দেবু হাসিয়াই বলিল—নে আর ফাজলামি করতে হবে না, এখন কথা শোন। বলিয়া সে যেন ভারমুক্ত হইয়া লঘুহৃদয়ে ঘরে ঢুকিল।
***
দরিদ্র ব্রাহ্মণের পিঠে খাবার সাধ হয়েছে।
দেবুর স্ত্রী ব্ৰত-কথা বলিতেছিল। ব্রাহ্মণ মনে মনে ভাবেন-চালের পিঠে, সরুচাকলি, মুগের পিঠে, নারকেল পুরের পিঠে, রাঙা আলুর পিঠে, ভাবেন আর তার জিভে জল আসে।
ঘরের ভিতর বসিয়া দেবু আপন মনেই হাসিল। জল তাহার জিভে আসিতেছে; বোধ করি ব্ৰত-কথার কথক ঠাকরুনমায় শ্রোতাদের জিহ্বা পর্যন্তও সজল হইয়া উঠিয়াছে।
কিন্তু সাধ হলেই তো হয় না, সাধ্যি থাকা চাই। দরিদ্র ব্রাহ্মণ, জমি নাই, জেরাত নাই, চাকরি-বাকরি নাই, ব্যবসা নাই, বাণিজ্য নাই, যজ্ঞি নাই, যজমান নাই-আজ খেতে কাল নাই আর কোথায় চাল কোথায় কলাই কোথায় গুড়, রাঙা আলুই বা আসে কোথা থেকে? আর ব্রাহ্মণ হয়েও চুরি করতে তো পারেন না! কি করেন?
দেবু ব্রাহ্মণের সততার তারিফ না করিয়া পারিল না।
কিন্তু ব্রাহ্মণের বুদ্ধি তো! তিনি এক ফন্দি বার করলেন। তখন অগ্রহায়ণ মাসের শেষ। মাঠ থেকে গেরস্তের গাড়ি গাড়ি ধান আসছে, কলাই আসছে, আলু আসছে, গাড়ির চাকায় পথের মাটি খুঁড়ো হয়ে এক হাঁটু করে ধুলো হয়েছে। ব্রাহ্মণ বুদ্ধি করে সন্ধ্যার পর বাড়ির সামনেই পথের ধুলোর ওপর আরও খানিকটা কেটে বেশ একটি গর্ত করলেন—তারপর ঢাললেন ঘড়া ঘড়া জল। পরের দিন যত গাড়ি আসে, সব পড়ে ওই গর্তের কাদায়। চাকা আটকে যায়। ব্রাহ্মণ সেই গাড়ি তুলতে সাহায্য করেন আর চাষীদের কাছে আদায় করেন—ধানের গাড়ির থেকে ধান, কলাইয়ের গাড়ি থেকে কলাই, গুড়ের নাগরি থেকে গুড়। এমনি করে ধান, কলাই, গুড়, আলু যোগাড় করে ঘরে তুললেন, তারপর ব্রাহ্মণীকে বললেন, নে বামনি, এবার পিঠে তৈরি কর।
দেবু এবার হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। ব্রাহ্মণের বুদ্ধিতে সে একেবারে মুগ্ধ হইয়া গিয়াছে। তাহার হাসিতে ব্ৰত-কথা বন্ধ হইয়া গেল। বাহির হইতে দুর্গা প্রশ্ন করিল—পণ্ডিতমশায়, হাসছ ক্যানে গো তুমি?
দেবু বাহির হইয়া আসিয়া বলিল,–বামুনের বুদ্ধির কথা শুনে। আচ্ছা বামুন!
দেবুর স্ত্রী মৃদু হাসিয়া ঘোমটা আরও একটু বাড়াইয়া দিল। বলিল—কথাটা শেষ করতে দাও, বাপু।
–আচ্ছা—আচ্ছা! বলিতে বলিতে দেবু বাহির হইয়া গেল।
***
পরিতুষ্ট লঘু মন লইয়া দেবু বাহিরে আসিয়া পথের ধারে বাহিরের ঘরের দাওয়ায় দাঁড়াইল। পল্লীগ্রামে জলখাবার বেলা হইয়াছে। মাঠ হইতে চাষীরা বাড়ি ফিরিতেছে। চাষীশ্রমিকেরা মাঠেই জল খায়, তাহাদের জলখাবার লইয়া মেয়েরা চলিয়াছে মাঠে; মাথায় তাহাদের গামছায় জলখাবারের পাত্র-কাকালে ঝুড়ি, হাতে জলের ঘটি। পুরুষদের জলখাবার খাওয়াইয়া, এই ধান কাটার সময় তাহারা ধানের শীষ সংগ্রহ করিবে, বনজঙ্গল হইতে শুকনা কাঠ ভাঙিয়া জ্বালানি সংগ্রহ করিবে।
দুই-চারিখানা ধান বোঝাই গাড়িও মাঠ হইতে ফিরিতেছে। অগ্রহায়ণের সংক্রান্তি ইহারই মধ্যে গ্রাম্য কাঁচা রাস্তা ময়দার মত ধুলায় ভরিয়া উঠিয়াছে; হেমন্তের শেষ দিন—রৌদ্রের রঙের মধ্যে যেন বৃদ্ধের পাংশু দেহবর্ণের মত শীতের পীতাভ আমেজ ফুটিয়া উঠিয়াছে। গাড়ির চাকায় উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণায় সে রৌদ্রও ধূলি-ধূসর। চণ্ডীমণ্ডপের এক প্রান্তে ষষ্ঠীতলার বুড়া বকুলগাছটার গাঢ় সবুজ পাতাগুলার উপর ইহারই মধ্যে একটা ধুলার প্রলেপ পড়িয়া গিয়াছে। দেবু অন্যমনস্কভাবে আবার চণ্ডীমণ্ডপের উপর উঠিল। চণ্ডীমণ্ডপটারও সৰ্বাঙ্গ ধুলার আস্তরণ। ঘুরিয়া ফিরিয়া সে এইখানেই আসিয়া দাঁড়ায়। এই স্থানটির সঙ্গে তাহার একটা নিবিড় যোগাযোগ আছে যেন।
–হ্যাঁ হে নাতি, বলি, পাঠশালা ভাঙল তোমার? সাড়া-শদ কিছু নাই যেন লাগছে? এত সকালে?
জরাজীর্ণ কোনো নারীকন্ঠের সাড়া আসিল পথ হইতে।
—এস এস, রাঙাদিদি, এস। আজ ইতুলক্ষ্মী, হাফ-স্কুল! দেবু সাগ্রহে তাহাকে একটু অস্বাভাবিক উচ্চকণ্ঠে আহ্বান করিল।
এক বৃদ্ধা—এ গ্রামের রাঙাদিদি, প্রবীণের রাঙাপিসি। তেল মাখিয়া একগাছি কঁটা হাতে আসিয়া চণ্ডীমণ্ডপে উঠিল। বৃদ্ধা এই গ্রামেরই মেয়ে, সন্তানহীনা; শুধু সন্তানহীনাই নয়, সর্বস্বজনহীনা—আপনার জন তাহার আর কেহ নাই। চোখে এখন ভাল দেখিতে পায় না, কানেও খাটো হইয়াছে; কিন্তু দেহ এখনও বেশ সমর্থ আছে। এই সত্তরের উপর বয়সেও সে সোজা খাড়া মানুষ এবং রাঙাদিদি নামটিও নিরর্থক নয়; এখনও তাহার দেহবৰ্ণ গৌর এবং তাহাতে বেশ একটা চিকুণতা আছে। লোকে বলে—বুড়ি তেলহলুদে তাহার দেহটাকে পাকাইয়া তুলিয়াছে; দুই বেলায় পোয়াটাক তেল সে সর্বাঙ্গে মাখে, মধ্যে মধ্যে আবার হলুদও মাখে। সে বলে–তোরা সাবাং মাখিস—আমি হলুদ মাখব না? রোজ স্নানের পূর্বে বুড়ি চণ্ডীমণ্ডপে ঝাঁটা বুলাইয়া পরিষ্কার করিয়া যায়। এটি তাহার নিত্যকৰ্ম।
–ইতুলক্ষ্মীতে হাপ-স্কুল বুঝি? তা বেশ করেছিল। বুড়ি অবিলম্বে ঝাড় দিতে আরম্ভ করিয়া দিল। –কত গান শুনেছি এখানে ভাই নাতি-নীলকণ্ঠ, নটবর, যোগীন্দ্র; মতিরায়ও একবার এসেছিল। বড় যাত্রার দল। কেওন, পাঁচালী কত হত ভাই! তোরা আর কি দেখলি বল? সে রামও নাইসে অযুধ্যেও নাই। চণ্ডীমণ্ডপ নিকুবার জন্যে তখন মাইনে করা লোক ছিল, দিনরাত ভকতক ঝকঝক করত। সিঁদুর পড়লে তোলা যেত।
বুড়ি আপন মনেই বকিয়া যায়। জীবনের যত সমারোহের সুখস্মৃতিসে সমস্তই সে আহরণ করিয়াছে এই স্থানটি হইতে। এখানে আসিয়া তাহার সব কথা মনে পড়িয়া যায়। রোজ সে এই কথাগুলি বলে। কত বড় বড় মজলিস ভাই, গায়ের মাতব্বরেরা এসে বসত, বিচার হত; ভাল-মন্দতে পরামর্শ হত। তখন কিন্তুক মেয়েদের পা বাড়াবার যো থাকত না। ওরে বাস রে, মোড়লদের সে হাঁকাড়ি কি?
