নাস্তিকতার পরিণাম সম্পর্কে এই ঘটনার কাহিনী তাহার অন্তরে অদ্ভুত প্রভাব বিস্তার করিয়া রহিয়াছে। তাহার অবশ্য শোনা কথা, তাহার জীবনকালে ঘটিলেও সে তখন ছিল নিতান্তই শিশু। তাহার বাল্যবন্ধু বিশ্বনাথ মহাগ্রামের মহামহোপাধ্যায় ন্যায়রত্নের পৌত্র। বিশ্বনাথের পিতা পণ্ডিত শশিশেখরের কাহিনী সেটি। পণ্ডিত শশিশেখর তাহার পিতা ওই ঋষিতুল্য ন্যায়রত্নের অমতে ইংরেজি শিখিয়া নাস্তিক হইয়া উঠিয়াছিলেন। এ দেশে ব্ৰাহ্মণসভা ডাকিয়া পুরাতন কালের কুসংস্কার বর্জনের একটা চেষ্টা করিয়াছিলেন। অধিবেশনটার তিনিই ছিলেন উদ্যোক্তা। সেই অধিবেশনে তিনি সর্বাগ্রে নারায়ণশিলা স্থাপন করিয়া অৰ্চনা না করার জন্য ন্যায়রত্ন শিহরিয়া উঠিয়া প্রতিবাদ করেন। নাস্তিক শশিশেখর নাস্তিকতাবাদের যুক্তিতে পিতার সহিত তর্ক করেন। ফলে সভা পণ্ড হয়। শুধু তাই নয়, উদ্ভ্রান্ত শশিশেখরের মৃত্যু হয় অপঘাতে, রেল ইঞ্জিনের তলায় তিনি স্বেচ্ছায় কাটা পড়েন। ঘটনার সংঘটন তাই বটে, কিন্তু দেবু ঘোষ তাহার মধ্যে দেখিতে পায় কর্মফলের অলঞ্জ বিধান। দেবুর সবচেয়ে বড় দুঃখ–এই পরিণতি জানিয়াও ন্যায়রত্নের পৌত্র বিশ্বনাথও নাস্তিক হইয়া উঠিয়াছে। সে এখন কলিকাতায় এম-এ পড়ে। যখন আসে তখন দেবুর সঙ্গে দেখা করে। এমএ ক্লাসের ছাত্র হইয়াও কিন্তু বিশ্বনাথ এখনও তাহার বন্ধুই আছে। বয়সে সে দেবুর পাঁচ-ছয় বৎসরের ছোট হইলেও দেবুর বন্ধু সে; স্কুলে ভাল ছেলে বলিয়া তাহাদের পরস্পরের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তখন বিশ্বনাথ তাহাকে দেবুদা বলিত। বয়সের সঙ্গে দেবু আপনার ও বিশ্বনাথের সামাজিক পার্থক্য বুঝিয়া বলিয়াছিল—তুমি আমাকে দাদা বোলো না কিন্তু ভাই; আমার ওতে অপরাধ হয়। বিশু তখন হইতে দেবুকে বলে দেবুভাই। এখন তাহার বন্ধু—সত্যকারের বন্ধু। কখনও শ্রেষ্ঠত্বের এতটুকু তীক্ষা কণ্টক স্পর্শ সে তাহার সান্নিধ্যে অনুভব করে না। এই বিশ্বনাথও সন্ধ্যাক্কি করে না, এই চণ্ডীমণ্ডপে আসিয়াও কখনও দেবতাকে প্রণাম করে না।
দেবু কিছুদিন আগে এই চণ্ডীমণ্ডপ সম্বন্ধে তাহার চিন্তার কথা বিশ্বনাথকে বলিয়াছিল; কি করিয়া এই চণ্ডীমণ্ডপটির হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করা যায়, সে সম্বন্ধে প্রশ্ন করিয়াছিল। বিশ্বনাথ হাসিয়াছিল—সে আর হবে না, দেবু-ভাই। চণ্ডীমণ্ডপটা বুড়ো হয়েছে, ও মরবে এইবার।
—বুড়ো হয়েছে? মরবে মানে?
—মানে, বয়স হলেই মানুষ যেমন বুড়ো হয়, তেমনি চণ্ডীমণ্ডপটা কতকালের বল তো? বুড়ো হয় নি?
চাল-কাঠামোর দিকে চাহিয়া দেবু বলিয়াছিলভেঙে নতুন করে করতে বলছ?
বিশ্বনাথ হাসিয়াছিল; বলিয়াছিল রঙিন পেনীফ্রক পরলেই বুড়ো খোকা হয় না, দেবু-ভাই! এ যুগে ও চণ্ডীমণ্ডপ আর চলবে না। কো-অপারেটিভ ব্যাংক করতে পার? কর না ওই ঘরটাতে কোঅপারেটিভ ব্যাংক, দেখবে দিনরাত লোক আসবে এইখানে। ধরনা দিয়ে পড়ে থাকবে।
তারপর সে অনেক যুক্তিতর্ক দিয়া দেবুকে বুঝাইতে চাহিয়াছিল–টাকাই সব। সেকালের ধর্মমত সামাজিক ব্যবস্থার ভিতরেও অতি সূক্ষ্ম কৌশলে নাকি ওই টাকাটাই ছিল ধর্ম, কর্ম, স্বৰ্গ, মর্ত্য, নরক সমস্ত কিছুর ভিত্তি। ভিত্তির সেই টাকার মশলাটা আজ শূন্য হইয়া যাওয়াতেই এই অবস্থা!
দেবু বার বার প্রতিবাদ করিয়া বলিয়াছিল—না-না-না।
বিশ্বনাথ হাসিয়াছিল।
দেবু প্রতিবাদ করিয়া তীক্ষকণ্ঠে বলিয়া উঠিয়াছিল—ছি—ছি—ছি, বিশু-ভাই। তুমি ঠাকুর মশায়ের নাতি, তোমার মুখে এ কথা শোভা পায় না। তোমার প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত।
বিশ্বনাথ আরও কিছুক্ষণ হাসিয়া অবশেষে বলিয়াছিল—আমি কতকগুলো বই পাঠিয়ে দেব, দেবু-ভাই, তুমি পড়ে দেখো।
–না, ওইসব বই ছুঁলে পাপ হয়। ওসব বই তুমি পাঠিয়ো না।
সে প্রাণপণে আপন সংস্কারকে অ্যাঁকড়াইয়া ধরিয়া আছে। তাহাকে সে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিতে চায়। তাই নবান্নের দিনে অনিরুদ্ধকে এই চণ্ডীমণ্ডপে পূজার অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়া তাহাকে সামাজিক শাস্তি দিবার জন্য জগনের সহিত মিলিত হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, সারা গ্রামটার আর একজনও কেহ তাহাদের পাশে আসিয়া দাঁড়াইল না। অনিরুদ্ধও বিনা দ্বিধায় অবলীলাক্রমে ভোগপূজার থালা তুলিয়া লইয়া চলিয়া গেল। অনিরুদ্ধের পিতৃ-পিতামহের কিন্তু এ সাধ্য ছিল না।
দেবু দিশাহারা হইয়া কয়েকদিন ধরিয়াই এইসব ভাবিতেছে। মধ্যে মধ্যে মনে হয় হয়ত দেবতা একদিন আপন মহিমায় জাগ্রত হইবেন—অন্যায়ের ধ্বংস করিবেন, ন্যায়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করিবেন। শাস্ত্রের বাণীগুলি সে স্মরণ করে। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, কিছুক্ষণ পরেই সে হতাশায় অবসন্ন হইয়া পড়ে।
পাতু মুচি সেই একটি দিনের দিকে চাহিয়াই বাঁচিয়া আছে। সেই ভরসায় সে সমস্ত দুঃখকষ্টের বোঝা মাথায় লইয়া চলিয়াছে। কিন্তু দেবু যে তাহাদের মত কোনোমতেই ওই ভরসায় এমনি করিয়া বাঁচিয়া থাকিতে পারে না।
***
পাঠশালায় ছুটি দিয়াও দেবু একা চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া ওইসব কথাই ভাবিতেছিল। পথ হইতে কে ডাকিল পণ্ডিতমশায় গো!
—কে?
–ওরে, বাস্ রে! বসে বসে কি এত ভাবছ গো?—মুচিদের দুৰ্গা দুধ বেচিতে যাইতেছিল, পথ হইতে দেবুকে ডাকিয়া সে-ই কথা বলিল।
ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া দেবু বলিল—সে খবরে তোর দরকার কি রে?
মেয়েটাকে সে দুচক্ষে দেখিতে পারে না; সে স্বৈরিণী—সে ভ্ৰষ্টাসে পাপিনী; বিশেষ করিয়া সে ওই ছিরুর সহিত ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট। তাহাকে সে ঘৃণা করে।
