তাহার পায়ের ধূলা লইয়া একজন বলিল,-আজ্ঞে দেখেন দেখি, তাই কি পারি? তারপর রহস্য করিয়া ব্যাপারটা লঘু করিয়া দিবার অভিপ্ৰায়েই সাধ্যমত বুদ্ধি খরচ করিয়া সে বলিল, মা আমাদের ক্ষ্যাপা মা গো! রাগলে আর রক্ষে নাই।
শ্ৰীহরি উত্তর দিল না। সে আপন মনেই চিন্তা করিতেছিল, ওই মা হারামজাদীই কিছু করিতে দিবে না। তাহার আজিকার পরিকল্পনা কার্যে পরিণত করিতে এত টাকা খরচ করিলে এই হারামজাদী নিশ্চয়ই একটা বীভৎস কাও করিয়া তুলিবে। আজ পর্যন্ত বড় কাঠের সিন্দুকটার চাবি ওই বেটী বুকে অ্যাঁকড়াইয়া ধরিয়া আছে। টাকা বাহির করিতে গেলেই বিপদ বাধিবে। টাকার জন্য অবশ্য কোনো ভাবনা নাই; কয়েকটা বড় বড় খাতকের কাছে সুদ আদায় করিলেই ওই কাজ কয়টা হইয়া যাইবে।
হ্যাঁ, তাই সে করিবে।
আজিকার এই ক্ষুদ্র ঘটনাটি যেন বটবৃক্ষের অতিক্ষুদ্র একটি বীজকণার সঙ্গে তুলনীয়। কিন্তু সেই এক কণার মধ্যেই লুকাইয়া আছে এক বিরাট মহীরুহের সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনার প্রারম্ভেই শ্ৰীহরি যেন তাহার এতকালের বদ্ধ-অন্ধকার দুর্গন্ধময় জীবন-সৌধের প্রতিটি কক্ষে দেহের প্রতিটি গ্রন্থিতে প্রতিটি সন্ধিতে এক বিচিত্র স্পন্দন অনুভব করিতেছে। সৌধখানি বোধহয় ফাটিয়া চৌচির হইয়া যাইবে।
১০. ভূপাল চৌকিদার
ভূপাল চৌকিদার ইউনিয়ন বোর্ডের মোহর-দেওয়া একখানা নোটিশ হাতে করিয়া চলিয়াছিল, আগে আগে ড়ুগড়ুগ শব্দে ঢোল বাজাইয়া চলিতেছিল পাতু।
এক সপ্তাহের মধ্যে আষাঢ় আশ্বিন-দুই কিস্তির বাকি ট্যাক্স আদায় না দিলে জরিমানাসমেত দেড়গুণ ট্যাক্স অস্থাবর ক্রোক করিয়া আদায় করা হইবেক।
জগন ডাক্তার একেবারে আগুনের মত জ্বলিয়া উঠিল।
–কি? কি? কি করা হইবেক?
ভূপাল সভয়ে হাতের নোটিশখানি আগাইয়া দিয়া বলিল—আজ্ঞে, এই দেখেন কেনে।
জগন কঠিন দৃষ্টিতে ভূপালের দিকে চাহিয়া বলিল,—সরকারি উর্দি গায়ে দিয়ে মাথা নোয়াতেও ভুলে গেলি যে!
অপ্রস্তুত হইয়া ভূপাল তাড়াতাড়ি ডাক্তারের পায়ের ধুলা কপালে মুখে লইয়া বলিল, আজ্ঞে দেখেন দেখি, তাই ভোলে! আপনকারাই আমাদের মা-বাপ।
পাতু বলিল—লিচ্চয়!
জগন নোটিশখানা দেখিয়া একেবারে গর্জন করিয়া উঠিল—এয়ার্কি নাকি? এ সব কি পৈতৃক জমিদারি পেয়েছে সব! লোকের মাঠের ধান মাঠে রইল, বাবুরা একেবারে অস্থাবরের নোটিশ বার করে দিলেন! মানুষকে উৎখাত করে ট্যাক্স আদায় করতে বলেছে গবর্নমেন্ট? আজই দরখাস্ত করব আমি।
ভূপাল হাত জোড় করিয়া বলিল-আজ্ঞে, আমরা চাকর, আমাদিগে যেমন বলেছে। তেমনি–
—তোদের দোষ কি? তোরা কি করব? তেরা ঢোল দিয়ে যা।
পাতু ঢোলটায় গোটাকয়েক কাঠির আঘাত করিয়া বলিল-আজ্ঞে ডাক্তারবাবু, লবান্ন হবে বাইশে তারিখ।
–নবান্ন? বাইশে?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
—আর সব লোককে বল গিয়ে। গায়ের লাকের সঙ্গে আমার কোনো সম্বন্ধ নাই। আমি নবান্ন করব আমার যেদিন খুশি।
পাতু আর কোনো উত্তর না দিয়া পথে অগ্রসর হইল। ডাক্তার ক্রুদ্ধ গাম্ভীর্যে থমথমে মুখে তাহার দিকে চাহিয়া বলিল—এই পেতো শোন।
আজ্ঞে? পাতু ঘুরিয়া পাঁড়াইল। জগন বলিল চলে যাচ্ছিস যে? পাতু আবার বলিল-আজ্ঞে?
ডাক্তার এবার কথা খুঁজিয়া না পাইয়া বলিল—সেদিন দরখাস্তে টিপসই দিতে এলি না যে বড়? খুব বড়লোক হয়েছিস, না? শহরে গিয়ে বাড়ি করবি, এ গায়েই আর থাকবি না শুনছি!
বিরক্তিতে পিতুর ভ্রূ কুঁচকাইয়া উঠিল। কিন্তু কোনো উত্তর দিল না। ডাক্তার ঘরে ঢুকিয়া দরখাস্তখানা বাহির করিয়া আনিয়া সস্নেহে শাসনের সুরে বলিল—দে, টিপছাপ দে। তোর জন্যেই আমি ছাড়ি নাই দরখাস্ত।
পাতু এবার বিনা আপত্তিতেই টিপছাপ দিল। সেদিন যে সে আসে নাই, সমস্ত দিনটাই গ্রামত্যাগের সঙ্কল্প লইয়া জংশন শহর পর্যন্ত ঘুরিয়া আসিয়াছে—সে সমস্তই সাময়িক একটা উত্তেজনার বশে। আজও যে সে মুহূর্ত-পূর্বে ডাক্তারের কথায় কুঞ্চিত করিয়াছে—সেও ডাক্তারের কথার কটুত্বের জন্য। নতুবা সাহায্য বা ভিক্ষা লইতে তাহার আপত্তি নাই। গভীর কৃতজ্ঞতার সহিতই সে টিপছাপ দিল। টিপছাপ দিয়া বুড়া আঙুলের কালি মাথায় মুছিতে মুছিতে কৃতজ্ঞভাবে আবার হাসিয়া বলিল,—ডাক্তারবাবুর মত গরিবগুর্বোর উপকার কেউ করে না।
ডাক্তারের জুতার ধুলা আঙুলের ডগায় লইয়া তাহা ঠোঁটে ও মাথায় বুলাইয়া লইল। ভূপাল চৌকিদারও তাহার অনুসরণ করিল।
ডাক্তার ইহার মধ্যে কিছু চিন্তা করিতেছিল, চিন্তা-শেষে বার দুই ঘাড় নাড়িয়া বলিল–দাঁড়া। আরও একটা টিপছাপ দিয়ে যা।
–আজ্ঞে? পাতু সভয়ে প্রশ্ন করিল। অর্থাৎ, আবার কেন? টিপছাপকে ইহাদের বড় ভয়!
–এই ট্যাক্স আদায়ের বিরুদ্ধে একটা দরখাস্ত দোব। তোদের ঘর পুড়ে গিয়েছে, চাষীদের ধান এখনও মাঠে, এই অসময় অস্থাবরের নোটিশ, এ কি মগের মুলুক নাকি?
এবার ভয়ে পাতুর মুখ শুকাইয়া গেল। ইউনিয়ন বোর্ডের হাকিমের বিরুদ্ধে দরখাস্ত! সে ভূপাল চৌকিদারের দিকে চাহিল ভূপালও বিব্রত হইয়া উঠিয়াছে। ডাক্তার তাগিদ দিয়া বলিল—দে, টিপছাপ দে!
-আজ্ঞে না মশায়। উ আমি দিতে পারব। পাতু এবার হনহন করিয়া পথ চলিতে আরম্ভ করিল। পিছনে পিছনে ভূপাল পলাইয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। ভূপাল ভাবিতেছিল—খবরটা আবার পেসিডেন বাবুকে দিয়া দিতে হইবে। নহিলে হয়ত সন্দেহ আসিবে তাহারও ইহার সহিত যোগসাজশ আছে।
ডাক্তার ভীষণ ক্রুদ্ধ হইয়া পলায়নপর পাতু ও ভূপালের দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। কয়েক মুহূর্ত পরেই সে ফাটিয়া পড়িল-হারামজাদার জাত, তোদের উপকার যে করে সে গাধা!
