ছি বলিল, বেশ বেশ! দশের কাজ সেরেই আসুন। ঠাকুর! আমি একবার তাগাদা দিয়ে গেলাম। তারপর ছিরু তাহার প্রকাণ্ড বিশ্রী মুখখানাকে যথাসাধ্য কোমল এবং বিনীত করিয়া বলিল,ডাক্তার, একবার যাবেন গো দয়া করে। দেবু খুড়ো দেখেশুনে দিয়ে এস বাবা–
কথাটা তাহার শেষ হইল না, অনিরুদ্ধের প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ চিৎকারে চণ্ডীমণ্ডপটা যেন অতর্কিতে চমকিয়া উঠিল।
–কে? কে? কার ঘাড়ে দশটা মাথা? কোন্ নবাব-বাদশা আমার পুজো বন্ধ করেছে শুনি? অনিরুদ্ধের সে মূৰ্তি যেন রুদ্ৰ-মূর্তি।
চক্রবর্তী হতভম্ব হইয়া গেল, দেবনাথ সোজা হইয়া পাঁড়াইল, জগন ডাক্তার বিজ্ঞ সান্ত্বনাদাতার মত একটু আগাইয়া আসিল; ছিরু পাল যথাস্থানে অচঞ্চল স্থিরভাবেই দাঁড়াইয়া রহিল।
ডাক্তার বলিলথাম, খাম, চিৎকার করিস না অনিরুদ্ধ!
ব্যঙ্গভরা ঘৃণিত দৃষ্টিতে চকিতে একবার ছিরু পাল হইতে ডাক্তার পর্যন্ত সকলের দিকে চাহিয়া অনিরুদ্ধ মন্দিরের দাওয়া হইতে পদ্মের পরিত্যক্ত পূজার পাত্রটা তুলিয়া লইল। পাত্রটা দুই হাতে খানিকটা উপরে তুলিয়া যেন দেবতাকে দেখাইয়া বলিল, হে বাবা শিব, হে মা কালী—খাও বাবা, খাও মা খাও! আর বিচার কর, তোমরা বিচার কর, তোমরা বিচার কর। বলিয়াই সে ফিরিল।
ডাক্তারের চোখ দিয়া যেন আগুন বাহির হইতেছিল, কিন্তু অনিরুদ্ধকে ধরিয়া নির্যাতন করিবার কোনো উপায় ছিল না।
অনিরুদ্ধ খানিকটা গিয়াই কিন্তু ফিরিল, এবং দক্ষিণার পয়সা কয়টা ট্যাকে গুঁজিয়া দেখিল দেবু ঘোষ ও জগন ডাক্তারের অল্প দূরে তখনও দাঁড়াইয়া আছে ছিরু পাল। তাহার ক্রোধ মুহূর্তে যেন উন্মত্ততায় পরিণত হইয়া গেল। সে চিৎকার করিয়া উঠিল, বড়লোকের মাথায় আমি ঝাড়ু মারি, আমি কোনো শালাকে মানি না, গ্ৰাহ্য করি না। দেখিকোন্ শালা আমার কি করতে পারে!
মুহূর্তের জন্য সে ছিরুর দিকে ফিরিয়া যেন তাহাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করিয়া বুক ফুলাইয়া দাঁড়াইল।
খোঁড়া পুরোহিত ও মোড়ল পিসি একটা বিপর্যয় আশঙ্কা করিয়া শিহরিয়া উঠিল। ইহার পরই অনিরুদ্ধের উপর ছিরু পালের বাঘের মত লাফাইয়া পড়ার কথা; কিন্তু আশ্চর্য, ছিরু পাল। আজ হাসিয়া অনিরুদ্ধকে বলিল—আমাকে মিছিমিছি জড়াচ্ছ, কর্মকার, আমি এসবের মধ্যে নাই। আমি এসেছিলাম পুরুত ডাকতে।
অনিরুদ্ধ আর দাঁড়াইল না, যেমন হনহন করিয়া আসিয়াছিল, তেমনি হনহন করিয়া চলিয়া গেল। যাইতে যাইতেও সে বলিতেছিল—সব শালাকে আমি জানি। ধার্মিক রাতারাতি সব ধার্মিক হয়ে উঠেছে।
ছিরু অবিচলিত ধৈর্যে স্থির প্রশান্তভাবেই চণ্ডীমণ্ডপ হইতে নামিয়া বাড়ির পথ ধরিল। ছিরু র চরিত্রের এই একটি বৈশিষ্ট্য। যখন সে ইষ্ট স্মরণ করে, কোনো ধর্ম-কর্ম বা পূজ-পার্বণে রত থাকে—সে তখন স্বতন্ত্র মানুষ হইয়া যায়। সেদিন সে কাহারও সহিত বিরোধ করে না, কাহারও অনিষ্ট করে না, পৃথিবী ও বস্তুবিষয়ক সমস্ত কিছুর সহিত সংস্রবহীন হইয়া এক ভিন্ন জগতের মানুষ হইয়া ওঠে। অবশ্য সমগ্র হিন্দুসমাজের জীবনই আজ এমনি দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া গিয়াছে; কর্মজীবন এবং ধর্মজীবন একেবারে স্বতন্ত্র-দুইটার মধ্যে যেন কোনো সম্বন্ধ নাই। ইষ্ট স্মরণ করিতে করিতে যাহার চোখে অকপট অশ্রু উপাত হয়, সেই মানুষই ইষ্ট-স্মরণ-শেষে চোখের জল মুছিতে মুছিতে বিষয়ের আসনে বসিয়া জাল-জালিয়াতি শুরু করে। শুধু হিন্দু সমাজই বা কেন? পৃথিবীর সকল দেশে—সকল সমাজেই জীবন-ধারা অল্পবিস্তর এমনই দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া গিয়াছে। পৃথিবীর কথা থাকুক, ছিরু র জীবনে এই বিভাগটা বড় প্রকট অতি মাত্রায় পরিস্ফুট। আজিকার ছিরু স্বতন্ত্র, এই ছিকু যে কেমন করিয়া ব্যভিচারী পাষণ্ড ছিরুর প্রচণ্ড ভার ঠেলিয়া দেবপূজাকে উপলক্ষ করিয়া বাহির হইয়া আসে–সে অতি বিচিত্র সংঘটন। পাষণ্ড ছিরু র অন্যায় বা পাপে কোনো ভয় নাই, দেবসেবক ছিরও সে পাপ খণ্ডনের জন্য কোনো ব্যগ্রতা নাই। আছে কেবল পরমলোক-প্রাপ্তির জন্য একটি নিষ্ঠাভরা তপস্যা এবং অকপট বিশ্বাস। দিন ও রাত্রির মত পরস্পরের সঙ্গে এই দুই বিরোধী ছিরুর কখনও মুখোমুখি দেখা হয় না, কিন্তু কোনো বিরোধও নাই। তবে ছিরু র দিবাভাগগুলি অর্থাৎ জীবনের আলোকিত অংশটুকু শীতমণ্ডলের শীতের দিনের মত–অতি সংক্ষিপ্ত তাহার আয়ু।
আজ কিন্তু আরও একটু নূতনত্ব ছিল ছিরু র ব্যবহারে। আজিকার কথাগুলি শুধু মিষ্টই নয়–খানিকটা অভিজাতজনোচিত, ভদ্র এবং সাধু। বিগত কালের দেবসেবক ছিরু হইতেও আজিকার দেবসেবক ছিরু আরও স্বতন্ত্র, আরও নূতন। উত্তেজনার মুখে সেটা কেহ লক্ষ্য করিল না।
কিছুক্ষণ পরই চণ্ডীমণ্ডপের সামনের রাস্তা দিয়া বাউরি, ডোম, মুচিদের একপাল ছেলেমেয়েরা সারি বাঁধিয়া কোথাও যাইতেছিল। কাহারও হাতে থালা, কাহারও হাতে গেলাস, কাহারও হাতে কোনো রকমের একটা পাত্র। জগন ডাক্তার প্রশ্ন করিল—কোথায় যাবি রে সব দল বেঁধে?
–আজ্ঞে, ঘোষ মহাশয়ের বাড়ি গো, অন্নপুন্নোর পেসাদ নিতে ডেকেছেন।
–কে? ঘোষটা আবার কে? ছিঃ ছিরে পাল সে আবার ঘোষ হল কবে থেকে?
অশালীন ভাষায় হিরুকে কয়টা গাল দিয়া ডাক্তার বলিলওঃ, বেজায় সাধু মাতর হয়ে উঠল দেখছি।
দেবু স্তব্ধ হইয়া ভাবিতেছিল।
১১. নবান্নের ঘটনা
দেবু স্তব্ধ হইয়া ভাবিতেছিল অনেক কথা। ওই নবান্নের ঘটনার বেশ কয়েকদিন পর।
