বোধ করি যে তাহাকে কিছু বলিবে তাহাকে সে পূর্ব হইতেই ধমকটা দিয়া রাখিল। আসলে সে তাহার মনেই ওই অবাধ্য স্মৃতি উদ্ভূত সঙ্কোচকে একটা ধমক দিল।
রাখালটা মনিবকে যমের মত ভয় করে। ছিরু আসিয়া দাঁড়াইতেই সে ভাবিল আজিকার গরহাজিরের জন্যই পাল তাহার ঘাড় ধরিয়া লইয়া যাইতে আসিয়াছে। ছেলেটা ড়ুকরিয়া কাঁদিয়া উঠিল—ঘর পুরে গেইছে মশাই—তাতেই–
পুড়িয়া যাওয়ার পর এই গরিব পাড়াটার অবস্থা স্বচক্ষে দেখিয়া শ্ৰীহরি মনে মনে খানিকটা লজ্জাবোধ না করিয়া পারিল না। সে সস্নেহে ছেলেটাকে বলিলতা কাঁদিস কেনে? দৈবের ওপর তো হাত নাই। কি করবি বল? কেউ তো আর লাগিয়ে দেয় নাই।
রাখালটার বাপ বলিলতা কে আর দেবে মশাই? কেনেই বা দেবে? আমরা কার কি করেছি বলেন যে ঘরে আগুন দেবে!
শ্ৰীহরি চুপ করিয়াই পোড়া ঘরগুলার দিকেই চাহিয়া রহিল। তাহার পায়ের তলার মাটি যেন সরিয়া যাইতেছে।
রাখালটার বাপ আবার বলিল—ছোটনোকদের কাণ্ড, শুকনো পাতাতে আগুন ধরে গেইছে আর কি! আর তা ছাড়া মশাই, বিধেতাই আমাদের কপালে আগুন লাগিয়ে রেখেছে।
শুষ্ককণ্ঠে শ্রীহরি বলিল, এক কাজ কর। যা খড় লাগে আমার বাড়ি থেকে নিয়ে আয়। বাঁশ কাঠ যা লাগে নিবি আমার কাছে; ঘর তুলে ফেল।তারপর রাখালটার দিকে চাহিয়া বলিল–বাড়িতে গিয়ে চাল নিয়ে আয় দশ সের। কাল বরং ধান নিবি, বুঝলি!
রাখালটার বাপ এবার শ্ৰীহরির পায়ে একরকম গড়াইয়া পড়িল।
ইহারই মধ্যে আরও জনদুয়েক আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল; একজন হাত জোড় করিয়া বলিল আমাদিগে যদি কিছু করে ধান দিতেন ঘোষমশায়।
—ধান?
–আজ্ঞে, তা না হলে তো উপোস করে মরতে হবে মশায়।
–আচ্ছা, পাঁচ সের করে চাল আজ ঘরপিছু আমি দেব। সে আর শোধ দিতে হবে না। আর ধানও অল্প অল্প দোব কাল। কাল বার আছে ধানের। আর–
–আজ্ঞে—
–দশ গণ্ডা করে খড়ও আমি দোব প্রত্যেককে। বলে দিস পাড়াতে।
–জয় হবে মশায়, আপনার জয়জয়কার হবে। ধনে-পুতে লক্ষ্মীলাভ হবে আপনার।
শ্ৰীহরির দাক্ষিণ্যে অভিভূত হইয়া লোকটা ছুটিয়া চলিয়া গেল পাড়ার ভিতর। সংবাদটা সে প্রত্যেকের ঘরে প্রচার করিবার জন্য অস্থির হইয়া উঠিয়াছে।
দরিদ্র অশিক্ষিত মানুষগুলি যেমন শ্ৰীহরির দাক্ষিণ্যে অভিভূত হইয়া গেল শ্ৰীহরিও তেমনি অভিভূত হইয়া গেল ইহাদের কৃতজ্ঞতার সরল অকপট গদগদ প্রকাশে। এক মুহূর্তে ও সামান্য দানের ভারে মানুষগুলি পায়ের তলায় লুটাইয়া পড়িয়াছে। বিশেষ করিয়া শ্ৰীহরির মনে হইল—যে-অপরাধ সে গত রাত্রে করিয়াছে, সে-অপরাধ যেন উহাদেরই ওই কৃতজ্ঞতায় সজল চোখের অশ্ৰু-প্রবাহে উহারা ধুইয়া মুছিয়া দিতে চাহিতেছে। ভাবাবেগে শ্রীহরিরও কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হইয়া আসিয়াছিল; সে বলিল—যাস, সব যাস। চাল-খড়-ধান নিয়ে আসবি।
অনেকখানি লঘু পবিত্ৰ চিত্ত লইয়া সে বাড়ি ফিরিয়া আসিল।
বাড়ি ফিরিবার পথে সে অনেক কল্পনা করিল।
গ্রীষ্মকালে জলের অভাবে লোকের কষ্টের আর অবধি থাকে না। পানীয় জলের জন্য মেয়েদের ওই নদীর ঘাট পর্যন্ত যাইতে হয়। যাহারা ইজ্জতের জন্য যায় না তাহারা খায় পচা পুকুরের দুর্গন্ধময় কাদা-ঘোলা জল। এবার একটা কুয়া সে কাটাইয়া দিবে।
গ্রামের পাঠশালার আসবাবের জন্য সেবার লোকের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষাতে পাঁচটা টাকাও সংগৃহীত হয় নাই; সে পঞ্চাশ টাকা পাঠশালার আসবাবের জন্য দান করিবে।
আরও অনেক কিছু। গ্রামের পথটা কাকর ঢালিয়া পাকা করিয়া দিবে। চণ্ডীমণ্ডপটার মাটির মেঝেটা বাঁধাইয়া দিবে : সিমেন্ট-করা মেঝের উপর খুদিয়া লিখিয়া দিবে—শ্ৰীচরণাশ্রিত শ্ৰীহরি ঘোষ। যেমন কঙ্কণার চণ্ডীতলায় মার্বেলবাঁধানো বারান্দার মেঝের উপর সাদা মার্বেলের মধ্যে। কালো হরফে লেখা আছে কঙ্কণার বাবুদের নাম।
সে কল্পনা করে, অতঃপর গ্রামের লোক সসম্ভ্ৰমে সকৃতজ্ঞচিত্তে মহাশয় ব্যক্তি বলিয়া নমস্কার করিয়া তাহাকে পথ ছাড়িয়া দিতেছে।
আজ নূতন একটা অভিজ্ঞতা লাভের ফলে শ্রীহরির অন্তরে এক নূতন মন কোন্ অজ্ঞাত। নিক্ষিপ্ত বীজের অঙ্কুর-শীর্ষের মত মাথা ঠেলিয়া জাগিয়া উঠিল। কল্পনা করিতে করিতে সে গ্রামের মাঠে কিছুক্ষণ ঘুরিয়া বেড়াইল। যখন বাড়ি ফিরিল তখন বেলা প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে। আসিয়াই দেখিল, বাড়ির দুয়ারে দাঁড়াইয়া আছে ওই দরিদ্রের দলটি নিতান্ত অপরাধীর মত। আর তাহার মা নির্মম কটু ভাষায় গালিগালাজ করিতেছে। শুধু ওই হতভাগ্যদিগকেই নয়—শ্ৰীহরির ওপরেও গালিগালাজ বর্ষণ করিতে মায়ের কার্পণ্য ছিল না। ক্রুদ্ধচিত্তেই সে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করিল। মা তাহাকে দেখিয়া দ্বিগুণবেগে জ্বলিয়া উঠিয়া গালিগালাজ আরম্ভ করিল—ওরে ও হতচ্ছাড়া বাঁশবুকো বলি দাতাকৰ্ণ-সেন হলি কবে থেকে? ওই যে পঙ্গপাল এসে দাঁড়িয়েছে, বলছে তুই ডেকে এনেছিস–
শ্ৰীহরির নগ্ন-প্রকৃতির একটা অতি নিষ্ঠুর ভঙ্গি আছে; তখন সে চিৎকার করে না, নীরবে। ভয়াবহ মুখভঙ্গি লইয়া অতি স্থিরভাবে মানুষকে বা পশুকে নির্যাতন করে যেমন শীতের স্বচ্ছ জল মানুষের হাত-পা হিম করিয়া জমাইয়া দিয়া শ্বাসরুদ্ধ করিয়া হত্যা করে। সেই ভঙ্গিতে সে অগ্রসর হইয়া আসিতেই তাহার মা দ্রুতপদে খিড়কির দরজা দিয়া পলাইয়া গেল।
শ্ৰীহরি নিজেই নীরবে প্রত্যেককে চাল দিয়া বলিলখড় আর ধান কাল নিবি সব। সর্বশেষে বলিল-মায়ের কথায় তোরা কিছু মনে করিস না যেন, বুঝলি?
