জমিদারের ওই বাকি খাজনা শোধের জন্য তাহার বাপ কঙ্কণার মুখুজ্জে বাবুদের কাছে ঋণ করিয়াছিল। তাহারা তিন বৎসর অন্তে হ্যান্ডনেটের নালিশ করিয়া অস্থাবর ক্রোকী পরোয়ানা আনিয়া, গাই-বাছুরথালা-গেলাস ও অন্যান্য জিনিসপত্র টানিয়া রাস্তায় যেদিন বাহির করিয়াছিল সেদিনের সেই লাঞ্ছনা-বিভীষিকা দেবু কিছুতেই ভুলিতে পারে না। তাহার পর অবশ্য ডিক্রির টাকা আসল করিয়া তমসুক লিখিয়া দেবার প্রতিশ্রুতি দিলে বাবুরা অস্থাবর ছাড়িয়া দিয়াছিল। সেটাকা তাহার বাবার মৃত্যুর পর সে শোধ করিয়াছে। এই বাবুরা অবশ্য বে-আইনী কখনও কিছু করে না, হিসাবের বাহিরে একটি পয়সা অতিরিক্ত লয় না। লোকে বলে—মুখুজ্জে বাবুদের মত মহাজন বিরল। টাকা আদায়ের জন্য জোরজুলুম নাই, অপমান নাই, সুদ শোধ করিয়া গেলে নালিশ কখনও করিবে না; লোকের সম্পত্তির উপর তাদের প্রলোভন নাই। নিলাম করিয়ালওয়ার পরও টাকা দিলেই বাবুরা সম্পত্তি ফেরত দেয়। ইহার একবিন্দু অতিরঞ্জন নয়। তবু দেবু মহাজনকে ক্ষমা করিতে পারে না।
এ-সবের ওপর আরও একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা তাহার মনে অক্ষয় হইয়া আছে। স্কুলে সে ছিল সর্বাপেক্ষা দুইটি ভাল ছেলের একটি। তাহার নিচের ক্লাসে পড়িত মহাগ্রামের মহামহোপাধ্যায় ন্যায়রত্নের পৌত্র বিশ্বনাথ,সে ছিল দ্বিতীয় জন। শিক্ষকরা প্রত্যাশা করিতেন—এই ছেলে দুইটি স্কুলের মুখোজ্জ্বল করিবে। কিন্তু দেবু আজও ভুলিতে পারে না যে, সে ছিল শিক্ষকদের সস্নেহ করুণার পাত্র, ন্যায়রত্নের পৌত্র বিশ্বনাথ পাইত স্নেহের সহিত শ্রদ্ধা আর কঙ্কণার বাবুদের মধ্যম মেধার কয়েকটি ছাত্র পাইত স্নেহের সহিত সম্মান। এমনকি ছিকেও স্কুলের হেডপণ্ডিত তোষামোদ করিতেন,কারণ প্রয়োজনমত ছিরুর বাপের কাছে তিনি কখনও তালগাছ, কখনও জামগাছ, ক্রিয়াকর্মে দশ-পনের সের মাছ চাহিয়া লইতেন। ইহা ছাড়া ঘি, চাল, ডাল, গুড় প্রভৃতি তো নিয়মিত উপহার পাইতেন।
ওই পণ্ডিতটির নির্লজ্জ ললাভের কথা মনে করিলে দেবুর সর্বাঙ্গ রি-রি করিয়া ওঠে। বিশ বৎসর বয়সে ছিরু স্কুলের ফিফথ ক্লাস হইতে বিদায় লইলে পণ্ডিত ছিরুর বাপকে বলিয়াছিল–ছেলেকে সংস্কৃত পড়াও মোড়ল।
ছিরুর বাপ ব্রজবল্লভ ছিল শক্তিশালী চাষী-নিজের পরিশ্রমের সাধনায় সে ঘরে লক্ষ্মীর কৃপা আয়ত্ত করিয়াছিল, কিন্তু নিজে ছিল মূৰ্খ। তাই বড় সাধ ছিল ছেলেটি তাহার পণ্ডিত হয়। ছিঃ বিশ বৎসর বয়সে পশু-স্বভাব-সম্পন্ন হইয়া ওঠায় বেচারার মনস্তাপের সীমা ছিল না। পণ্ডিতের কথায় সে ছেলেকে পণ্ডিতের ছাত্র করিয়া দিল। ছিরু প্রথমটা আপত্তি করে নাই। পণ্ডিত পড়াইতে আসিয়া গল্প করিতেন। বিশেষ করে বয়স্ক বিবাহিত ছাত্রের কাছে তিনি আদিরসাশ্রিত সংস্কৃত শ্লোকের ব্যাখ্যা করিয়া এবং ওই ধরনের গল্প বলিয়া বৎসর চারেক নিয়মিতভাবেই বেশ প্ৰসন্ন গৌরবের সঙ্গে গ্লানিহীন চিত্তে বেতন লইয়াছিলেন। অবশ্য বেতন বেশি নয়, মাসিক দুই টাকা। চারি বৎসর পর ছিরু আবার বিদ্রোহ করিল। ছিরু র বাপ কিন্তু নাছোড়বান্দা। হিরু তখন। পণ্ডিতের হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইবার জন্য বুলি ধরিল—সংস্কৃত পড়িয়া কি হইবে? পড়িতে হইলে সে ইংরেজিই পড়িবে।
ইংরেজি পড়াইবার গৃহশিক্ষক কিন্তু পণ্ডিতের ডবল বেতন দাবি করিল। হিরু তখন ধরিল—সে স্কুলেই পড়িবে। চব্বিশ বৎসর বয়সে সে আবার আসিয়া ফিফথ ক্লাসে বসিল। দেবুও তখন ফিফথ ক্লাসে উঠিয়াছে। হঠাৎ ছিরু র নজর পড়িল দেবুর উপর। দেবুর পাশে অনিকামার। স্কুলে পড়িবার কথা যখন বলিয়াছিল—তখন এই কথাটা ছিরুর মনে হয় নাই। তাহার কল্পনা ছিল অন্য রকম। স্কুলে পড়িবার নাম করিয়া সে কঙ্কণার অথবা স্বগ্রামের নীচ জাতীয়দের পল্লীতে দিনটা কাটাইয়া আসিবে। কিন্তু দেবুকে এবং অনিরুদ্ধকে ক্লাসে দেখিয়া সে আর মাথা ঠিক রাখিতে পারিল না। সঙ্গে সঙ্গে সে বই-খাতা লইয়া উঠিয়া চলিয়া আসিল। বাড়ি চলিয়া আসিল না। সেই পথে-পথেই সে গিয়া উঠিল তাহার মাতামহের বাড়ি। সেখানে গিয়াই সে তাহার জীবনের আদর্শ গুরু ত্রিপুরা সিংকে পাইয়াছিল। তাহার জীবনে পথ দেখায় যে—সেই মানুষের গুরু, মাতামহের মনিব ত্রিপুরা সিংকে দেখিয়া ছিরু তাহাকেই মনে মনে গুরুপদে বরণ করিয়া নিজের কর্মজীবন-যাত্রা শুরু করিল। কিন্তু চব্বিশ বৎসর বয়সে ছি যেদিন ক্লাসে আসিয়া বসিয়াছিল—সেদিনও পণ্ডিত আসিয়া বলিয়াছিলেন—খবরদার, ছিরু কে দেখে কেউ হেসো না। তাহার মধ্যে ব্যঙ্গ ছিল না—ছিল খাতির। সে কথা দেবুর আজও মনে আছে।
স্কুলের মধ্যে সকলের চেয়ে সম্মানের পাত্র ছিল কঙ্কণার মুখুজ্জেদের মূৰ্খ ছেলেটা। তিনতিন জন গৃহশিক্ষক সত্ত্বেও কোনো বিষয়ে তাহার পরীক্ষার নম্বর চল্লিশের কোঠায়ও পৌঁছিত না। একবার সে সঙ্গীদের মধ্যে রহস্য করিয়া বলিয়াছিল–গাধা পিটে কখনও ঘোড়া হয় না। কথাটা ছেলেটার কানে উঠিতেই সে শোরগোল তুলিয়া ফেলিল। সেই সোরগোলে একেবারে শিক্ষকমণ্ডলী পর্যন্ত কাঁপিয়া উঠিলেন। আপিসে ডাকাইয়া আনিয়া হোস্টার তাহাকে ক্ষমা চাহিতে বাধ্য করিয়াছিলেন। একজন শিক্ষক বলিয়াছিলেন—গাধা রে, গাধা নয়, হাতি-হাতির বাচ্চা। গজেন্দ্ৰগমন একটু একটু ধীরই বটে। আজ বুঝবি না, বড় হলে বুঝবি।…
সে কথাটা এখন সে মর্মে মৰ্মে বুঝিতেছে। বাবুদের সেই ছেলেটি বারদুয়েক ফেল করার পর শেষে তৃতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করিয়া আজ লোকাল বোর্ড, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের মেম্বর, ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট, অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট। প্রতি মাসে দেবুকে ইউনিয়ন বোর্ডে গিয়া পাঠশালার সাহায্যের জন্য তাহার সম্মুখে হাত পাতিয়া দাঁড়াইয়া থাকিতে হয়। ছিরু পালও সম্প্রতি ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বর হইয়াছে। মধ্যে মধ্যে সে-ও আসিয়া জিজ্ঞাসা করে—কি গো, পাঠশালা চলছে কেমন?
