চণ্ডীমণ্ডপেই গ্রাম্য পাঠশালা বসে; পাঠশালার প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন হইতে চণ্ডীমণ্ডপই পাঠশালার নির্দিষ্ট স্থান। সে বহুকাল আগের কথা। তখন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড ছিল না, ইউনিয়ন বোর্ড ছিল না। পাঠশালা ছিল গ্রামের লোকের। লোকেরা পণ্ডিতকে মাসে একটা করিয়া সিধা দিত এবং ছেলে পড়াইত। চণ্ডীমণ্ডপে সেকালে কালী ও শিবের নিত্যপূজার ব্যবস্থা ছিল, এবং ওই পূজক ব্রাহ্মণই তখন ছিল পাঠশালার পণ্ডিত। পরবর্তীকালে পূজকের দেবোত্তর জমি কেমন করিয়া কোথায় উবিয়া গেল কে জানে। লোকে বলে জমিদারের পূর্ববর্তী এক গোমস্তা দেবোত্তর জমিকে নামমাত্র খাজনায় বন্দোবস্ত করিয়া নিজের জোতের অন্তর্গত করিয়া লইয়াছে। এমন কৌশলে লইয়াছে যে, সে আর উদ্ধারের কোনো উপায় নাই। এমনকি চিহ্নিত জমিগুলাকে কাটিয়া এমনি রূপান্তরিত করিয়াছে যে, সে জমি পর্যন্ত খুঁজিয়া বাহির করা দুঃসাধ্য। তাহার পরও গ্রাম্য-পৌরোহিত্য, দেব-সেবা এবং পাঠশালাকে অবলম্বন করিয়া এক ব্রাহ্মণ অনেকদিন এখানে ছিল; আজ বৎসর কয়েক আগে সে-ও চলিয়া যাইতে বাধ্য হইয়াছে। শিক্ষা বিভাগের নূতন নিয়মানুযায়ী অযোগ্যতা হেতু তাহাকে বরখাস্ত করিয়া নূতন বন্দোবস্ত হইয়াছে। সম্প্রতি বছর তিনেক পাঠশালার ভার পড়িয়াছে দেবুর হাতে।
এককালে দেবুও এই পাঠশালায় সেই পুরোহিত-পণ্ডিতমশায়ের কাছে পড়িয়াছে। পণ্ডিত একদিকে পূজা করিত জয়ন্তী মঙ্গলা কালী অকস্মাৎ মন্ত্ৰ বন্ধ করিয়া চিৎকার করিয়া উঠিত—এ্যাঁই এ্যাঁই চণ্ডে, পাঁচ তেরম পঁচাত্তর নয়, পাঁচ তেরম পয়ষট্টি। ছয় তেরম আটাত্তর। হ্যাঁ–
ওই অনিরুদ্ধও তখন তাহার সঙ্গে পড়িত। পণ্ডিত তাহাকে বলিত এ দেশের লোহাতে চেকন কাজ হয় না বাবা, কর্মকার, তুমি বিলাত যাও, বিলাতে কলকারখানার কারবার, আলপিন সুচ তৈরি হয় লোহা থেকে। বিলাতি পণ্ডিত না হলে তোমাকে পড়ানো আমার কর্ম নয়;–
ছিরু দেবুর জ্ঞাতি, সম্বন্ধে ভাইপো, কিন্তু বয়সে অনেক বড়। সে প্রথমে তাহার কয়েক ক্লাস উপরে পড়িত; শেষে এক এক ক্লাসে দুই-তিন বৎসর করিয়া বিশ্রাম লইতে লইতে যেদিন দেবুকে সহপাঠীরূপে দেখিতে পাইল, সেইদিনই সে পাঠশালার মোহ জন্মের মত বিসর্জন দিল। তারপরই সে বিবাহ করিয়া সংসারী হইয়াছে—ক্রমে বিষয়-বুদ্ধিতে পচখানা গ্রামের লোককে বিস্মিত করিয়া দিয়াছে। সে আজ গণ্যমান্য ব্যক্তি, গ্রামের মাতব্বর।
অনিরুদ্ধ এবং এই ছিরু পাল—এই দুজনেই গ্রামখানার সমস্ত শৃঙ্খলা ভাঙিয়া দিল। ওই সঙ্গে গিরিশ ছুতার, তারা নাপিতও আছে। দেবু আশ্চর্য হইয়া ভাবিতেছিল—অনিরুদ্ধ ওই যে দম্ভভরে সামাজিক নিয়ম উপেক্ষা করিয়া চণ্ডীমণ্ডপ হইতে ভোগ উঠাইয়া লইয়া গেল, অথচ সমাজের কেহ তাহাকে প্রতিরোধ করিতে পারিল না, ইহার কি কোনো প্রতিকার নাই? এ কয়েকদিন সে নিজেই লোকের দুয়ারে দুয়ারে ফিরিয়াছে, গ্রামের লোক তাহাকে ভালবাসে, অনেকে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু এক্ষেত্রে সকলেই বলিয়াছে এক কথা—এর আর করবে কি দেবু? উপায় কি বল? যদি থাকে তা হলে তুমি কর! তবে বুঝচ কিনা—উ হবে না! কি সমাজ সমাজ করছ? সমাজ কই?
নাই! দেবু নিজেই বুঝিয়াছে, নাই! সেকালে যেসব মানুষ এই সমাজ গড়িয়াছিল, এই সমাজ শাসন করিত, এ সমাজকে ভাল করিয়া জানিত, বুঝিত—সে-সব মানুষই আর নাই। সে শিক্ষাও নাই, সে দীক্ষাও নাই, সে দৃষ্টি নাই। এসব মানুষ আর এক জাতের মানুষ। আর এক ধাতের মানুষ। মানুষের নামে অমানুষ।
জগন ডাক্তার সেদিন বলিয়াছিল—ধরে এনে বেটাচ্ছেলে কামারকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে লাগাও ঘা-কতক।
জগনের ও-প্রস্তাবে দেবু সায় দিতে পারে নাই। ছি! মানুষকে শিক্ষা দেবার অধিকার আছে, ক্ষেত্রবিশেষে মনুষ্যোচিত শাসন করিবার অধিকারও সে স্বীকার করে; কিন্তু অত্যাচারই একমাত্র শাসন নয়। জীবনে তাহার আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু সে আকাঙ্ক্ষা পরিপূরণের জন্য হীন কৌশল, অত্যাচার ও অন্যায়কে অবলম্বন করিতে সে চায় না। জীবনে তাহার একটি আদর্শবোধও আছে। পাঠ্যাবস্থায় আপনার ভাবী জীবনে আত্মপ্রতিষ্ঠার কামনায় সেই বোধটিকে দেবু গড়িয়া তুলিয়াছিল। মহাপুরুষদের দৃষ্টান্তের সঙ্গে খাপ খাওয়াইয়া নিজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গঠিত সেই আদর্শবোধ। বাল্যজীবনের কতকগুলি ঘটনা হইতে কয়েকটি ধারণা তাহার বদ্ধমূল হইয়া আছে। বারংবার নিরপেক্ষ বিচার-বুদ্ধি-শাণিত যুক্তির আঘাত দিয়াও সেধারণাগুলি আজও তাহার খণ্ডিত হয় নাই।
জমিদারকে, ধনী মহাজনকে সে ঘৃণা করে। তাহাদের প্রতিটি কর্মের মধ্যে অন্যায়ের সন্ধান করা যেন তাহার স্বভাবের মধ্যে দাঁড়াইয়া গিয়াছে। তাহাদের অতি-উদার দান-ধ্যান-ধর্মকর্মকেও সে মনে করে কোনো গুপ্ত গো-বধের স্বেচ্ছাবৃত চান্দ্ৰায়ণ প্ৰায়শ্চিত্ত বলিয়া। তাহার অবশ্য কারণ আছে।
তাহার বাল্যকালে একবার জমিদারবাবুরা বাকি খাজনা আদায়ের জন্য তাহার বাবাকে সমস্ত দিন কাছারিতে আটক রাখিয়াছিল। আতঙ্কিত দেবু তিনবার বাবুদের কাছারিতে গিয়া। দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া শুধু কাঁদিয়াছিল; দুইবার চাপরাশীর ধমক খাইয়া পলাইয়া আসিয়াছিল। শেষবার বাবু তাহাকে দেখিয়া বলিয়াছিল—এবার যদি আসবি ছোঁড়া, তবে কয়েদখানায় বন্ধ করে রেখে দেব। চাপরাসীটা তাহাকে টানিয়া আনিয়া একটা অন্ধকার ঘরও দেখাইয়া দিয়াছিল। বাবুদের অবশ্য কয়েদখানার জন্য স্বৰ্গধাম কি বৈকুণ্ঠজাতীয় কোনো মহল বা ঘর কোনোদিনই ছিল না। নিতান্তই ছোট জমিদার তাহারা, দেবুকে নিছক ভয় দেখাইবার জন্য ও-কথাটা বলা হইয়াছিল—সেটা দেবু আজ বোঝে। কিন্তু জমিদার অত্যাচারী—এ ধারণা তাহাতে একবিন্দু ক্ষুণ্ণ হয় নাই।
