দুর্গা হাসিয়া বলিলখবরে আমার দরকার নাই, দরকার তোমার বউয়ের। পথের পানে চোখ চেয়ে বিলু দিদি বাড়ির দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে।
তাই তো! দেবুর এতক্ষণে চমক ভাঙিল, সে তাড়াতাড়ি উঠিয়া পাড়াইল। ওঃ, এ যে অনেক বেলা হইয়া গিয়াছে! চণ্ডীমণ্ডপ হইতে নামিয়া সে হনহন করিয়া আসিয়া বাড়ি ঢুকিল। ভাল মানুষ বউটি সত্যই পথ চাহিয়া বসিয়াছিল। সে বলিল রান্না হয়ে গিয়েছে, চান কর।
দেবুর জীবনে এই এক পরম সম্পদ। ঘরে তাহার কোনো দ্বন্দ্ব নাই, অশান্তি নাই। তাই বোধহয় বাহিরে বাহিরে সমগ্র গ্রামখানি জুড়িয়া দ্বন্দ্ব অশান্তি সন্ধান করিয়া ফিরিয়াও তাঁহার ক্লান্তি আসে না।
দেবু চলিয়া গেলেও দুর্গা অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল, দেবু যে পথে গেল, সেই পথ-পানে চাহিয়াই দাঁড়াইয়া রহিল। পণ্ডিতকে তাহার ভাল লাগে খুব ভাল লাগে। ছিরু কে সে এখন ঘৃণা করে, সেই আগুন লাগানোর সংবাদ সে কাহাকেও বলে নাই; ঘৃণায় তাহার সহিত সংস্রব ত্যাগ করিয়াছে। কিন্তু ছিরু র সহিত যখন তাহার ঘনিষ্ঠতা ছিল—তখনও তাহার পণ্ডিতকে ভাল লাগিত; ছিরু অপেক্ষা অনেক বেশি ভাল লাগিত। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এই যে, এই দুই ভাল লাগার মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। আজ পণ্ডিতকে পূর্বাপেক্ষা যেন আরও বেশি ভাল লাগিল।
পণ্ডিতের সহিত তাহার একটা সম্বন্ধও আছে। রক্তের সম্বন্ধ নয়, পাতানো সম্বন্ধ। দেবুর বউ বিলুকে তাহার মা এককালে কোলেপিঠে করিত। সেই কারণে সে বিলুকে দিদি বলে। দেবু পণ্ডিত তাহার বিলু দিদির বর।
১২. অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে ইতুলক্ষ্মী পর্ব
অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে ইতুলক্ষ্মী পর্ব আসিয়া গেল।
অন্যান্য প্রদেশে-বাংলাদেশে বিশেষ অঞ্চলে কার্তিক-সংক্রান্তি হইতেই ইতু বা মিত্র-ব্ৰত আরম্ভ হয়, শেষ হয় অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে। রবিশস্যের কল্যাণ কামনা করিয়া সূর্য-দেবতার উপাসনা হইতেই নাকি ইহার উদ্ভব। দেবুদের দেশে কিন্তু সম মাস ধরিয়া সূর্য-দেবতার আরাধনার প্রচলন নাই। এদেশে রবিশস্যের চাষেরও বিশেষ প্রকার নাই, ধান-চাষ এখানকার প্রধান কৃষিকৰ্ম। ইতু-পর্বকে এখানে ইলক্ষ্মী বা ইতু-সংক্রান্তি পর্ব বলা হয়। হৈমন্তী-ধান মাড়াই ও ঝাড়াই করিবার শুভ প্রারম্ভের পর্ব এটি এবং রবিশস্যের আবাহনও বটে। চাষীদের আপন খামারে ইহার অনুষ্ঠান হয়। খামারের ঠিক মধ্যস্থলে শক্ত একটি বাঁশের খুঁটি পুতিয়া সেই খুঁটির তলায় আল্পনা দিয়া সেইখানে লক্ষ্মীর পূজা ভোগ হয়। ধান মাড়াইয়ের সময়ে ওই খুঁটিটির চারদিকেই ধানসুদ্ধ পোয়াল বিছাইয়া দেওয়া হইবে এবং গরু মহিষগুলি ওই খুঁটাতে আবদ্ধ থাকিয়া বৃত্তাকারে পোয়ালের উপর পাক দিয়া ফিরিবে। তাহাদের পায়ের খুরের মাড়াইয়ে খড় হইতে ধান ঝাড়াই হইয়া যাইবে।
এ পর্বের সঙ্গে চণ্ডীমণ্ডপের সম্বন্ধ বিশেষ নাই। তবে মেয়েরা প্রাতঃকালে স্নান করিয়া চণ্ডীমণ্ডপে প্রণাম না করিয়া লক্ষ্মী পাতিবে না। পূর্বকালে আরও খানিকটা ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল। দেবুর মনে আছে, পনের বৎসর পূর্বেও লক্ষ্মীপূজার শেষে সমস্ত গ্রামের মেয়েরা আসিয়া এইখানে সমবেত হইয়া সুপারি হাতে ব্ৰত-কথা শুনিতে বসিত। গ্রামের প্রবীণা কেহ ব্ৰতকথা। বলিতেন। অপর সকলে শুনিত। আজকাল সে রেওয়াজ উঠিয়া গিয়াছে। এখন দুই-তিন বাড়ির মেয়েরা কোনো এক বাড়িতে একত্রিত হইয়া ব্ৰত-কথা শুনিয়া লয়। দেবুর বাড়িতেও এই ব্ৰতকথার আসর বসে। আজ দেবু পাঠশালায় পড়াইতে পড়াইতে ওইসব কথাই ভাবিতেছিল। তাহার মনে সেদিন হইতে সমস্ত প্রেরণা ও শক্তি ক্ষুব্ধ ও আহত হইয়া অহরহ তাহাকে পীড়িত করিতেছে। যে কোনো সুযোগ পাইলেই তাহা অবলম্বন করিয়া আবার সে খাড়া হইয়া দাঁড়াইতে চায়। জগন ডাক্তারের সহিত যোগাযোগ আবার স্বাভাবিক নিয়মের বসে শিথিল হইয়া আসিয়াছে। জগন ডাক্তারের ঐ দরখাস্ত করার পন্থাটাকে সে অন্তরের সহিত গ্রহণ করিতে পারে না। দরখাস্তের কথায় তাহার হাসি আসে। অন্তর জ্বলিয়া ওঠে।
সে সাহিত্য পড়াইতেছিল—
অট্টালিকা নাহি মোর নাহি দাস-দাসী
ক্ষতি নাই, নহি আমি সে সুখ-প্রয়াসী।
আমি চাই ছোট ঘরে বড় মন লয়ে,
নিজের দুঃখের অন্ন খাই সুখী হয়ে!
পরের সঞ্চিত ধনে হয়ে ধনবান,
আমি কি থাকিতে পারি পশুর সমান?
সহসা তাহার নজরে পড়িল—একটি দীর্ঘাঙ্গী অবগুণ্ঠনবতী মেয়ে পথের ধার হইতেই চণ্ডীমণ্ডপের দেবতার উদ্দেশে প্রণাম করিল। চণ্ডীমণ্ডপে সে বোধহয় ইচ্ছা করিয়াই উঠিল না; কারণ তাহার পদক্ষেপে কোনো ব্যস্ততার লক্ষণ দেখা গেল না। দেবু তাহাকে চিনিল–অনিরুদ্ধের স্ত্রী। বুঝিল নবান্নের দিনের সেই ঘটনার জন্য অনিরুদ্ধের স্ত্রী চণ্ডীমণ্ডপের উপরে উঠিল না। মুহুর্তে দেবুর মন খারাপ হইয়া গেল। অনিরুদ্ধের স্ত্রী ওই যে নীরবে পথের উপর হইতে প্রণাম করিয়া চলিয়া গেল, তাহার প্রতিটি ভঙ্গি যেন রুদ্ধ-বেদনায় ব্যথিত বিষণ্ণ বলিয়া। তাহার মনে হইল। একা আসিয়া একা চলিয়া গেল, যেন বলিয়া গেল—একা আমিই কি দোষী? দেবু অনিরুদ্ধের স্ত্রীর গমনপথের দিকেই চাহিয়া রহিল, মেয়েটির ধীরপদক্ষেপ যেন ক্লান্ত। বলিয়া তাহার মনে হইল। সে একটা দীর্ঘনিশ্বাস না ফেলিয়া পারিল না। কাজটা সত্যই অন্যায়। হইয়া গিয়াছে। এই মুহূর্তটিতে তাহার বিচারবুদ্ধির ত্রুটি স্বীকার না করিয়া পারিল না। অনিরুদ্ধের অন্যায়ের চেয়ে গ্রামের লোক যে অনিরুদ্ধের প্রতি অন্যায় করিয়াছে বেশি! ধান না দেওয়ার জন্যই অনিরুদ্ধ কাজ বন্ধ করিয়াছে। মজলিসে ছিরু আগে অপমান করিয়াছে, তবে অনিরুদ্ধ উঠিয়াছিল। অনিরুদ্ধের দুই বিঘা বাকুড়ির ধান কাটিয়া লওয়ার প্রতিকার যখন কেহ করিতে পারে নাই, তখন অনিরুদ্ধকে শাস্তি দিবার অধিকারই বা কাহার আছে? অকস্মাৎ সে বিস্ময়ে চকিত হইয়া উঠিল, মনের চিন্তাধারায় একটা ছেদ পড়িয়া গেল-একি! অনিরুদ্ধের স্ত্রী তাহার বাড়ির দিকে যাইতেছে কেন?–
