাহাকে কটু কথা বলে নাই—অভিসম্পাত দেয় নাই। পালের স্ত্রীর সঙ্গে চোখে চোখ রাখিতে তাহার সত্যই লজ্জা বোধ হয়।
কিছুক্ষণ নীরবে পথ চলিয়া, অকস্মাৎ বোধহয় শ্ৰীহরির স্ত্রীর প্রসঙ্গ হইতে নিষ্কৃতি পাইবার জন্যই সে প্রসঙ্গান্তরের অবতারণা করিল; বলিল—কে জানে ভাই, কচি-কাচা দেখলে আমার তো গা ঘিন-ঘিন করে! মা গো?
পদ্ম অত্যন্ত রূঢ়দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিল।
দুর্গা তাহা লক্ষ্যই করিল না, অবশ্য লক্ষ্য করিলেও সে গ্রাহ্য করিত না। তাচ্ছিল্যের একটা বাঁকা হাসির শাণিত ছুরিতে উহাকে টুকরা টুকরা করিয়া ধুলায় লুটাইয়া দিত। তেমনি উপেক্ষার ভঙ্গিতে সে বলিয়া গেল—আমাদের বউটার আবার এই বুড়ো বয়সে ছেলেপিলে হবে! আমি ভাই এখন থেকে ভাবছি–সেই ট্যা-টা করে কাদবে, পাখির বাচ্চার মত ক্ষণে ক্ষণে ক্যাথা কাপড় ময়লা করবে,মা গোঃ! মুহূর্তে পদ্মের বিচিত্র রূপান্তর হইয়া গেল। সে প্রশ্ন করিল—কোন্ দেবতার দোর ধরেছিল তোমাদের বউ?
—দেবতা? দেবতা তো অনেককেই দয়া করেছে। তারপর ফিক করিয়া হাসিয়া বলিল–শেষ ওই ঘোষালের–
—ঘোষালেরা কবচ দেয় নাকি?
—মরণ তোমার! ওই হরেন ঘোষালের সঙ্গে বউয়ের এতকালে আশনাই হয়েছে। বউ তো আর বাজা নয়, তাই সন্তান হবে।
পদ্ম স্থিরদৃষ্টিতে দুর্গার দিকে চাহিয়া রহিল।
দুর্গা বলিল—শুধু তো মেয়েই বাজা হয় না, পুরুষেরও দোষ থাকে। তা জান না বুঝি? সে দৃষ্টান্ত দিতে আরম্ভ করিল, আশপাশ গ্রামের বহু দৃষ্টান্তই সে জানে। এই জীবনের এই পথের পথিকদের প্রতিটি সংবাদ সে জানে, প্রতিটি জনকে চেনে। তাহারা হয়ত আড়াল দিয়া অন্ধকারে। আত্মগোপন করিয়া চলিতে চায়—কিন্তু সে যে অহরহ পথের উপর অনবগুণ্ঠিত মুখে অকুণ্ঠিত দৃষ্টিতে চাহিয়া বসিয়া আছে পথের যাযাবরীর মত; ওই পথেই যে সে বাসা বাঁধিয়াছে।
শীতের দিন-জলের হিম মানুষের দেহে যেন সুচ ফুটাইয়া দেয়। সকালবেলাতেই দুইবার স্নান করিয়া পদ্মের শরীর যেন অসুস্থ হইয়া পড়িল। সমস্ত দিনেও বেচারি সে অসুস্থতা কাটাইয়া উঠিতে পারিল না। রান্নাশালায় আগুনের অ্যাঁচেও সে আরাম পাইল না। রান্নাবান্না শেষ করিয়াও সে কিছু খাইল না, সমস্ত অনিরুদ্ধের জন্য ঢাকা দিয়া রাখিয়া দিল। কর্মকার সকালেই খাবার ব্ৰাধিয়া লইয়া ময়ূরাক্ষীর ওপারে জংশনে তাহার নূতন কামারশালায় গিয়াছে।
অপরাহ্নে সে ফিরিল। পদ্ম চুপ করিয়া দেওয়ালে ঠেস দিয়া বসিয়া ছিল, অসুস্থ উদাসীনতা তাহার সর্বাঙ্গে পরিস্ফুট। অনিরুদ্ধ একে ক্লান্ত, তাহার উপর পথে দুর্গার বাড়িতে খানিকটা মদ খাইয়া আসিয়াছে। পদ্মের ভাবভঙ্গি দেখিয়া তাহার সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া গল। অত্যন্ত ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ নির্বাক পদ্মের দিকে চাহিয়া থাকিয়া অকস্মাৎ প্রচণ্ড চিৎকার করিয়া উঠিল—বলি, তোর হল কি?
পদ্ম এতক্ষণে অনিরুদ্ধের দিকে চাহিল।
অনিরুদ্ধ আবার চিৎকার করিয়া উঠিল হল কি তোর?
শান্তস্বরে পদ্ম জবাব দিল কি হবে? কিছুই হয় নাই।…শরীরের অসুস্থতার কথা অনিরুদ্ধকে বলিতেও তাহার ইচ্ছা হইল না, ভালও লাগিল না। পাথরকে দুঃখের কথা বলিয়া কি হইবে? অরণ্য-রোদনে ফল কি? কথার শেষে একটি বিষণা মৃদু হাসি তাহার মুখে ফুটিয়া উঠিল।
দাঁতে দাঁত ঘষিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—তবে? তবে উদাসিনী রাইয়ের মত বসে রয়েছিসচালকাঠের দিকে চেয়ে?
মুহুর্তে পদ্ম যেন দপ করিয়া জুলিয়া উঠিল—তাহার অলস শিথিল দেহের সর্বাঙ্গে চকিতের জন্য একটি অধীর চাঞ্চল্য যেন খেলিয়া গেল, ডাগর চোখ দুটি ক্রোধে রক্তাভ, উগ্র ভঙ্গিতে বিস্ফারিত হইয়া উঠিল। অনিরুদ্ধের মনে হইল—দুই টুকরা লোহা যেন কামারশালার জ্বলন্ত অঙ্গারের মধ্যে আগুনের চেয়েও দীপ্তিময় এবং উত্তপ্ত হইয়া গলিবার উপক্রম করিতেছে। পদ্মের দেহখানা পর্যন্ত জ্বলন্ত অঙ্গারের মত দুঃসহ উত্তাপ ছড়াইতেছে। এ মূর্তি পদ্মের নূতন। অনিরুদ্ধ ভয় পাইয়া গেল। এইবার পদ্ম কি বলিবে, কি করিবে সেই আশঙ্কায় সে অধীর অস্থির হইয়া উঠিল। পদ্ম কিন্তু মুখে কিছু বলিল না। তাহার ক্রোধ পাত্রে আবদ্ধ জ্বলন্ত ধাতুর মতই তাহার দৃষ্টি ও দেহভঙ্গির মধ্যেই গণ্ডিবদ্ধ হইয়া রহিল; কেবল একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া সে উঠিয়া দাঁড়াইল। অনিরুদ্ধ দেখিল—পদ্ম যেন কাঁপিতেছে; সে শঙ্কিত হইয়া ছুটিয়া গিয়া তাহার হাত ধরিলকি হল পদ্মঃ পদ্ম!
