দেবুর মাথার মধ্যে আগুন জ্বলিয়া ওঠে।
সেদিন একখানা ছেলেদের বইয়ে একটা ছড়া দেখিল–লেখাপড়া করে যেই, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সেই। দেবু সেই লাইনটি বার বার কলম চালাইয়া কাটিয়া দিল। তারপর বোর্ডের উপর খড়ি দিয়া লিখিয়া দিল—লেখাপড়া করে যেই–মহামানী হয় সেই।
তারপর আরম্ভ করিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গল্প।
***
মধ্যে মধ্যে তাহার মনে হয়, সে যদি ইউনিয়ন বোর্ডের ওই প্রেসিডেন্টের আসনে বসিতে পারিত, তবে সে দেখাইয়া দিত ওই আসনের মর্যাদা কত! কতকত—কত কাজ সে করিত। সে কল্পনা করিত অসংখ্য পাকা রাস্তা। প্রতি গ্রাম হইতে লাল কাঁকরের সোজা রাস্তা বাহির হইয়া মিলিত হইয়াছে এই ইউনিয়নের প্রধান গ্রামের একটি কেন্দ্রে, সেখান হইতে একটি প্রশস্ত রাজপথ চলিয়া গিয়াছে জংশন শহরে। ওই রাস্তা দিয়া চলিয়াছে সারি সারি ধান-চালে বোঝাই গাড়ি, লোকে ফিরিতেছে পণ্য বিক্রয়ের টাকা লইয়া, ছেলেরা স্কুলে চলিয়াছে ওই পথ ধরিয়া। সমস্ত গ্রামের জঙ্গল সাফ হইয়া-ডোবা বন্ধ হইয়া একটি পরিচ্ছন্নতায় চারিদিক ভরিয়া উঠিয়াছে। সমস্ত স্থানগুলিতে ছড়াইয়া দিয়াছে দোপাটি ফুলের বীজ; দোপাটি শেষ হইলে গাদার বীজ। ফুলে ফুলে গ্রামগুলি আলোকিত হইয়া উঠিয়াছে। প্রতি গ্রামের প্রতি পল্লীতে একটি করিয়া পাকা ইদারা খোঁড়া হইয়াছে। কোনো পুকুরে এককণা আবর্জনা নাই, কালো জল টলটল করিতেছে—পাশে পাশে ফুটিয়া আছে শালুক ও পানাড়ীর ফুল। কোৰ্ট বেঞ্চের সুবিচারে সমস্ত অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবিধান হইয়াছে কঠিন হস্তে সে মুছিয়া দিতেছে উৎপীড়ন ও অবিচার। এই সমস্তই সে সম্ভব করিয়া তুলিতে পারে, সুযোগ পাইলে সে প্রমাণ করিয়া দিতে পারে যে, স্থূলকায় মন্থরগতি চতুষ্পদ হইলেই সে হাতি নয়, সোনার খুর-বধানো হৃষ্টপুষ্ট হইলেও গর্দভ চিরদিনই গর্দভই।
ঈর্ষার উত্তেজনায়, কর্মের প্রেরণায় সে অধীর হইয়া উঠিয়া দাঁড়ায়, দ্রুতপদে ঘুরিয়া বেড়ায়, মধ্যে মধ্যে হাতখানা ভজিয়া অতি দৃঢ় মুঠা বাঁধিয়া পেশি ফুলাইয়া কঠিন কঠোর করিয়া তোলে। সকল দেহমন ভরিয়া সে যেন শক্তির আলোড়ন অনুভব করে।
তাহার স্ত্রীটি বড় ভাল মেয়ে। ধবধবে রঙ, খাদা নাক, মুখখানি কোমল-অতি মিষ্টি তাহার চোখের দৃষ্টি। আকারে ছোটখাটো, মাথায় একপিঠ চুল-সরল সুন্দর তাহার মন। তাহার উপরে দেবুর মত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন স্বামীর সংস্পর্শে আসিয়া আপনাকে সে একেবারে হারাইয়া ফেলিয়াছে। মধ্যে মধ্যে দেবুর এই মূর্তি দেখিয়া সে সবিস্ময়ে প্রশ্ন করেও কি হচ্ছে গো? আপনার মনে–
দেবু হাসিয়া বলে–ভাবছি আমি যদি রাজা হতাম।
–রাজা হতে! সে কি গো?
–হ্যাঁ! তা হলে তুমি হতে রানী।
–হ্যাঁ!–তাহার বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না। কিন্তু কথাগুলি ভারি মজার কথা।
তাই তো—পণ্ডিত রাজা হইলে সে রানী হইত ইহা তো ঋটি সত্য কথা।
দেবু আরও খানিকটা গোল পাকাইয়া বলিল—কিন্তু রানী হলেও তোমার গয়না থাকত না। অভিভূত হইয়া গেল দেবুর বউ সে স্তব্ধ হইয়া গেল।
দেবু হাসিয়া বলে—এ রাজার রাজ্য আছে, কিন্তু রাজা তো প্রজার কাছে খাজনা পায় না। ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট, বুঝেছ? লোকের কাছে ট্যাক্স নিয়ে গ্রামের কাজ করতে হয়। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে হয়।
অন্তরে শুভ আকাঙ্ক্ষা এবং উচ্চ কল্পনা থাকিলেই সংসারে তাহা পূর্ণ হয় না। পারিপার্শ্বিক অবস্থাটাই পৃথিবীতে বড় শক্তি। বার বার চেষ্টা করিয়া দেবু সেটা উপলব্ধি করিয়াছে। শীতকালে বর্ষা নামিলেও ধানের চাষ অসম্ভব। বর্ষার সময় খুব উঁচু জমি দেখিয়া দেবু একবার আলুর চাষ করিয়াছিল; কিন্তু আলুর বীজ অঙ্কুরিত হইয়াই জলের স্যাতসেঁতানিতে মরিয়া গিয়াছিল। যে দুই-চারটি গাছ বাঁচিয়াছিল—তাহাতে যে আলু ধরিয়াছিল, তাহার আকার মটর কলাইয়ের মত বলিলে বাড়াইয়া বলা হইবে না। সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ে রুদ্ধ রাখিয়া সে নীরবে পাঠশালার কাজ করিয়া যায়। এবং নিজের গ্রামখানির একটি ভবিষ্যৎ রূপকে মাতৃগর্ভের ভ্রণের মত বিধাতার কল্পনায় লালন করিয়াও যায় মনে মনে। গ্রামের ছোটখাটো সকল আন্দোলন হইতে সে নিজে যথাসাধ্য পৃথকই থাকিতে চায়। সে জানে ইহাতে তাহার মত অবস্থার লোকের ক্ষতিই হয়। পাঠশালার বাঞ্ছিত দলাদলিতে তাহার না থাকাই উচিত—তবু সকল চেষ্টা ব্যর্থ করিয়া তাহার আকাঙ্ক্ষা কল্পনা এমনি ধারায় আন্দোলন উত্তেজনা স্পৰ্শ পাইবামাত্র নাচিয়া বাহির হইয়া আসে। গ্রামখানির যাবতীয় অভাব-অভিযোগ, ত্রুটি-বিশৃঙ্খলা তাহার নখদর্পণে। গ্রামের সামাজিক ইতিহাস সে আবিষ্কারকের মত খুঁজিয়া খুঁজিয়া সংগ্রহ করিয়াছে। গ্রামের কামার, ছুতার, নাপিত, পুরোহিত, দাই, চৌকিদার, ধোপা প্রভৃতির কাহার কি কাজ, কি বৃত্তি, কোথায় ছিল তাহাদের চাকরান জমি, সমস্তই সে যেমন জানিয়াছে এমনটি আর কেহ জানে না। বিগত পাঁচ পুরুষের কালের মধ্যে গ্রামের পঞ্চায়েতমণ্ডলীর কীর্তি-অপকীর্তির ইতিহাসও আমূল তাহার কণ্ঠস্থ।
***
চণ্ডীমণ্ডপের আটচালায় বসিয়া পাঠশালায় পড়াইতে পড়াইতে দেবু ঘোষ চণ্ডীমণ্ডপটির কথা ভাবে। এই চণ্ডীমণ্ডপটি একদিন ছিল গ্রামের হৃৎপিণ্ড, সমস্ত জীবনীশক্তির কেন্দ্ৰস্থল। পূজাপার্বণ, আনন্দ-উৎসব, অন্নপ্রাশন, বিবাহ, শ্ৰাদ্ধ—সব অনুষ্ঠিত হইত এইখানে। অন্যায়-অবিচার-উৎপীড়ন, বিশৃঙ্খলা-ব্যভিচার-পাপ গ্রামের মধ্যে দেখা দিলে এই চণ্ডীমণ্ডপেই বসিত পঞ্চায়েত। এই আসরে বসিয়া বিচার চলিত, শাসন করিয়া সে সমস্ত দূর করা হইত। গ্রামের ঠিক মধ্যস্থলে স্থাপিত এই চণ্ডীমণ্ডপ হইতে হাক দিলে গ্রামের সমস্ত ঘর হইতে সে ডাক শোনা যায়, সে ডাক উপেক্ষা করিবার কাহারও সামর্থ্য ছিল না। আরও তাহার মনে আছে, চণ্ডীমণ্ডপের পাশ দিয়া। সেকালে যে যতবার যাইত প্ৰণাম করিয়া যাইত। আজকাল আর মানুষ প্রণামও করে না। মধ্যে। মধ্যে তাহার মনে হয় দেবতাকে ঈশ্বরকে উপেক্ষা করিয়াই তাহারা এই পরিণতির পথে। চলিয়াছে। দেবু নিত্য নিয়মিত তিনসন্ধ্যা এখানে প্রণাম করে। আপনি আচরি ধর্ম নীরবে সে পরকে শিখাইতে চায়।
