দেবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল—তুমি মলেই দিদি চণ্ডীমণ্ডপে আর ঝাঁট পড়বে না।
বুড়ির ঝাঁট মুহূর্তে থামিয়া গেল, উদাস কণ্ঠে বলিলমা কালী বুড়ো বাবা আপনার কাজের ব্যবস্থা করে নেবে রে ভাই।
আবার কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া বুড়ি বলিল—মরবার সময় যেন তোরা ধরাধরি করে এইখানে এনে বুড়িকে শুইয়ে দিস, ভাই!
দেবু বলিলতা দোব। তুমি কিন্তু তোমার কিছু পোঁতা টাকা আমাদের দিয়ে যেও চণ্ডীমণ্ডপটা মেরামত করা।
অন্য কেহ এ কথা বলিলে বুড়ি আর বাকি রাখিত না, তাহাকে গালিগালাজ দিতে আরম্ভ করিয়া পরিশেষে কাঁদিতে বসিত। কিন্তু দেবু যেন এ গ্রামের অন্য সকল হইতে পৃথক মানুষ। বুড়ি তাহাকে গালিগালাজ না দিয়া বুলিলা, নাতি, তুইও শেষে এই কথা বললি ভাই? গোবর কুড়িয়ে ঘুঁটে বেচে, দুধ বেচে, এক পেট খেয়ে টাকা জমানো যায়? তুই-ই বল ক্যানে!
বুড়ি এবার খসখস করিয়া যথাসাধ্য দ্রুতগতিতে ঝটা চালাইতে আরম্ভ করিল। টাকার কথাটা সে আর বাড়াইতে চায় না। টাকার কথা হইলেই বুড়ির ভয় হয় হয়ত কেহ কোনোদিন রাত্রে তাহাকে মারিয়া ফেলিয়া সর্বস্ব লইয়া পলাইবে। বুড়ির কিছু টাকা আছে সত্য, দুই-তিন জায়গায় মাটির নিচে পুঁতিয়া রাখিয়াছে। বেশি নয়, সর্বসমেত দশ কুড়ি পাঁচ টাকা।
***
মন্থরগতি উত্তেজনাহীন পল্লীজীবন। ইহারই মধ্যে রাস্তায় মানুষ চলাচল বিরল হইয়া আসিতেছে। মধ্যে মধ্যে কেবল দুই-একখানা গরুর গাড়িতে মাঠ হইতে ধান আসিতেছে। ক্যাঁচ-কোঁচ-ক্যোঁ—একঘেয়ে করুণ শব্দ উঠিতেছে। কর্মহীন দেবুও অলসভাবে চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া ছিল। পৌষ মাস গেল মাঠের ধান ঘরে আসিলে, এ গাড়ি কয়খানাও আর যাওয়া-আসা করিবে না। সেবার বিশু-ভাই একটা কথা বলিয়াছিল—আমাদের গ্রামের সেই গরুর গাড়ি চড়ে জীবন যাত্ৰা আর বদলাল না। গ্রামগুলো গরুর গাড়ি চড়ে বলেই এমন পিছিয়ে আছে, জীবনটাই হয়ে গেছে টিমে তেতালা। অন্য দেশে চাষের কাজে এখন চলছে কলের লাঙল, মোটর ট্র্যাক্টর। তাদের গ্রাম চলে লরিতে-ট্রাকে।
দেবু অবশ্য বিশ্বনাথের কথা স্বীকার করে না। কিন্তু গরুর গাড়ি চড়িয়া এখানে যে জীবন চলিয়াছে সে কথা মিথ্যা নয়। ডিমা-ঢিলা চালে কোনোমতে গড়াইয়া গড়াইয়া চলিয়াছেওই চাকার ক্যাঁক্যোঁ শব্দের মত কাতরাইতে কাতরাইতে।
ভূপাল বাগদী চৌকিদার আসিয়া প্ৰণাম করিয়া দাঁড়াইল—পেনাম পণ্ডিতমশায়। ভূপালের পিছনে একটি অবগুণ্ঠনবতী মেয়ে, হাতে একটি হাঁড়ি।
দেবু অন্যমনস্কভাবেই হাসিয়া বলিল-ভূপাল?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। একবার নিকিয়ে-চুকিয়ে দিয়ে যাই চণ্ডীমণ্ডপটি। লে গোলে, সেই উ-পাশ থেকে আরম্ভ কর।
মেয়েটার হাতের হাড়িতে ছিল গোবর-মাটির গোলা, সে নিকাইতে আরম্ভ করিয়া দিল। ভূপাল—সরকারি চৌকিদার আবার জমিদারের লন্দীও বটে; আশ্বিন, পৌষ ও চৈত্র-এই তিন কিস্তির প্রারম্ভে তিনবার চণ্ডীমণ্ডপ তাহাকে গোলা দিয়া নিকাইতে হয়। লক্ষ্মীর পাঁচটা কর্তব্যের মধ্যে এটাও একটা।
দেবু এবার সচেতন হইয়া হাসিয়া বলিল—এ যে হরিঠাকুরের পুজো করা হচ্ছে ভূপাল। চক্রবর্তী ঠাকুরের পুজো করার মত কাণ্ড হচ্ছে ভূপাল। পাঁচখানা গাঁয়ে চক্রবর্তী ঠাকুর পুজো করে। একদিন এক গাঁয়ে গিয়ে একেবারে পাঁচ দিনের পুজো করে আসে। আবার পাঁচ দিন পরে যায়। পৌষ-কিস্তির যে এখনও অনেক দেরি হে!
পণ্ডিতের কথায় ভূপাল না হাসিয়া পারিল না, বলিল-আজ্ঞে আমাদের যুধিষ্ঠির থানাদারও (চৌকিদার) তাই করে; সন্ঝে-বেলায় বার হয়, রাত্রে তিনবার হক দেবার কথাও। একবারেই তিনবার হাঁক দিয়ে ঘরে এসে শোয়।
দেবু সশব্দে হাসিয়া উঠিল। ভূপাল বলিল আমি সেটা করি না—পণ্ডিতমশায়। গোমস্তামশায় এসে গিয়েছেন আজ।
–এসে গিয়েছেন? এত সকালে?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, এবার সকাল-সকালই বটে। সেটেলমেন্টার এসেছে কিনা।
–সেটেলমেন্ট ক্যাম্প?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। ধুমধাম কত, তবুটাবু নিয়ে সে বিশ-পঁচিশখানা গাড়ি। শুনেছি খানাপুরী আরম্ভ হবে ৭ই পৌষ হতে। আজই সন্ঝেতে বোধহয় ঢোল-শোহরত হবে। খেয়েই আমাকে কঙ্কণা যেতে হবে।
সেটেলমেন্টের খানাপুরী? সমস্ত মাঠ জুড়িয়া পাকা ধান—সেই ধানের উপর শেকল টানিয়া-বুটজুতায় ধান মাড়াইয়া–খানাপুরী?
ভূপাল বলিল—ধান এবার মাঠেই ঝাড়াই হবে পণ্ডিতমশায়।
দেবু কুঞ্চিত করিয়া উঠিয়া পাঁড়াইল। এ যে অন্যায়! এ যে অবিচার!
১৩. যিনি করেন ইতুলক্ষ্মী
যিনি করেন ইতুলক্ষ্মী তার ভাগ্যে হয় ব্ৰতকথার ঈশনে–মানে ঈশানীর মত ধানকলাই, ছোলা, মুগ, যব, সরষে, তিসি, নানান ফসলে থৈ থৈ করে ক্ষেত, গাড়িতে গাড়িতে তুলে ফুরোয় না। খামার জুড়ে মরাই বেঁধে কুলোয় না। একমুঠো তুলতে দু-মুঠো হয়। তার ক্ষেতখামার ভঁড়ার ভরে মা-লক্ষ্মী অচল হয়ে বাস করেন। ঘর ভরে যায় সন্তান-সন্ততিতে, গোয়াল ভরে ওঠে গরুতে-বাছুরে; গাছ-ভরা ফল, পুকুর-ভরা মাছ, লক্ষ্মীর হাড়িতে কড়ি, আট অঙ্গ সোনারুপোয় ঝলঝল করে। বউ বেটা আসে, নাতি-নাতনীর পাশে শুয়ে স্বামীর কোলে মরণ হয় তার একগলা গঙ্গাজলে।
ব্ৰত-কথা শেষ করিয়া উল উল হুলুধ্বনি দিয়া দেবুর স্ত্রী প্রণাম করিল। সঙ্গে সঙ্গে দুৰ্গা। এবং পদ্মও হুলুধ্বনি দিয়া প্ৰণাম করিল। দুর্গার কণ্ঠস্বর যেমন তীক্ষ্ণ, তাহার জিভখানিও তেমনি লঘু চাপল্যে চঞ্চল,তাহার হুলুধ্বনিতে সমস্ত বাড়িটা মুখরিত। প্রণাম করিয়া সুপারিটি দেবুর স্ত্রীর সম্মুখে রাখিয়া সে সরবে হাসিয়া উঠিয়া বলিল—বিলু দিদি, ভাই কামার-বউ, মরণকালে তোমরা কেউ আমাকে স্বামী ধার দিয়ো ভাই কিন্তুক।
