পদ্ম কিন্তু মিষ্টিটি ফেলিয়া দিতে পারি না, একটি পরিচ্ছন্ন স্থানে সন্তৰ্পণে নামাইয়া দিয়া ছেলেটির মুখের দিকে চাহিয়া একটু হাসিল। তারপর নীরবেই পথে অগ্রসর হইল।
—কামার-বউ। সকৌতুকে দুর্গা তাহাকে ডাকিল।
দীর্ঘ অবগুণ্ঠনে মুখ ঢাকিয়া মাটির উপর চোখ রাখিয়া পদ্মর পথে চলা অভ্যাস; সে তেমনিভাবেই চলিতেছিল। মুখ না তুলিয়াই সে উত্তর দিল—কি?
–ওই দেখ।
–কি? কোথা? কে?
–ওই যে ছামুতে হে!
দুর্গা খুখুক করিয়া হাসিয়া উঠিল।
মাথার ঘোমটা খানিকটা সাইয়া মাথা তুলিয়া চারিদিক চাহিয়াই সে আবার তাড়াতাড়ি ঘোমটা টানিয়া দিল। সম্মুখেই ছিরু পাল খামার বাড়ির দরজার মুখে মোড়া পাতিয়া বসিয়া আছে। একা নয়, পাশেই বসিয়া আছে আরও একটা লোক; লোকটার চোখ দুইটা ভাটার মত গোল-গোল এবং লালচে। নাকটা থ্যাবড়া এবং নাকের পাশে প্ৰকাণ্ড একজোড়া বাহারের গোঁফ লোকটাকে বেশ একটা চেহারা দিয়াছে। যে চেহারা দেখিয়া মেয়েরা অস্বস্তি বোধ করে। তারা দুজনেই তাহাদের দিকে চাহিয়া আছে। ও-লোকটাকেও পদ্ম চেনে—লোকটা জমিদারের গোমস্তা। দ্রুতপদে পদ্ম স্থান অতিক্রম করিয়া চলিয়া গেল। দুর্গার কিন্তু সেই মন্থর গতি-ভঙ্গিমা।
গোমস্তা একবার দুর্গার দিকে চাহিল—তারপর ফিরিয়া তাকাইল শ্রীহরির দিকে। তারপর প্রশ্ন করিল দুর্গার সঙ্গে কে হে পাল?
অনিরুদ্ধের পরিবার।–
–হুঁ। দুর্গার সঙ্গে সঙ্গে জোট বেঁধে বেড়াচ্ছে ক্যানে হে?
–পরচিত্ত অন্ধকার, কি করে জানব বলুন।
–দুর্গা কি বলে? খায়?
শ্ৰীহরি গম্ভীরভাবে বলিল—আমি ওসব ছেড়ে দিয়েছি, দাশ মশায়; দুর্গার সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলি না।
সবিস্ময়ে চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া দাশ বলিলবল কি হে? সঙ্গে সঙ্গে তাহার শিকারী গোঁফজোড়াটা নাচিয়া উঠিল। ওইটা দাশের মুদ্রাদোষ।
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
–হঠাৎ? ব্যাপার কি?
–নাঃ, ও নীচ-সংসর্গ ভাল নয় দাশজী! সমাজে ঘেন্না করে, ছোটলোকে হাসে। নিজের মান-মর্যাদাও থাকে না।
ঘরে আগুন দিবার ব্যাপারটা লইয়া দুর্গার সঙ্গে শুধু তাহার কলহই হয় নাই, মনে মনে সে একটা প্রবল অস্বস্তি বোধ করিতেছে। মনে হইতেছে শুইবার ঘরে সে সাপ লইয়া বাস করিতেছে। সাপ নয়, সাপিনী। সে দুর্গা।
হাসিয়া দাশ বলিল—বেশ তো, কামারনী তো আর নীচ-সংসর্গ নয়। বেটাকে যখন জব্দই করবে তখন ঘরের হাঁড়িসুদ্ধ এঁটো করে দাও না!
শ্ৰীহরি চুপ করিয়া রহিল। এ কামনাটা তাহার বুকে আগ্নেয়গিরির অগ্নিপ্রবাহের মতই রুদ্ধমুখ চাপা হইয়া আছে। নাড়া খাইয়া সেই প্রচ্ছন্ন অগ্নিশিখা ভিতরে ভিতরে প্রবল হইয়া ওঠে।
ওদিকে দাশ ফ্যা-ফ্যা করিয়া হাসিতে আরম্ভ করিল।
শ্ৰীহরির উগ্র চোখ দুইটি সঙ্গে সঙ্গে যেন জ্বলিয়া উঠিল। ওই উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা দীর্ঘাঙ্গী বধূটির প্রতি তাহার অন্তরের নগ্ন কামনার একটি প্রগাঢ় আসক্তি আছে। তাহার মনে পড়ে, ডোবার ঘাটে দণ্ডায়মানা পদ্মের অবগুণ্ঠিত মুখ; বড় বড় চোখ, ছোট কপাল ঘিরিয়া ঘন কালো একরাশি চুল, ঈষৎ বাঁকা নাক, গালের পাশে বড় একটি তিল,তাহার হাতে শাণিত দা, নিষ্ঠুর কৌতুকের মৃদু হাসিতে বিকশিত ছোট ছোট সুন্দর দাঁতের সারিটি পর্যন্ত তাহার মনোমধ্যে ঝলমল করিয়া ওঠে।
দাশ হাসি থামাইয়া বলিল—তোমার টাকা আছে, ভাগ্যিমান লোক তুমি, তুমি যদি ভোগ না কর তো করবে কি রামা-শ্যামা?
বহুক্ষণ পরে অজগরের মত একটা নিশ্বাস ফেলিয়া শ্ৰীহরি বলিল—ছাড়ান দেন, দাশজী, ওসব কথা। এখন আমি যা বললাম তার কি করছেন বলুন।
–তার আর কি, পাল কেটে ঘোষ করতে আর কতক্ষণ? তবে জমিদারি সেরেস্তার নিয়ম জান তো–ফেল কড়ি মাখ তেল, জমিদারকে কিছু নগদ ছাড়, দস্তুরী দাও! আর তা ছাড়া একটা খাওয়াও। শ্ৰীহরির মুখের দিকে চাহিয়া দাশ বলিলা হে, মদও ছেড়েছ নাকি? যে রকম গতিক তোমার! দাশ একটু বাঁকা হাসি হাসিল।
শ্ৰীহরি হাসিয়া বলিলনা, না, সে হবে বৈকি! তবে কথা হচ্ছে, ওসব আর ঢাক পিটিয়ে হইচই করে কিছু করব না। গোপনে আপনার ঘরে বসে বসে যা হয় একটু মাঝে মাঝে।
–নিশ্চয়! ভদ্রলোকের মত! দাশজী বার বার ঘাড় নাড়িয়া শ্ৰীহরির যুক্তি স্বীকার করিয়া বলিল—একশোবার, আমি আগে কতবার তোমাকে বারণ করিচি, মনে আছে? বলেছি, পাল, ঐ রকম ধারা-ধরন তোমাকে শোভা পায় না; যাক, শেষ পর্যন্ত তুমি যে বুঝে সামলেছ—এ তো ভাল!
দাশজীর কথা শ্ৰীহরিও স্বীকার করিয়া বলিলহ্যাঁ, সে আমি বুঝে দেখলাম দাশী, মানসম্মান আপনার ওরকম করে হয় না, সে-কাল এখন আর নাই।
জমিদারি সেরেস্তার বহুদৰ্শী বিচক্ষণ কর্মচারী দাশজী, সে হাসিয়া বলিল—কোনোকালেই হয় না বাবা, কোনোকালেই হয় না। ত্রিপুরা সিংয়ের কথা বল তুমিতাকে লোকে আজও বলে ডাকাত। সেইটা কি মানসম্মান নাকি? এই দেখ, এই কঙ্কণার মুখুজ্জেবাবুদের কথা দেখ! বড়লোক হল—তাতেও লোকে বাবু বলত না। তারপর ইস্কুল দিলে, হাসপাতাল দিলে, ঠাকুর পিতিষ্ঠে করলে—আমনি লোকে ধন্যি-ধন্যি করলে, বাবু তো বাবু একেবারে বড়বাবু বড়বাড়ির বড়বাবু খেতাব হয়ে গেল!
–এবার চণ্ডীমণ্ডপটা আমিও বঁধিয়ে পাকা করে দেব, দাশজী। আর চণ্ডীমণ্ডপের পাশে একটা কুয়ো।
—ব্যস্ ব্যস্ পাকা করে খুদে লিখে দাও কুয়োর গায়ে, চণ্ডীমণ্ডপের মেঝেতেসেবক শ্ৰী শ্ৰীহরি ঘোষেণ প্রতিষ্ঠিতং তারপর তোমার ঘোষ খেতাব মারেং কে, একেবারে পাকা হয়ে যাবে।
