দেবুর স্ত্রীর নাম বিশ্ববাসিনী—ডাকনাম বিলু। বিলু হাসিল। তাহার স্বামীকে সে জানে, সে রাগ করিল না। অন্য কেহ হইলে এই কথা লইয়া একটা ঝগড়া বাঁধাইয়া দিত। এই সুরূপা স্বৈরিণী মেয়েটা যখন মৃদু বাঁকা হাসি হাসিতে হাসিতে পথে বাহির হয়, তখন এই অঞ্চলের প্রতিটি বই সন্ত্রস্ত হইয়া ওঠে। লজ্জা নাই ভয় নাই-পুরুষ দেখিলেই তাহার সহিত দুইচারিটা রসিকতা করিয়া সর্বাঙ্গ দোলাইয়া চলিয়া যায়। পদ্মও রাগ করিল না। কয়েকদিন হইতেই দুৰ্গা তাহার বাড়ি আসা-যাওয়া শুরু করিয়াছে। অনিরুদ্ধকে সে একখানা দা গড়িতে দিয়াছে, সেই তাগাদায় সে এখন দুই বেলা যায়-আসে। অনিরুদ্ধের সঙ্গে রঙ্গ-রহস্য করে হাসিয়া ঢলিয়া পড়ে। মধ্যে মধ্যে পদ্মের সর্বাঙ্গ জুলিয়া ওঠে, কিন্তু খরিদ্দারকে কিছু বলা চলে না। তাহা ছাড়াও, ইদানীং পদ্ম যেন অকস্মাৎ পাল্টাইয়া অন্য মানুষ হইয়া গিয়াছে। হঠাৎ যেন তাহার জীবনে একটা সকরুণ উদাসীনতা আসিয়া তাহাকে আচ্ছন্ন করিয়া সারা জীবনটাকে জুড়িয়া বসিয়াছে; এই শীতকালের ভোরবেলায় কুয়াশার মত। ঘর ভাল লাগে না, অনিরুদ্ধ সম্পর্কেও তাহার সেই সর্বগ্রাসী আসক্তিও যেন হতচেতন মানুষের বাহবন্ধনের মত ক্রমশ এলাইয়া পড়িয়াছে। অনিরুদ্ধ-দুর্গার রহস্যলীলা সে চোখে দেখিয়াও কিছু বলে না, দেবুর শিশুপুত্রকে আপনার কোল হইতে বিলুর কোলে তুলিয়া দিয়া বলিল-আমার তো ভাই ওইটুকুই পুঁজি। বাদবাকি গরু-বাছুর-বউবেটা-বলে শির নেই তার শিরঃপীড়া!–নাতি-নাতনী! বলিয়া সে একটু হাসিল, হাসিয়া বলিলচলি ভাই, পণ্ডিতগিনি।
বিলু তাহার হাত ধরিয়া বলিল জল খাবার নেমত দিয়ে গিয়েছে—তোমার বরের বন্ধু। দাঁড়াও একটু মিষ্টি মুখে দিয়ে যাও।
বিলুর কোলের শিশুটির উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়া বার বার চুমা খাইয়া পদ্ম বলিলখোকামণির হামি খেয়ে পেট ভরে গিয়েছে। এর চেয়ে মিষ্টি তার কিছু হয় নাকি?
–না, তা হবে না।
—তবে দাও ভাই খুঁটে বেঁধে, নিয়ে যাই। ইতুর পেসাদ মুখে দিয়ে খাই কি করে বল? পণ্ডিত না হয় এ সব জানে না, পণ্ডিতগিন্নিকে তো আর বলে দিতে হবে না।
পথে বাহির হইয়া দুর্গা বলিল—বিলুদিদি আমার ভারি ভালমানুষ। যেমন পণ্ডিত তেমনি বিলুদিদি। তবে পণ্ডিত একটুকুন কাঠ-কাঠ, রস কম।
পদ্ম কিন্তু দুর্গার কথা যেন শুনিলই না—আমাকে ভাই ছিরু পালের বাড়ির সামনেটা পার করে দাও।
—মরণ! এত ভয় কিসের? দিনের বেলায় ধরে খেয়ে নেবে নাকি? দুর্গা মুখ বাঁকাইয়া হাসিল। কথাটা বলিয়াও দুর্গা কিন্তু পদ্মের সঙ্গে সঙ্গে চলিল।
পদ্ম বলিল, ওকেই বলি ভাগ্যিমানী। বড়লোক না হোক ছচল-বচল সংসার, তেমনি স্বামী আর ছেলেটি! আহা, যেন পদ্মফুল! যেমন নরম তেমনি কি গা ঠাণ্ডা! কোলে নিলামতা শরীর আমার যেন জুড়িয়ে গেল।
–মা সোন্দার, তার ওপর বাপ কেমন সোন্দার, ছেলে সোন্দার হবে না।
পদ্ম একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল—কোনো কথা সে বলিল না। পথে একটা বছর ছয়-সাতের ছোট ছেলে আদিম কালের বর্বর আনন্দে পথের ধুলার উপর বসিয়া মুঠা-মুঠা ময়দার মত ধুলা আপন মাথায় চাপাইয়া পরমানন্দে হাসিতেছিল। দুর্গা বলিল—এই দেখ, যেমন কপালতেমনি গোপাল। যেমন লক্ষ্মীছাড়া বাপ-মা—তেমনি ছেলের রীতিকরণ।
ছেলেটি সদ্গোপবংশীয় তারিণীচরণের। তারিণীচরণ একজন সর্বস্বান্ত চাষী, যথাসর্বস্ব তাহার বাকি খাজনার দায়ে নিলাম হইয়া গিয়াছে। সে এখন বাউরি, ডোম প্রভৃতি শ্রমিকদের মত দিনমজুর খাঁটিয়া খায়। তারিণীর স্ত্রীও উপযুক্ত সহধর্মিণী, প্রায় সমস্ত দিনটাই ও বাউরি ডোমের মেয়েদের মত ঝুড়ি লইয়া বনে-বাদাড়ে কাঠ সংগ্রহ করে, শাক খুঁটিয়া আনে, ডোবার পাক ঘাটিয়া মাছ ধরে। ওগুলো কিন্তু তারিণীর স্ত্রীর বাহ্যাড়ম্বর, ওই অজুহাতে সে চুরি করিবার বেশ একটি সুযোগ করিয়া লয়। আম-কাঁঠাল শশা-কলা-লাউ-কুমড়া কোথায় কাহার ঘরে আছে—সে সব নখদর্পণে শাক-কাঠ সগ্রহের অছিলায় সে আশপাশেই ঘুরিয়া বেড়ায়। আর সুযোগ পাইলেই পটাপট ছিঁড়িয়া ঝুড়ির তলায় ভরিয়া লইয়া পলাইয়া আসে। আর ওই শিশুটা এমনি করিয়া পথে বসিয়া ধুলা মাথে—কাদে। কাঁদিতে কাঁদিতে ক্লান্ত হইয়া আপনিই ঘুমাইয়া পড়ে হয়ত আপনাদের ঘরের অনাচ্ছাদিত দাওয়ায় অথবা কোনো গাছের তলায়, ঠাঁই বাছাবাছি নাই। কোনো কোনো দিন দূর-দূরান্তেও গিয়া পড়ে; বাপ-মায়ে খোঁজে না, চিন্তিত হয় না। ছেলেটা আপনি আবার ফিরিয়া আসে।
সর রে, ছেলেটা সর। ধুলো দিস না বাপু, কাল বোয়া কাপড় পরেছি।–দুর্গা রূঢ় তিরস্কারে সাবধান করিয়া দিল।
–ইঃ! বলিয়া দুষ্ট হাসি হাসিয়া ছেলেটা একমুঠো ধুলা লইয়া উঠিয়া পাঁড়াইল।
–দোব ছেলের কষা নিড়ে। দুর্গা কঠোরস্বরে শাসাইয়া দিল। ধোঁয়া কাপড়ে ধুলোর ছিটা তাহার কোনোমতেই সহ্য হইবে না।
–মিষ্টি দোব, বাবা? মিষ্টি খাবে? পদ্ম ছেলেটিকে তাহার বঞ্চিত জীবনের সকল আকুতি জড়াইয়া সাদরে সম্ভাষণ করিল।
ধুলোর মুঠাটা নামাইয়াও ছেলেটা বলিল—মিছে কথা। উ, ভারি চালাক তুই!
আপনার খুঁট খুলিয়া পদ্ম বিলুর দেওয়া মিষ্টিটি বাহির করিয়া বলিল—এইবার ধুলো ফেলে দাও। লক্ষ্মীটি!
–উঁ-হুঁ। তু আগে ওইখানে ফেলে দেয়!
–ছি, ধুলো লাগবে। হাতে হাতে নাও।
–হিঃ! তা হলে তু ধরে মারবি।
–না, তু ফেলে দে ক্যানে।
–দাও হে, তাই ফেলে দাও। ধুলো! বলে অ্যাঁস্তাকুড়ের পাতা কুড়িয়ে খায়। ধুলো! দুর্গা ঝঙ্কার দিয়া উঠিল। তাহার রাগ হইতেছিল। সেও বন্ধ্যা কিন্তু তাহার ছেলে-ছেলে করিয়া আকুতি নাই।
