পাঠশালার ছেলেগুলো পণ্ডিতের স্তব্ধতার অবকাশ পাইয়া উসখুস করিতে শুরু করিয়াছিল। একটি ছেলে বলিল-আজ ইতুলক্ষ্মী, মাস্টার মশায় আজ আমাদের হাপ-ইস্কুল হয়। নটা বেজে গিয়েছে ঘড়িতে।
দেবুর সম্মুখেই থাকে একটা টাইমপি। দেবু ঘড়িটার দিকে চাহিয়া আবার পড়াইতে শুরু করিল–
শৈশব না যেতে ক্ষেতে শিখিয়াছি কাজ,
সেই তো গৌরব মোর তাতে কিবা লাজ?
ধীরে ধীরে সমস্ত কবিতাটি শেষ করিয়া দেবু বলিল—কালকে এই পদ্যটির মানে লিখে আনবে সবাই। মানে বলতে কথার মানে নয়, কে কি বুঝেছ লিখে আনবে।
পাঠশালার ছুটি দিয়া সে আজ সঙ্গে সঙ্গেই আসিয়া বাড়ি ঢুকিল। বাড়ির উঠানে তখন তাহার স্ত্রীর সম্মুখে বসিয়া আছে পদ্ম, অদূরে বসিয়া আছে দুর্গা; তাহার স্ত্রী ইতুলক্ষ্মীর ব্ৰতকথা বলিতেছে। দেবুর স্ত্রী বড় ভাল উপকথা বলিতে পারে, এ পাড়ায় ব্রত-কথার আসর তাহার ঘরেই বসে। সে আসর শেষ হইয়া গিয়াছে। এ বোধহয় দ্বিতীয় দফা। দেবুর শিশু-পুত্রটিকে কোলে লইয়া পদ্ম বসিয়াছিল, দেবুকে দেখিয়া সে অবগুণ্ঠন টানিয়া দিল। দেবুর স্ত্রীও ঘোমটা অল্প একটু টানিয়া হাসিল। দুর্গা কাপড়চোপড় সামলাইয়া গুছাইয়া বেশ একটু বিন্যাস করিয়া বসিল। তাহারও মুখে ফুটিয়া উঠিল মৃদু হাসি। কিন্তু সেদিকে লক্ষ্য করিবার মত মনের অবস্থা দেবুর ছিল না। ব্ৰত-কথা তাহার স্ত্রী ভাল বলে—চমৎকার বলে, তাহাদের পাড়ার সকলেই প্রায় ব্ৰত-কথা শুনিতে তাহার বাড়িতে আসে। কিন্তু আজ কামার-বউয়ের তাহার বাড়িতে আসাটা যেমন অস্বাভাবিক তেমনি বিস্ময়কর।
নবান্নের দিন দেবু এই বধূটিকে কঠোরভাবে ভোগ ফিরাইয়া লইয়া যাইতে বলিয়াছিল। আজও কিছুক্ষণ আগেই পদ্ম পথ হইতে চণ্ডীমণ্ডপে দেবতার উদ্দেশে প্রণাম করিয়াছে, চণ্ডীমণ্ডপে ওঠে নাই, অথচ তাহারই বাড়িতে ব্ৰত-কথা শুনিতে আসিয়াছে—এ ব্যাপারটা সত্যই তাহার কাছে বিস্ময়কর মনে হইল। দেবু থমকিয়া দাঁড়াইল, পদ্মকে কোনো কথা বলিতে না পারিয়া প্রশ্ন করিল দুর্গাকে কি রে দুর্গা?
দুর্গার মুখে মৃদু হাসি বিকশিত হইয়া উঠিল, হাসিয়া সে বলিল—কথা শুনতে এসেছি দিদির কাছে। এমন কথা কেউ বলতে পারে না, বাপু। হাজার হোক পণ্ডিত-গিন্নি তো!
ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া দেবু বলিল—দিদি? কথাটা তাহাকে পীড়া দিয়াছিল।
–হ্যাঁ গো। দিদি! তোমার গিনি যে আমার বিলু দিদি, তুমি যে আমার জামাইবাবু! দেবুর সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া গেল; কঠোর স্বরেই বলিল মানে? ও দিদি কি করে হল তোর?
চোখ দুইটা বড় বড় করিয়া বলিল—হেই মা! আমার মামার বাড়ি যে তোমার শ্বশুরদের গায়ে গো! আমার মামারা যে দিদিদের বাপের বাড়ির খেয়ে মানুষ-পুরনো চাকর! দিদি যে আমার মামাকে কাকা বলে; তা হলে আমার দিদি নয়?
ভাল না লাগিলেও প্রসঙ্গটা সম্পর্কে তাহাকে নীরব হইতে হইল। শুধু বলিল। তারপর স্ত্রীকে বলিল—উটি আমাদের কর্মকারের, মানে অনিরুদ্ধের স্ত্রী নয়?
দীর্ঘ অবগুণ্ঠন পদ্ম আরও একটু বাড়াইয়া দিল। দেবুর স্ত্রী চাপাগলায় বলিল–হ্যাঁ।
দুর্গা সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ করিল-কামার-বউয়ের কথা শোেনা হয় নাই। ওদের বাড়ি গেলাম তো দেখলাম—ম হয়ে বসে ভাবছে। উ পাড়ায় কথা হয় ওই পালের বাড়িতে ছিরু পালের বাড়িতে। ওদের বাড়ি যায় না কামার-বউ, তাতেই বললাম—এসো, আমার দিদির বাড়িতে এসো।
দেবু চুপ করিয়া রহিল।
দুর্গা বলিল—কামার-বউ ভয় করছিল, পণ্ডিতমশায় যদি কিছু বলে। সেদিন চণ্ডীমণ্ডপে তুমি নাকি বলেছিলে—
মধ্যপথেই বাধা দিয়া দেবু বলিল—অনিরুদ্ধ যে মহা অন্যায় করেছে।
অকুণ্ঠিত স্বরে অভিযোগ করিয়া দুর্গা বলিল—তোমার মত লোকের যুগ্য কথা হল না, পণ্ডিতমশায়। অন্যায় কি একা কর্মকারের? বল তুমি?
দেবু কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলা, তা বটে। বুঝতে আমার ভুল খানিকটা হয়েছিল।
সুযোগ পাইয়া বিনা দ্বিধায় সে ওই দুর্গার মারফতে কামার-বউয়ের কাছে কথাটা স্বীকার করিয়া ভারমুক্ত হইতে চাহিল।
দেবুর স্ত্রী চাপা গলাতেই ব্যস্ত হইয়া বলিল—কেঁদো না কামার-বউ, কেঁদো না! পদ্ম ঘোমটার আঁচল দিয়া বার বার চোখ মুছিতেছিল; সেটা সে লক্ষ্য করিয়াছিল।
দেবু ব্যস্ত হইয়া বলিলনা, তুমি কেঁদো না। অনিরুদ্ধ আমার ছেলেবেলার বন্ধু; একসঙ্গে পাঠশালায় পড়েছি। তাকে বোলো, আমি যাব আমি নিজেই যাব তার কাছে।
দুর্গা পদ্মকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়া উঠিল—আমি তোমাকে বলেছিলাম তো কামার-বউ, ওই জগন ডাক্তারের মোড়লির পাল্লায় পড়ে জামাই আমাদের এ কাজ করেছে।
—না, না, মিছে পরকে দোষ দিনে দুর্গা। আমারই বুঝবার ভুল।
এমন আন্তরিকতা-মাখা কণ্ঠে অকপট স্বীকারোক্তি সে করিল যে দুৰ্গা পর্যন্ত স্তব্ধ হইয়া গেল।
দেবুই আবার বলিল–ওগো, অনিরুদ্ধের বউকে জল খাইয়ে তবে ছেড়ে দিও।
—আর আমি? দুর্গা ঝঙ্কার দিয়া উঠিল।-ওঃ, আমি বুঝি বাদ যাব? বেশ জামাইদাদা যা হোক।
স্বৈরিণী মেয়েটার কথা বলার ভঙ্গি, আত্মীয়তার সুর এমন মিষ্ট এবং মনকাড়া যে কিছুতেই রাগ করা যায় না তাহার উপর। তাহার কথায় দেবুর বউ হাসিল, পদ্ম হাসিল; দেবুও না হাসিয়া পারিল না। হাসিয়া দেবু বলিল—তোর জন্য ভাবনা তো আমার নয়, সে ভাবনা ভাববে তোর দিদি। আপনার জন থাকতে কি পরের আদর ভাল লাগে রে?
—লাগে গো লাগে। টাকার চেয়ে সুদ মিষ্টি; দিদির চেয়ে দিদির বর ইস্টি, আদর আরও মিষ্টি। আমার কপালে মেলে না।
