–আপনি কিন্তু ওটা করে দেন, সেটলমেন্টের পরচাতেও ঘোষ লেখা আমি।
–কাল-কালই করে নাও না তুমি!
শ্ৰীহরিদের বংশ-প্রচলিত উপাধি পাল। শ্ৰীহরি পাল উপাধিটা পাল্টাতে চায়। অনেকদিন হইতেই সে নিজেকে লেখে ঘোষ; কিন্তু আদালতে ঘোষ চলে না। তাই জমিদারি সেরেস্তায় তাহার নামের জমাগুলিতে পাল কাটাইয়া ঘোষ করিতে চায়। ওদিকে গভর্নমেন্ট হইতে নূতন সার্ভে হইতেছে; রেকর্ড অফ রাইটসের দপ্তরেও ঘোষ উপাধি তাহার পাকা হইয়া যাইবে। পাল উপাধিটা অসম্মানজনক; যাহারা নিজের হাতে চাষ করে, তাহাদের অর্থাৎ চাষীদের ওই উপাধি।
দাশজী আবার বলিল-আর সে-কথাটার কি করছ?
–কোন্ কথা, কামার-বউয়ের কথা?
হো-হো করিয়া দাশজী হাসিয়া উঠিল। বলিল—সে তো হবেই হে। সে কথা আবার শুধোয় নাকি? আমি বলছিলাম গোমস্তাগিরির কথাটা!
শ্ৰীহরি লজ্জিত হইয়া পড়িল। অতর্কিতে সে ধরা পড়িয়া গিয়াছে। অপ্রস্তুতের মতই বলিল-আচ্ছা ভেবে দেখি।
ঠিক এই মুহূর্তেই ক্ষুর-ভাঁড় বগলে করিয়া আসিয়া হাজির হইল তারাচরণ প্রামাণিক। গভীর ভক্তির সহিত একটি নমস্কার করিয়া মোলায়েম হাসি হাসিয়া সম্ভাষণ জানাইল—পেনাম আজ্ঞে!
কপালের উপরে দৃষ্টি টানিয়া তুলিয়া তারাচরণের মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া দাশজী বলিল—এস বাপধন এস। কি সংবাদ?
মাথা চুলকাইয়া তারাচরণ বলিল গিয়েছিলাম কঙ্কণায়। বাড়ি এসেই শুনলাম, মা বললে– গোমস্তামশাই এসেছেন,শুনেই জোরপায়ে আজ্ঞে আসছি—সে অকারণে হাসিতে লাগিল।
তারাচরণের এই হাসিটি তাহার ব্যবসায়ের অভিজ্ঞতা এবং বুদ্ধি হইতে উদ্ভূত। যাহার ডাকে সে সর্বাগ্রে না যায়—সেই চটিয়া ওঠে। তাই তারাচরণ মনস্তৃষ্টির জন্য এই মিষ্টি হাসিটি হাসে, শ্লেষে-তিরস্কারেও সে এমনি করিয়া হাসে। আরও একটি সত্য সে আবিষ্কার করিয়াছে–সেটিকেও সে কাজে লাগায়। প্রতিবেশীর গোপন তথ্য জানিবার জন্য মানুষের অতি ব্যর্থ কৌতূহল। সকাল হইতে দ্বিপ্রহর পর্যন্ত সে গ্রামে-গ্রামান্তরে নানাজনের বাড়িতে যায়। রামের বাড়ির খবর সে শ্যামকে বলে, শ্যামের সংবাদ যদুকে দেয়; আবার যদুর কথা মধুকে নিবেদন করিতে করিতে তাহার বিরক্তি অপনোদন করিয়া তাহাকে খুশি করিয়া তোলে। সেই অবসরে আবার তাদের বাড়িরও দুই-চারিটি গোপন সংবাদ জানিয়া লয়।
গাড়ু হইতে বাটিতে জল ঢালিয়া লইয়া সে আরম্ভ করিল-কঙ্কণাতে হইহই কাণ্ড। আজ্ঞে বুঝলেন কিনা! তবু পড়েছে আট-দশটা,-গাড়ি গাড়ি কাগজ জড়ো হয়েছে।
—হুঁ—সেটলমেন্ট ক্যাম্প বসেছে!
কৌশলী তারাচরণ বুঝিল এ সংবাদে গোমস্তার চিত্ত সরস হইবে না। চকিত দৃষ্টিতে শ্ৰীহরির মুখের দিকে চাহিয়া দেখিল—শ্ৰীহরির মুখও গম্ভীর। মুহূর্তে সে প্রসঙ্গান্তরে আসিয়া বলিল—এবার পোয়াবারো হল দুর্গা-টুর্গার। দু হাতে টাকা লুটবে। টেরিকাটা আমিনের দল যা দেখলাম! বুঝলে ভাই পাল?
গোমস্তা ধমক দিল-পাল কি রে, ভাই কি রে? ভাই পাল বলিস কেন? ওকে তুই ভাই পাল বলবার যুগ্যি? বুঝলেন বলতে পারি না, না?
–আজ্ঞে?
—ঘোষমশায় বলবি। পাল হল যারা নিজের হাতে চাষ করে। এ গায়ের মাথার ব্যক্তি হলেন শ্রীহরি।
তারাচরণ নীরবে সব শুনিতে আরম্ভ করিল। অনেক কথাই শুনিলমায় এ গ্রামের গোমস্তাগিরিও যে শ্ৰীহরি ঘোষ মহাশয় লইতেছেন, সে কথাটা আভাসে সে অনুমান করিয়া লইল। তৎক্ষণাৎ বলিল—একশোবার হাজারবার, ঘোষ মহাশয়ের তুল্য ব্যক্তি এ কখানা গাঁয়ে কে আছে বলুন? গোমস্তার গালের উপর ক্ষুরের একটা টান দিয়া সে চাপা গলায় বলিলউনি ইচ্ছে করলে দুর্গার মত বিশটা বাদী রাখতে পারেন!
হাত তুলিয়া ইঙ্গিতে ক্ষুর চালাইতে নিষেধ করিয়া দাশজী মৃদুস্বরে প্রশ্ন করিল-অনিরুদ্ধ কামারের বইটা দুৰ্গার সঙ্গে জোট বেঁধে বেঁধে বেড়ায় কেন রে? ব্যাপার কি বল্ তো?
—তাই নাকি? আজই খোঁজ নিচ্ছি দাঁড়ান! তবে কর্মকারের সঙ্গে দুর্গার আজকাল একটুকু—তারাচরণ হাসিল।
–নাকি?
হ্যাঁ। শ্ৰীহরি চুপ করিয়া বসিয়া ছিল। পদ্মকে লইয়া এমনভাবে আলোচনা তাহার ভাল লাগিতেছিল না। ওই দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটির প্রতি তাহার আসক্তি প্ৰচণ্ড-কামনা প্রগাঢ়, যে আসক্তি ও যে কামনাতে মানুষ মানুষকে, পুরুষ নারীকে একান্তভাবে একক ও নিতান্তভাবে নিজস্ব করিয়া পাইতে চায়, এক জনশূন্য লোকেসে তাহাকে চায় চোরের সম্পদের মত; অন্ধকার গুহার নিস্তব্ধতম আবেষ্টনীর মধ্যে সৰ্পের সর্পিণীর মত শতপাকের নাগপাশের বন্ধনের মধ্যে।
***
পদ্মের বাড়ি আসিয়া দুৰ্গা দেখিল পদ্ম আবার স্নানে যাইবার উদ্যোগ করিতেছে। পদ্ম দ্রুতপদে চলিয়া আসিবার কিছুক্ষণ পর দুর্গা কিছুক্ষণ একটা গলির আড়ালে লুকাইয়া দাঁড়াইয়া ছিল। গোমস্তাটিকে সে ভাল করিয়াই জানে। শ্রীহরির তো নখ হইতে মাথার চুল পর্যন্ত তাহার নখদর্পণে। তাহাদের কথাবার্তা শুনিবার জন্যই সে লুকাইয়া দাঁড়াইয়াছিল। গোমস্তার কথা শুনিয়া সে হাসিল; শ্রীহরির কথাবার্তার ধরনে সে অনুভব করিল বিস্ময়। তারাচরণ আসিতেই সে চলিয়া আসিয়াছে। গামছা কাঁধে ফেলিয়া পদ্ম তখন বাড়ি হইতে বাহির হইতেছিল। দুর্গা প্রশ্ন করিল—এ কি? আবার চান?
–হ্যাঁ।
–ছোঁয়াচ পড়ল বুঝি? যে পাঁচহাত সান তোমার! কিছু ছোঁয়াটা আর আশ্চয্যি কি! অপ্রস্তুতের মত হাসিয়া পদ্ম বলিল–না, মাড়াই নাই কিছু।
—তবে?
–ছেলেতে ময়লা করে দিলে কাপড়।
—তোমার ওই এক বাতিক, ছেলে দেখলেই কোলে নেবে। নিজের নাই, পরের নিয়ে এত ঝাঁট বাড়াও ক্যানে বল তো? এর মধ্যে আবার কার ছেলে নিতে গেলে!
