অর্থাৎ ওই ঘোড়াটা। ঘোড়াটা পিছনের পা ঘঁড়িলে প্লীহা ফাটিয়া যাইবে। খোঁড়া চক্রবর্তী গ্রাম-গ্রামান্তরে ওই ঘোড়ার সওয়ার হইয়া যজমান সাধিয়া ফেরে। ফিরিবার সময় ঘোড়ার উপর থাকে সেতাহার মাথায় থাকে চাল-কলা ইত্যাদির বোঝা। ঘোড়া খুব শিক্ষিত, চক্রবর্তী প্রায়ই লাগাম না ধরিয়া দুই হাতে বোঝা ধরিয়া অনায়াসে চলে, অবশ্য ইচ্ছা করিলে চক্রবর্তী মাটিতে পা নামাইয়া দিতে পারে। মাটি হইতে বড়জোর ফুটখানেক উপরে তাহার পা দুইটা ঝুলিতে ঝুলিতে যায়।
ছেলেদের কতকগুলো দূর হইতে ঢেলা ছুড়িয়া ঘোড়াটাকে ক্রমাগত মারিতেছিল। কতকগুলো অতিসাহসী গাছের ডাল লইয়া পিছন দিক হইতে পিটিতেছিল। পুরোহিত ভয়ানক চটিয়া উঠিয়াছিল। কিন্তু কোনো উপায় সে খুঁজিয়া পাইতেছিল না। ছেলেগুলো যেন তাহার কথা কানেই তুলিবে না বলিয়াই একজোট হইয়াছে। একটি প্রৌঢ়া বিধবা ভোগের সামগ্রী লইয়া আসিয়াছিল—সেই পুরোহিতের উপায় করিয়া দিল; সে বলিল—এ্যাঁ, তোরা ওই ঘোড়াটাকে ছুঁলি? বলি-ওরে ও মেলেচ্ছার দল! যা, আবার সব চান করগে যা।
পুরোহিত বলিল দেখ বাছা দেখ, বজ্জাত ছেলেদের কাণ্ড দেখ। চাঁট ছেড়ে তো পিলে ফাটিয়ে দেবে। তখন নাম-দোষ হবে আমার!
বিধবা কিন্তু এ কথাটা মানিল না, সে বলিল,-ও-কথা আর বোলোনা ঠাকুর। ওই ছাগলের মত ঘোড়াও নাকি পিলে ফাটিয়ে দেবে? তুমিও যেমন। ছেলেদের বলছি কেন, তোমারও তো বাপু আচার-বিচার কিছু নাই। সামনের দুটো পায়ে বেঁধে ছেড়ে দাও, রাজ্যের অ্যাঁস্তাকুড়, পাতা, ময়লা মাড়িয়ে চলে বেড়ায়। সেদিন আমাদের গায়ে এসে নতুন পুকুরের পাড়ে-মা-গোঃ, মনে করলেও বমি আসে-চান করতে হয়—সেইখানে দেখি ঘাস খাচ্ছে। আর তুমি ওই ঘোড়াতে চেপে এসে দেবতার পুজো কর?
পুরোহিত বলিল,-গঙ্গাজল দি মোড়ল পিসি, রোজ সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরলে গঙ্গাজল দিয়ে তবে ওরে ঘরে বাধি। আমি তো গঙ্গাজল-স্পৰ্শ করিই।
—ও সব মিছে কথা।
—ঈশ্বরের দিব্যি। পৈতে ছুঁয়ে বলছি আমি। গঙ্গাজল না দিলে ও বাড়ি ঢোকে না। বাইরে দাঁড়িয়ে মাটিতে পা ঠুকবে আর চিহি চিঁহি করে চেঁচাবে।
মোড়ল পিসি কি বলিতে গিয়া শশব্যস্ত হইয়া সম্মুখের দিকে খানিকটা সরিয়া গিয়া ফিরিয়া দাঁড়াইল—কে লা? হনহন করে আসছে দেখা—পিছন দিক হইতে কোনো আগন্তুকের দীর্ঘস্থায় মাথাটা তাহার পায়ের উপর পড়িতেই মোড়ল পিসি সংস্পর্শের ভয়ে সরিয়া গিয়া প্রশ্ন করিল কে?
একটি বধূ দীর্ঘাঙ্গী,অবগুণ্ঠনাবৃত মুখ; সে উত্তর করিল না, নীরবে ভোগসামগ্রীর পাত্ৰখানি পুরোহিতের হাতের সম্মুখে নামাইয়া দিল।
—অ! কামার-বউ! আমি বলি কে-না-কে!
এই মুহূর্তেই ডাক্তার ও পণ্ডিত আসিয়া চণ্ডীমণ্ডপে প্রবেশ করিল। দেবনাথ বিনা ভূমিকায় বলিল—ঠাকুর, কামারের পুজো গাঁয়ের শামিলে আপনি করবেন না, সে হতে আমরা দেব না।
জগন ও দেবু এই সুযোগটিরই প্রতীক্ষা করিয়া নিকটেই কোথাও দাঁড়াইয়া ছিল, পদ্মকে চণ্ডীমণ্ডপে প্রবেশ করিতে দেখিয়া সঙ্গে সঙ্গে তাহারাও আসিয়া হাজির হইয়াছে।
ঠাকুর কিছুক্ষণ পণ্ডিতের মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া প্রশ্ন করিল—সে আবার কি রকম? গাঁ-শামিলে পুজো না হলে কি করে পুজো হবে?
—সে আমরা জানি না, কর্মকার বুঝে করবে। সে যখন গাঁয়ের নিয়ম লঙ্ঘন করেছে, তখন আমরাই বা গাঁয়ের শামিলে ক্রিয়াকর্মে নোব কেন?
পদ্ম তেমনি অবগুণ্ঠনে মুখ ঢাকিয়া স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল, এতটুকু চাঞ্চল্য দেখা গেল না। ঠাকুর তাহার দিকে চাহিয়া নিতান্ত নিরুপায়ভাবে বলিলতা হলে আর আমি কি করব মা!
দেবনাথ পদ্মকে লক্ষ্য করিয়া বলিল-পুজো তুমি ফিরিয়ে নিয়ে যাও, বল গে কর্মকারকে, পুজো দিতে দিলে না গায়ের লোক।
পদ্ম এবার ধীরে ধীরে চলিয়া গেল, কিন্তু পুজোর পাত্ৰ তুলিয়া লইয়া গেল না, সেটা এবং দক্ষিণার পয়সা সেখানেই পড়িয়া রহিল।
পুরোহিত বিব্রত হইয়া বলিল–ওগো ও বাছা, পুজোর ঠাঁইটা নিয়ে যাও! ও বাছা, ও কামার-বউ।
দেবু আবার বলিল—থাক না। কামার এখুনি তো আসবেই। যা হোক একটা মীমাংসা আজ হবেই।দেবু ঘোষের গোপনতম অন্তরে কর্মকারের উপর একটু সহানুভূতি এখনও আছে; অনিরুদ্ধ তাহার সহপাঠী, তা ছাড়া, অন্যায় অনিরুদ্ধেরই একার নয় এবং অনিরুদ্ধই প্রথমে অন্যায় করে নাই। গ্রামের লোকই অন্যায় করিয়াছে প্রথম। সে কথাটাও তাহার মনে কাটার মত বিধিতেছিল।
পুরোহিত ব্যাপারটা ভাল বুঝিতে পারে নাই, বুঝিবার ব্যগ্রতাও তাহার ছিল না। উপস্থিত এক বাড়ির আতপতঙ্গুল দুধ-মণ্ডা প্রভৃতি পুজোর সামগ্রী বাদ পড়িয়া যাইতেছে—সেই চিন্তাটাই তাহার বড়। ভ্রূ কুঞ্চিত হইয়া উঠিল। বলিল,—বলি ওহে ডাক্তার, ও পণ্ডিত
জগন বাধা দিয়া দৃঢ় আদেশের ভঙ্গিতে তাহাকে বলিল—গিরিশ ছুতোর তারা নাপিত এদের পুজোও হবে না ঠাকুর, বলে রাখছি আপনাকে। আমরা অবিশ্যি একজন-না-একজন শেষ পর্যন্ত থাকব, তবে যদি না থাকিসেজন্যে আগে থেকে বলে রাখছি আপনাকে।
ঠিক এই সময়ে ছিরু পাল আসিয়া ডাকিল—ঠাকুর!—ছিরুর পরনে আজ গরদের কাপড়, গায়ে একখানি রেশমি চাদর; ভাবে-ভঙ্গিতে ছিরু পাল আজ একটি স্বতন্ত্র মানুষ।
পুরোহিত চক্রবর্তী ব্যস্ত হইয়া বলিল—এই যাই বাবা। আর বড়জোর আধ ঘণ্টা। ও পণ্ডিত, ও ডাক্তার, কই হে সব আসছে না কেন?
গম্ভীরভাবে জগন ডাক্তার বলিল—এত তাড়াতাড়ি করলে তো হবে না ঠাকুর। আসছে সব, একে একে আসছে। একঘর যজমানের জন্য দশজনকে ব্যতিব্যস্ত করতে গেলে তো চলবে না।
