বলিয়াই সে দরখাস্তখানা ছিঁড়িয়া ফেলিবার উপক্রম করিল।
—ছিঁড়ো না, ডাক্তার ছিড়ড়া না।-বাধা দিল পাঠশালার পণ্ডিত দেবু ঘোষ। সে কিছুদূরে দাঁড়াইয়া সবই দেখিয়াছিল। এসব ব্যাপারে তাহারও আন্তরিক সহানুভূতি আছে।
দেবু ঘোষ একটু বিচিত্র ধরনের মানুষ। এ গ্রামের পাঁচজনের একজন হইয়াও সে যেন সকল হইতে একটু পৃথক। তাহার মতামতগুলিও সাধারণ মানুষ হইতে পৃথক। আপনাদের দুর্দশার প্রতিকারের জন্য কাহারও সাহায্যভিক্ষা করিতে চায় না। অনিরুদ্ধকে, হিরুকে শাসন করিতে জমিদারের দ্বারস্থ হইতে সে নারাজ। কিন্তু পঞ্চায়েতী মজলিসের আয়োজনে সে-ই প্রধান উদ্যোক্তা। তবু আজ সে জগন ডাক্তারকে দরখাস্ত ছিঁড়িতে বাধা দিল।
ডাক্তার দেবনাথের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল—ছিড়তে বারণ করছ? ওই বেটাদের উপকার করতে বলছ? দেখলে তো সব!
দেবু হাসিয়া বলিলতা দেখলাম! ওদের ওপর রাগ করে কি করবে বল! দাও, তোমার ট্যাক্সের দরখাস্ত, আমি সই করছি, আর দশজনার সইও যোগাড় করে দিচ্ছি।
ডাক্তার একটা বিড়ি ও দেশলাই পণ্ডিতকে দিয়া বলিল—বস। তারপর বাড়ির দিকে মুখ ফিরাইয়া চিৎকার করিয়া বলিল—মিনু, দুকাপ চা!
মিনু ডাক্তারের মেয়ে।
ডাক্তার আবার আরম্ভ করিল—লোকে ভাবে কি জান, পণ্ডিতঃ ভাবে এ সবের মধ্যে আমার বুঝি কোনো স্বাৰ্থ আছে। অন্যায় অত্যাচারের প্রতিকার হলে বাঁচবে সবাই, কিন্তু রাজা হয়ে যাব আমি!
দেবু বিড়ি ধরাইয়া দেশলাইটা ডাক্তারের হাতে দিয়া একটু হাসিয়া বলিল,—তা স্বাৰ্থ আছে বৈকি ডাক্তার।
–স্বাৰ্থ? ডাক্তার রুক্ষ অথচ বিস্মিত দৃষ্টিতে পণ্ডিতের দিকে চাহিল।
পণ্ডিত হাতের বিড়িটার আগুনের দিকে চাহিয়া হাসিতে হাসিতেই সহজভাবেই বলিল–স্বাৰ্থ আছে বৈকি! দশজনের কাছে গণ্যমান্য হবে তুমি, দুদিন বাদে ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বারও হতে পার। স্বাৰ্থ নেই? আমার মনে হয় সংসারে স্বার্থ-চিন্তা ছাড়া মানুষ টিকতেই পারে না।
ডাক্তারের কপাল কুঞ্চিত হইয়া উঠিল, বলিল-ওটাও যদি স্বার্থ হয়, তবে তো সাধুসন্ন্যাসীদের ভগবানের তপস্যা করার মধ্যেও স্বাৰ্থ আছে হে। তাহলে বশিষ্ঠ বুদ্ধদেবও স্বার্থপর!
—স্বার্থ কথাকে ছোট করে না দেখলে ও কথা নিশ্চয় সত্য। পরমার্থও তা অর্থ ছাড়া নয়। দেবু তেমনি হাসিয়াই বলিল।
ডাক্তার বলিল-ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার আমি হতে চাই, আলবৎ হতে চাই। সে হতে চাই দশজনের সেবা করবার জন্যে। পরলোক-ফরলোক জপতঙ্গ ও-সবে আমার বিশ্বাস নাই। ওই ছিরু পাল—চুরি করবে-ব্যভিচার করবে, আর ঘরে বসে জপতপ করবে—ঘটা করে কালীপুজো, অন্নপূর্ণা পুজো করবে, ওরকম ধর্মের মাথায় মারি আমি পাঁচ ঝাড়ু।
অতঃপর ডাক্তার আরম্ভ করিল এক সুদীর্ঘ বক্তৃতা। মনুষ্য-জীবন ধন্য করিতে কে না চায় এ সংসারে! কেউ মানুষের সেবা করিয়া ধন্য হইতে চায়, ইত্যাদি ইত্যাদি।
বক্তৃতার উত্তরে দেবু ঘোষও বক্তৃতা দিতে পারি, কিন্তু সে তাহা দিল না, কেবল বলিল–দশজনের ভাল করতে চাও, খুব ভাল কথা, ডাক্তার। কিন্তু গায়ের লোককে কেন ছোট ভাব তুমি? আজ বললে—গাঁয়ের লোকের সঙ্গে নবান্ন করবে না তুমি! কদিন আগে দু-দুটো মজলিস হল গায়ে তুমি তো গেলেই না, উলটে কামারকে তুমি উস্কে দিলে।
–কখনও না। গাঁয়ের লোকের বিরুদ্ধে আমি কাউকে উস্কে দিই নাই। অনিরুদ্ধের জমির ধান কেটে নিলে—আমি তাকে ছিরের নামে ডাইরি করতে বলেছি এই পর্যন্ত।
–বেশ কথা! মজলিসে গেলে না কেন?
—মজলিস? যে মজলিসে ছিরু পাল টাকার জোরে মাতব্বর—সেখানে আমি যাই না।
—তার মাতব্বরি ভেঙে দাও তুমি। মজলিসে গিয়ে আপনার জোরে ভাঙ। ঘরে বসে থাকলে তার মাতব্বরি আরও বেড়ে যাবে!
জগন এবার চুপ করিয়া রহিল।
–ভাল। গাঁয়ের লোকের সঙ্গে নবান্ন করবে না কেন তুমি?
এবার ডাক্তার কাবু হইয়া পড়িল। কিছুক্ষণ পরে বলিল—করব না এমন প্রতিজ্ঞা আমি করি নাই।
দেবু ঘোষ এবার খুশি হইয়া বলিল হাঁ! দশে মিলে করি কাজ হারিজিতি নাহি লাজ। যা করবে, দশজনে এক হয় করো। দেখ না, তিন দিনে সব ঢিট হয়ে যাবে। অনিরুদ্ধ কামার, গিরিশ ছুতোর, তারা নাপিত, পেতো মুচি—এমনকি তোমার ছিরেকেও নাকে-কানে খৎ দিয়েই ছাড়ব। তা না করে হাজারখানা দরখাস্ত করেও কিছু হবে না ডাক্তার। সংসারে একলা থাকে বাঘ সিংহ। মানুষে নয়।
ডাক্তার বলিল—বেশ। কোনো আপত্তি নাই আমার। তবে এক হতে হলে সব কাজেই এক হতে হবে। গাঁয়ের গরজের সময় জগন ডাক্তার আর দেবু পণ্ডিত; আর ইউনিয়ন বোর্ডের ভোটের সময় কঙ্কণার বাবুরা, ছিরে পাল–
বাধা দিয়ে দেবু ঘোষ বলিল—এবার তিন নম্বর ওয়ার্ড থেকে তুমি আর আমি দাঁড়াব। তা হলে হবে তো?
দেবনাথ ঘোষ দেবু পণ্ডিত একটু স্বতন্ত্র মানুষ। আপনার বুদ্ধি-বিদ্যার উপর তাহার প্রগাঢ় বিশ্বাস। তাঁহার এই বুদ্ধি সম্বন্ধে চেতনার সহিত খানিকটা কল্পনা—খানিকটা স্বার্থপরতা আছে। বিদ্যা অবশ্য বেশি নয়, কিন্তু দেবু সেইটুকুকেই লইয়া অহরহ চর্চা করে। খুঁজিয়া পাতিয়া বই যোগাড় করিয়া পড়ে; খবরের কাগজের খবরগুলো রাখে; এ ছাড়াও মহাগ্রামের ন্যায়রত্ন। মহাশয়ের পৌত্র বিশ্বনাথ এমএ ক্লাসের ছাত্র, সে তাহার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাহাকে সে অনেক বই আনিয়া দেয়। এবং মুখে মুখেও অনেক কিছু সে তাহার কাছে শিখিয়াছে। এইসব কারণে সে বেশ একটু অহঙ্কৃতও বটে। এ গ্রামে তাহার সমকক্ষ বিদ্বান ব্যক্তি কাহাকেও দেখিতে পায় না। জগন ডাক্তার পর্যন্ত তাহার তুলনায় কম শিক্ষিত। কঙ্কণার হাই স্কুলে জগন ফোর্থ ক্লাস পর্যন্ত পড়িয়া পড়া ছাড়িয়াছে; বাপের কাছে ডাক্তারি শিখিয়াছে। দেবু পড়িয়াছে ফার্স্ট ক্লাস পর্যন্ত। পড়াশুনাতে সে ভালই ছিল, পড়িলে সে যে ম্যাট্রিক পাস করিত ভালভাবেই পাস করিত এ-কথা আজও কঙ্কণার মাস্টারেরা স্বীকার করে। দেবু নিজে জানে—পড়িতে পাইলেই সে বৃত্তি লইয়া পাস করিত। তার পর আই-এ, বি-এ-দেবনাথের সে কল্পনা ছিল সুদূরপ্রসারী। ম্যাজিস্ট্রেট হইতে পারিত সে। অন্তত তাই মনে করে। সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে আপনার দুর্ভাগ্যের জন্য।
